পলাশের বিয়ের দিন সকাল থেকেই গ্রামের বাতাসে এক ধরনের টেনশন। কনে পক্ষের টেনশন, বর পক্ষের টেনশন, এমনকি পাশের বাড়ির খালা পর্যন্ত টেনশনে। কারণ, আজ আসছে সেই কিংবদন্তি জামাই—ভিপি পলাশ
ভিপি মানে কী? কেউ জিজ্ঞেস করলে পলাশ নিজেই গম্ভীর গলায় বলত, “ভাইস প্রেসিডেন্ট।”
বন্ধুরা পেছন থেকে ফিসফিস করত, “ভোদাই পলাশ।”
বিয়ের আসরে পলাশের মুখে সাদা রুমাল। অনেকে ভাবল, আহা, কী লাজুক ছেলে! আসলে ব্যাপারটা অন্য। পলাশের মা কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন, “বাবা, বেশি কথা বলবি না। মুখ খুললেই গোলমাল করিস।” তাই রুমাল ছিল একধরনের সেফটি ডিভাইস। কথা বেরোতে চাইলে আগে রুমাল পার হতে হবে।
শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার আগে মা শেষবারের মতো প্রশিক্ষণ দিলেন, “সবাইকে সালাম দিবি। মনে রাখবি—সা-লা-ম।”
পলাশ মাথা নাড়ল। কিন্তু তার মাথায় তখন অন্য চিন্তা। সে নতুন পাঞ্জাবি পরেছে, পকেটে আতর, চুলে জেল। নিজেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ লাগছে। ভিপি মানুষ বলে কথা।
শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে প্রথমেই সে ভুলে গেল “সালাম” শব্দটা। মনে পড়ল না। নার্ভাস হয়ে যাকে দেখছে তাকেই বলছে, “বিসমিল্লা!”
শ্বশুরমশাইকে দেখে, “বিসমিল্লা!”
শাশুড়িকে দেখে, “বিসমিল্লা!”
এমনকি পাঁচ বছরের ভাগ্নেকেও দেখে বলল, “বিসমিল্লা!”
ভাগ্নে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “মামা, আমি কি খাবার?”
ঘরে চাপা হাসি। কেউ সরাসরি হাসছে না, কারণ নতুন জামাই। কিন্তু হাসিটা বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
খাওয়ার সময় পলাশ আরও বিপদে পড়ল। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, “মাংস নেবেন?”
সে ভেবে বলল, “আপনারা যা দেন, আমি তাই মেনে নেই। আমি গণতান্ত্রিক।”
শ্বশুরমশাই চুপ করে রইলেন। মনে মনে ভাবলেন, এই ছেলেটা কি সংসদে যাবে?
তবে পলাশের একটা গুণ ছিল। সে তার স্ত্রী নীহারিকাকে সত্যিই ভালোবাসত। নীহারিকা শান্ত স্বভাবের মেয়ে। প্রথম রাতে সে হেসে বলল, “তুমি সবাইকে বিসমিল্লা বললে কেন?
পলাশ লজ্জা পেয়ে বলল, “সালাম মনে ছিল না। মাথা ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল।”
নীহারিকা হেসে ফেলল। সেই হাসিতে বিদ্রূপ ছিল না, ছিল মায়া। সে ধীরে ধীরে পলাশকে শেখাতে শুরু করল—কাকে কী বলতে হয়, কখন চুপ থাকতে হয়, কখন শুধু হাসলেই চলে।
একদিন শ্বশুরমশাই পলাশকে বাজারে নিয়ে গেলেন। দামাদামি করতে গিয়ে পলাশ প্রথমে বলল, “ভাই, আমরা কিন্তু ভিআইপি ফ্যামিলি।”
শ্বশুরমশাই কানে কানে বললেন, “চুপ।”
পলাশ চুপ করল।
সেই প্রথম সে বুঝল, চুপ থাকাও একধরনের বুদ্ধি।
মাস ছয়েক পর গ্রামের লোকজন লক্ষ্য করল, ভিপি পলাশ আগের মতো নেই। এখন সে কারও কথা কেটে কথা বলে না। কেউ কিছু বললে আগে শোনে, পরে উত্তর দেয়। বিসমিল্লা-সালাম কনফিউশন আর হয় না। বরং সে নিজেই ছোটদের শেখায়, “আগে শুনো, পরে বলো।”
বন্ধুরা একদিন আড্ডায় বলল, “এই পলাশ, তোর ভিপি মানে এখন কী?”
পলাশ একটু হেসে বলল, “ভেরি পেশেন্ট।”
সবাই হেসে উঠল। কিন্তু এই হাসির মধ্যে আগের মতো খোঁচা ছিল না। ছিল স্বীকৃতি।
নীহারিকা একদিন বলল, “তুমি বদলে গেছ।”
পলাশ গম্ভীর হয়ে বলল, “তুমি না থাকলে আমি এখনও সবাইকে বিসমিল্লা বলতাম।”
ভালোবাসা বড় অদ্ভুত জিনিস। কারও পকেটে টাকা ঢালে না, কিন্তু মাথায় আলো জ্বালায়। পলাশের বুদ্ধির দরজা ধীরে ধীরে খুলে গেল। সে বুঝল, ভিপি হওয়া যায় পদবি দিয়ে নয়, আচরণ দিয়ে।
গ্রামের মানুষ এখন তাকে ডাকে, “পলাশ ভাই।”
ভোদাই শব্দটা হারিয়ে গেছে।
তবে মাঝে মাঝে, খুব আপন মুহূর্তে, নীহারিকা মজা করে বলে, “এই যে ভিপি সাহেব, একটু চা বানাও তো।”
পলাশ হাসতে হাসতে রান্নাঘরে যায়। চা বানাতে বানাতে আস্তে করে বলে, “বিসমিল্লা…”
তারপর নিজেই হেসে ফেলে। কারণ সে জানে, ভুলটা ছিল তার, কিন্তু সেই ভুলই তাকে মানুষ বানিয়েছে।



0 মন্তব্যসমূহ