আমাদের মহল্লার মোড়টা খুব বড় কিছু না। কিন্তু সেখানে দাঁড়িয়ে থাকলে মনে হয়, পুরো পৃথিবীটা যেন এই ছোট জায়গাটার মধ্যেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই মোড়েরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা—মোস্তাকিম চাচার দোকান।
দোকানের নাম “মোস্তাকিম ভ্যারাইটি স্টোর।” নামটা শুনে মনে হয়, এখানে ঢুকলেই নতুন নতুন জিনিস পাওয়া যাবে। কিন্তু আসলে এখানে পাওয়া যায়—চা, বিস্কুট, সাবান, আর চাচার অদ্ভুত সব কথা।
মোস্তাকিম চাচার বয়স কত—এটা কেউ ঠিক জানে না। তিনি নিজেও জানেন না। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলেন,
“বয়স না জেনে মানুষ ভালো থাকে। বয়স জানলে কষ্ট বাড়ে।”
চাচার একটা বিশেষ গুণ আছে—তিনি কাউকে কখনো সরাসরি ‘না’ বলেন না। কেউ যদি বাকিতে কিছু চায়, তিনি বলেন,
“নাও, কিন্তু খাতায় নামটা সুন্দর করে লিখবা।”
তার খাতাটা একেবারে আলাদা। লাল কাপড়ে মোড়া না হলেও, তাতে এমন একটা গন্ধ আছে—যেন অনেক বছরের গল্প জমে আছে।
পহেলা বৈশাখ এলেই চাচার দোকানে একটু আলাদা পরিবেশ তৈরি হয়। নতুন করে ঝাড়ু দেওয়া হয়, পুরনো বোতলগুলো পরিষ্কার করা হয়, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—খাতাটা বের করা হয়।
চাচা সেই খাতাটাকে খুব যত্ন করে টেবিলের ওপর রাখেন। পাশে একটা ছোট থালায় মিষ্টি, আরেক পাশে আগরবাতি।
আমি একদিন জিজ্ঞেস করলাম,
“চাচা, এই আগরবাতি কেন?”
চাচা হেসে বললেন,
“মানুষ যখন হিসাব মেলায়, তখন পরিবেশটা একটু পবিত্র হওয়া দরকার।”
আমি বললাম,
“হিসাব কি এত বড় ব্যাপার?”
চাচা বললেন,
“হিসাব ছোট না। মানুষ ছোট করে দেখে।”
হালখাতার দিন মানুষজন একে একে আসে। কেউ খুশি মুখে, কেউ লজ্জা নিয়ে।
একজন আসে—বলেন,
“চাচা, এই নেন কিছু টাকা। বাকিটা পরে দেব।”
চাচা মাথা নেড়ে বলেন,
“ঠিক আছে। কিন্তু একটা কথা মনে রাখবেন—বাকিটা শুধু টাকার না, অভ্যাসেরও।”
লোকটা কিছু বুঝে, কিছু না বুঝে চলে যায়।
চাচার দোকানে একটা নিয়ম আছে—যে-ই আসুক, তাকে বসিয়ে চা খাওয়ানো হবে। চা খেতে খেতে চাচা গল্প করেন।
একদিন এক তরুণ এসে বলল,
“চাচা, জীবনটা খুব কঠিন।”
চাচা চা নেড়ে বললেন,
“চিনি কম দিলে চা যেমন তিতা লাগে, জীবনেও তেমনি—মিষ্টি কম থাকলে সব কঠিন লাগে।”
ছেলেটা হেসে ফেলল।
আমি বুঝলাম, চাচা আসলে চা বানান না—তিনি কথার মধ্যে চিনি মেশান।
একবার এক বৃদ্ধ এলেন। তার মুখে চিন্তার ছাপ।
তিনি বললেন,
“চাচা, আমার দেনা অনেক হয়ে গেছে।”
চাচা খাতা খুলে দেখলেন। তারপর বললেন,
“দেনা বেশি না, ভয় বেশি।”
বৃদ্ধ চুপ করে গেলেন।
চাচা আবার বললেন,
“আপনি কি কারো উপকার করেছেন?”
