সুলেমানের ঘুমের সঙ্গে সম্পর্কটা ছিল এক অদ্ভুত প্রেমের মতো। ছোটবেলা থেকে সে ঘুমাত এমনভাবে, যেন পৃথিবীতে আর কোনো কাজ নেই। ক্লাসে শিক্ষক পড়াচ্ছেন, সুলেমান ঘুমাচ্ছে। বাসায় মা ডাকছেন, “খাবি?”—সে ঘুমাচ্ছে। একবার তো ঈদের দিনও সে ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিয়েছিল। সবাই নতুন জামা পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর সে ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে নিজেকে নায়ক বানিয়ে ফেলেছে।
এই নিয়ে সে একসময় গর্বিতও ছিল। বন্ধুরা বলত, “তুই তো ঘুমের ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন।”
সে হাসত, বলত, “ঘুমাতে পারা একটা ট্যালেন্ট। সবাই পারে না।”
কিন্তু জীবন বড় নিষ্ঠুর শিক্ষক। সে একদিন এসে বলল—“এইসব ট্যালেন্ট দিয়ে ভাত জোটে না।”
সুলেমানের বাবা ছিলেন খুব সাধারণ মানুষ। ছোট্ট একটা দোকান ছিল, যেখানে তিনি দিনভর বসে থাকতেন। বাবার চোখে সবসময় একটা ক্লান্তি থাকত, কিন্তু সেই ক্লান্তির মধ্যে একটা শান্তি ছিল। সুলেমান একদিন জিজ্ঞেস করেছিল,
“আব্বা, তুমি এত কষ্ট করো কেন?”
বাবা হেসে বলেছিলেন,
“পুরুষ মানুষের কষ্ট করার মধ্যেই জীবনের সার্থকতা।”
তখন কথাটা তার মাথায় ঢোকেনি। তখন সে ভাবত—“কষ্ট করে কী হবে? ঘুমাইলে তো সব ঠিক।”
কিন্তু সময় বদলাতে বেশি সময় লাগে না।
বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। দোকানটা বন্ধ হয়ে গেল। সংসারের হিসাব হঠাৎ করেই কাগজের বাইরে চলে এল—বাস্তবের ভেতরে ঢুকে পড়ল।
সেই দিনটা সুলেমান খুব ভালো করে মনে রাখে—সকাল ১০টায় তার ঘুম ভাঙে। সাধারণত এটা তার কাছে খুব স্বাভাবিক সময় ছিল, কিন্তু সেদিন মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে সে বুঝল—এই ঘুমটা খুব দামি হয়ে গেছে।
মা বললেন,
“তোর আব্বার ওষুধ কিনতে হবে।”
সুলেমান প্রথমবারের মতো নিজের ঘুমকে একটু লজ্জা পেল।
সেদিন রাতেই সে সিদ্ধান্ত নিল—ঘুমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে।
সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে বলল,
“ঘুম, তুই অনেকদিন আমার সাথে ছিলি। এখন তোর সাথে ব্রেকআপ।”
এই ব্রেকআপটা খুব শান্তিপূর্ণ ছিল না।
প্রথম দিনই সে একটা প্ল্যান করল—রাতে ৬ ঘণ্টার বেশি ঘুমাবে না।
অ্যালার্ম সেট করল।
অ্যালার্ম বেজে উঠল।
সে বন্ধ করল।
আবার ঘুমাল।
দ্বিতীয় দিন—অ্যালার্ম ৩টা।
সবগুলো বন্ধ করে সে এমনভাবে ঘুমাল, যেন যুদ্ধ জিতে গেছে।
তৃতীয় দিন—মা এসে বললেন,
“বাবা, তুই ঘুমের সাথে যুদ্ধ করছিস, না ঘুম তোকে জিততেছে?”
সুলেমান একটু চুপ করে থাকল।
তারপর সে সিরিয়াস হলো।
সে গবেষণায় নামল।
সে গুগল ঘেঁটে বের করল—অনেকে কম ঘুমায়।
কেউ কেউ নাকি দিনে ৪ ঘণ্টা ঘুমিয়েও ঠিক থাকে।
একদিন সে বন্ধুকে বলল,
“শুনছিস, বড় বড় মানুষ কম ঘুমায়।”
বন্ধু বলল,
“তুই আগে বড় হ, তারপর কম ঘুমা।”
সুলেমান একদিন শুনল—কেউ কেউ ঠান্ডা পানিতে গোসল করে শরীরের ক্লান্তি দূর করে।
সে ভাবল—“এইটাই সলিউশন!”
সকাল ৫টায় উঠে সে বাথরুমে গেল।
কল খুলল।
ঠান্ডা পানি পড়ছে।
সে হাত দিল—
“ইস! এইটা কি পানি না বরফ?”
