জীবনে সব কিছু চিবিয়ে খেতে হয় না

 আসলাম পান খায় না। সে কথাটা সে এমন গর্ব করে বলে যেন পান না খাওয়া একটা আন্তর্জাতিক পুরস্কার। কিন্তু সুপারি? সেটায় তার দুর্বলতা আছে। বিকেলের দিকে তাকে দেখবেন মোড়ের দোকানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সুপারি চিবুচ্ছে, মুখে এমন ভাব যেন জীবনের সব বড় সিদ্ধান্ত সে এই সুপারি চিবোতে চিবোতেই নিয়েছে।



আসলামের বয়স এখন চল্লিশ পেরিয়েছে। সে নিজে বলে, “বয়স তো শীতের শুকনা পাতার মতো, হালকা হাওয়া লাগলেই উড়ে যাচ্ছে।” তার বন্ধুরা বলে, “উড়ছে না, ঝরছে।”

রোদে তার চামড়া একটু কালো হয়েছে। সে বলে, “এটা ন্যাচারাল ট্যান।” পাশের বাড়ির রুবেল বলে, ঠিক বলেছ! তবে এই ট্যানটা এতই ন্যাচারাল যে, অন্ধকার ঘরে দাঁড়ালে এখন তোমায় খুঁজে পেতেও আমাদের ন্যাচারাল লাইট লাগবে।

চুলে সাদা রংও দেখা দিয়েছে। আসলাম আয়নায় তাকিয়ে ভাবে, এ যেন জীবনের নিজস্ব হাইলাইটার।রুবেল বলে বাহ! তুই তো দেখি জ্যান্ত একখানা 'নেগেটিভ ফটো' হয়ে গেছিস। শরীর কালো আর চুল সাদা

কিন্তু আসল সমস্যা বয়স না। সমস্যা হলো বিয়ে।
চল্লিশ বছর পার হয়ে গেছে, তবু সে বিয়ে করেনি।

এক আত্মীয় আসলামকে খোঁচা দিয়ে বলল, "চল্লিশ বছর ধরে একা আছ, জীবনটা বোরিং লাগে না?" আসলাম: "একদম না! আমি তো নিজেকে 'ভ্যানটেজ কার' মনে করি। যত পুরোনো হই, তত দাম বাড়ে।" আত্মীয়: "দাম তো বাড়ছে বুঝলাম, কিন্তু এই মডেলের গাড়ি কি এখন আর রাস্তায় চলার পারমিট পাবে? সবাই তো তোমাকে এখন মিউজিয়ামে রাখার যোগ্য মনে করছে!"

একদিন মোড়ের চায়ের দোকানে বসে সবাই তাকে ধরল।
—কিরে আসলাম, তোর বিয়ের খবর কবে?
আসলাম সুপারি মুখে দিয়ে বলল, “বিয়ে তো সবার জন্য না।”
—তাহলে কার জন্য?
—পারফেক্ট মানুষের জন্য।

চায়ের দোকানে নিস্তব্ধতা। এমন কথা সাধারণত সিনেমায় শোনা যায়, মোড়ের দোকানে না।

আসলাম বলল, “আমি সারা জীবন একটা পারফেক্ট মেয়ের খোঁজ করেছি।”
রুবেল হাসল, “তা একটাও পেলি না?”
আসলাম দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “পেয়েছিলাম একটা।”

সবাই সামনে ঝুঁকল। গল্পের গন্ধ।



“মেয়েটা খুব ভালো ছিল। নাম ছিল নুসরাত। কথা বলত কম, হাসত বেশি। আমার সব কথা মন দিয়ে শুনত। আমি যখন বলতাম আমি একদিন বড় ব্যবসায়ী হবো, সে বিশ্বাস করত। যখন বলতাম আমি একদিন বিদেশ যাবো, সে বলত, ‘যাবেন, ইনশাআল্লাহ।’ এমনকি আমি যখন বলতাম আমি সুপারি ছাড়ব, সেও বিশ্বাস করত।”

—তাহলে বিয়ে হলো না কেন?

আসলাম একটু থামল। চায়ের কাপে চুমুক দিল।
“কারণ সে একটা পারফেক্ট ছেলের অপেক্ষায় ছিল।”

সবাই হেসে উঠল।
রুবেল বলল, “মানে তুই পারফেক্ট ছিলি না?”
আসলাম মাথা নেড়ে বলল, “আমি ছিলাম সম্ভাবনাময়। পারফেক্ট না।”

তারপর থেকে আসলামের জীবন যেন একটা অদ্ভুত অপেক্ষা।
সে মাঝে মাঝে ভাবে, পারফেক্ট আসলে কী? যে রান্না পারে? যে সুন্দর? যে চুপচাপ? যে ঝগড়া করে না?

তারপর সে নিজের দিকে তাকায়।
সে কি পারফেক্ট?

সে তো সকালে উঠতে পারে না।
বাজারে গেলে বেশি দামে কিনে আসে।
বৃষ্টির দিনে ছাতা নিতে ভুলে যায়।
আর মাঝে মাঝে খুব অপ্রয়োজনীয় জ্ঞান দেয়।

একদিন বৃষ্টির মধ্যে আসলাম ভিজে একাকার হয়ে বাড়ি ফিরল। বন্ধু: "কিরে, ছাতা নিসনি কেন?" আসলাম: "আরে ছাতা তো আমার সাথেই ছিল, কিন্তু ওটা খুলতে ভুলে গিয়েছিলাম।" বন্ধু: "বলিস কী! কেন?" আসলাম: "আমি ভাবলাম, মেঘ যখন এত কষ্ট করে জল ঢালছে, তখন ছাতা ধরে তার আবেগে বাধা দেওয়াটা কি ঠিক হবে?

একদিন তার মা বললেন, “বাবা, পারফেক্ট মানুষ বলে কিছু নেই। শুধু মানিয়ে নেওয়া মানুষ আছে।”

আসলাম সেই রাতে অনেক ভেবেছিল। সুপারি খায়নি।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সাদা চুলে হাত বুলিয়ে বলেছিল, “এই যে আমি, একটু কম, একটু বেশি, এটাই তো আসল।”

পরের শুক্রবার তাকে দেখা গেল এক মেয়ের বাসায়।
সে খুব চুপচাপ বসে ছিল।
মেয়েটা এসে বলল, “আপনি নাকি সুপারি খান?”
আসলাম লজ্জা পেয়ে বলল, “আগে খেতাম।”
মেয়েটা হেসে বলল, “আমিও মাঝে মাঝে খাই।”

আসলাম হেসে ফেলল।
তার মনে হলো, এটাই হয়তো পারফেকশন না, কিন্তু সত্যি।

বিয়েটা হলো কিনা, সেটা এখনো মোড়ের দোকানে আলোচনা হয়।
কেউ বলে হয়েছে, কেউ বলে হয়নি।



কিন্তু আসলাম এখন আর বলে না সে পারফেক্ট কাউকে খুঁজছে।
সে শুধু বলে, “মানুষটা যেন পাশে বসে চা খেতে রাজি থাকে।”

সুপারি এখনও খায়।
তবে মাঝে মাঝে অর্ধেক ফেলে দেয়।
বোধহয় বুঝেছে, জীবনে সব কিছু পুরোপুরি চিবিয়ে খেতে হয় না। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

ঘুম গবেষক সুলেমান