বৃদ্ধ বললেন,
“হ্যাঁ, করেছি।”
চাচা বললেন,
“তাহলে আপনার পাওনাও আছে। শুধু খাতায় লেখা নাই।”
চাচার একটা অভ্যাস আছে—তিনি মাঝে মাঝে খাতার দিকে তাকিয়ে চুপ হয়ে যান। তখন মনে হয়, তিনি শুধু টাকার হিসাব না, মানুষের জীবন দেখছেন।
আমি একদিন বললাম,
“চাচা, আপনি কি কখনো ক্লান্ত হন না?”
চাচা বললেন,
“হই। কিন্তু মানুষ যখন হাসে, তখন ক্লান্তি কমে যায়।”
আমি বললাম,
“সবাই তো হাসে না।”
চাচা হেসে বললেন,
“তাই তো আমি চেষ্টা করি, একটু হাসানোর।”
একদিন দোকানে একটা ছোট ছেলে এলো। হাতে কিছু কয়েন।
সে বলল,
“চাচা, এই টাকা দিয়ে কি পাব?”
চাচা বললেন,
“তুমি কী চাও?”
ছেলেটা বলল,
“মজা।”
চাচা তাকে একটা লজেন্স দিলেন, আর বললেন,
“মজা এইটুকুতেই হয়।”
ছেলেটা খুশি হয়ে চলে গেল।
আমি চাচাকে বললাম,
“এইটুকুতে কি সত্যি মজা হয়?”
চাচা বললেন,
“বড় হলে মানুষ মজা বড় করতে চায়, কিন্তু আনন্দ ছোট হয়ে যায়।”
হালখাতার দিন শেষে চাচা খাতাটা বন্ধ করেন। তখন তার মুখে একটা অদ্ভুত শান্তি থাকে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
“চাচা, সব হিসাব কি মিলে?”
চাচা একটু হাসলেন।
“না। কিছু হিসাব কখনো মেলে না।”
আমি বললাম,
“তাহলে?”
চাচা বললেন,
“সেগুলোই তো মানুষকে মানুষ রাখে।”
একদিন রাতে দোকানে বসে আছি। চারপাশে নীরবতা। চাচা ধীরে ধীরে খাতা উল্টাচ্ছেন।
আমি দেখলাম, কিছু নামের পাশে দাগ টানা, কিছু নামের পাশে কিছু লেখা নেই।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
“চাচা, এই খালি জায়গাগুলো কেন?”
চাচা বললেন,
“এইগুলো অপেক্ষা।”
আমি বললাম,
“কিসের অপেক্ষা?”
চাচা বললেন,
“মানুষের বদলের।”
মোস্তাকিম চাচার দোকানটা আসলে একটা ছোট্ট স্কুলের মতো। এখানে কেউ বই পড়ে না, কিন্তু সবাই কিছু না কিছু শিখে যায়।
কেউ শেখে ধৈর্য, কেউ শেখে লজ্জা, কেউ শেখে হাসতে।
আর আমি শিখেছি—জীবনের হালখাতা শুধু টাকা দিয়ে মাপা যায় না।
এখনো যখন পহেলা বৈশাখ আসে, চাচার দোকানে ভিড় হয়। মানুষ আসে, মিষ্টি খায়, কিছু টাকা দেয়, কিছু কথা বলে।
কিন্তু আমি জানি, চাচার আসল কাজটা খাতা রাখা না—মানুষের ভিতরের হিসাবটা একটু নেড়ে দেওয়া।
শেষবার যখন চাচাকে জিজ্ঞেস করলাম,
“চাচা, জীবনটা আসলে কী?”
চাচা একটু চুপ করে থেকে বললেন,
“জীবন একটা খাতা। কেউ পরিষ্কার রাখে, কেউ এলোমেলো করে ফেলে। কিন্তু শেষ পাতাটা সবার জন্যই সাদা থাকে।”
আমি বললাম,
“সেই পাতায় কী লেখা হয়?”
চাচা হেসে বললেন,
“যা লিখতে চাও, তাই।”
মোস্তাকিম চাচা আজও দোকানে বসে থাকেন। তার খাতা আজও খোলা থাকে।
আর আমি মাঝে মাঝে ভাবি—
আমার নিজের খাতাটা কেমন?
হয়তো সেখানে অনেক লাল দাগ আছে।
হয়তো অনেক খালি জায়গা।
কিন্তু একটা কথা নিশ্চিত—
যতদিন মোস্তাকিম চাচার মতো মানুষ আছে, ততদিন আমরা শিখতে পারব—
হালখাতার বাইরেও জীবন আছে।

0 মন্তব্যসমূহ