তারপর সাহস করে মাথায় ঢালল।
দুই সেকেন্ড পর—
“আল্লাহ! আমি কী করছি!”
সে বের হয়ে এসে কম্বল মুড়ি দিল।
মা জিজ্ঞেস করলেন,
“কী হইছে?”
সে বলল,
“আমি মনে হয় ভুল রিসার্চ পড়ছি।”
কিন্তু সে থামল না।
সে এবার খাবারের দিকে নজর দিল।
তার ধারণা হলো—খাবারই আসল শত্রু।
সে একটা খাতা কিনল।
লিখল—“ঘুম গবেষণা ডায়েরি”
প্রথম দিন—
“ভাত খাওয়ার পর ২০ মিনিটের মধ্যে চোখ বন্ধ।”
দ্বিতীয় দিন—
“খিচুড়ি খাওয়ার পর সরাসরি গভীর ঘুম।”
তৃতীয় দিন—
“গরুর মাংস—খেয়ে উঠে মনে হচ্ছে পৃথিবী ঘুরছে, তারপর ঘুম।”
সে বুঝতে পারল—বাংলাদেশি খাবার মানেই ঘুমের ডাক।
একদিন সে সিদ্ধান্ত নিল—কম খাবে।
মা বললেন,
“কেন?”
সে বলল,
“ঘুম কমানোর জন্য।”
মা হেসে বললেন,
“খালি পেটে মানুষ কাজ করতে পারে?”
সে বলল,
“আমি বিজ্ঞান করছি।”
মা বললেন,
“বিজ্ঞান না, পাগলামি করছিস।”
কিন্তু কিছুদিন পর একটা অদ্ভুত জিনিস ঘটল।
সে কম খেতে শুরু করল, একটু কম ঘুমাতে শুরু করল, আর কাজ খুঁজতে শুরু করল।
প্রথমে ছোট একটা কাজ পেল—একটা দোকানে হিসাব লিখে দেওয়া।
সে রাতে ঘুমাতে গেল, কিন্তু ঘুম এল না।
সে ভাবল—
“এই প্রথম আমি ঘুমাতে চাইতেছি, কিন্তু ঘুম আসতেছে না!”
জীবন আসলে মজার—যা তুমি চাই, সেটা তখনই আসে না, যখন তুমি সেটা নিয়ে সিরিয়াস হও।
সুলেমান ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করল—ঘুম সমস্যা না, সমস্যা হলো নিয়ন্ত্রণ।
আগে ঘুম তাকে নিয়ন্ত্রণ করত, এখন সে ঘুমকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখছে।
সে বুঝল—
ঘুম দরকার, কিন্তু অতিরিক্ত ঘুম মানে পালানো।
একদিন রাতে সে বাবার পাশে বসে ছিল।
বাবা তখন একটু ভালো।
বাবা জিজ্ঞেস করলেন,
“তুই এখন কম ঘুমাস?”
সে হেসে বলল,
“হ্যাঁ, চেষ্টা করি।”
বাবা বললেন,
“ঘুম খারাপ না, কিন্তু জীবনটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
সুলেমান মাথা নেড়ে বলল,
“এখন বুঝি।”
তার গবেষণা খাতায় সে শেষ দিন লিখল—
“ঘুম শত্রু না।
খাবার শত্রু না।
আসল শত্রু হলো অলসতা।”
একদিন বিকেলে সে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিল।
বন্ধু বলল,
“তুই তো আগে সবসময় ঘুমাইতিস, এখন কী হইছে?”
সে একটু হাসল।
বলল,
“আগে আমি ঘুমাইতাম স্বপ্ন দেখার জন্য।
এখন জেগে থাকি, স্বপ্ন সত্যি করার জন্য।”
বন্ধুরা চুপ করে গেল।
রাত নামল।
সুলেমান বিছানায় শুয়ে আছে।
চোখ বন্ধ করল।
ঘুম আসছে।
সে হাসল।
এবার সে ঘুমকে ভয় পায় না।
কারণ সে জানে—এই ঘুম তাকে দুর্বল করবে না, শক্তি দেবে।
ঘুম এখন আর তার জীবনের কেন্দ্র না—একটা ছোট্ট অংশ।
আর সে বুঝে গেছে—
জীবনটা আসলে “বেড অফ রোজেস” না,
কিন্তু কাঁটার ভেতর দিয়েই গোলাপের গন্ধটা সবচেয়ে ভালো লাগে।
শেষে সুলেমান নিজের মতো করে একটা কথা বানাল—
“যে বেশি ঘুমায়, সে স্বপ্ন দেখে।
যে কম ঘুমায়, সে স্বপ্ন বানায়।”
তারপর সে আবার ঘুমাল—
কিন্তু এবার দায়িত্ব নিয়ে।
আর এই দায়িত্বটাই মানুষকে বদলে দেয়।

0 মন্তব্যসমূহ