ভদ্রলোক। কবি। মানুষ।



মোল্লা হুমায়ুন কবির কে আমাদের পাড়ায় কেউ আসল নামে ডাকে না। সবাই বলে “কবি কবির”। কেউ একটু মজা করতে চাইলে বলে “কবিরাজ”, “কবির মোল্লা”, আবার কেউ কেউ শুধু “কবি ” বলে ডাকে। আশ্চর্যের ব্যাপার, উনি কখনো রাগ করেন না। বরং হাসেন। এমনভাবে হাসেন, যেন তাকে গাল নয়, পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।


কবির সাহেব ছোট গল্প আর কবিতা লেখেন। তার কবিতায় “লুহাওয়া বিষবৃক্ষ” নেই, “মৃত্যুঞ্জয়ী সঞ্জীবনী” নেই। আছে পাশের বাড়ির ছাদে শুকাতে দেওয়া শাড়ি, আছে বাজার থেকে ফেরার পথে হারিয়ে যাওয়া পাঁচ টাকার গল্প। তার গল্পের নায়িকারা খুব ভদ্র। তারা বড় ধরনের দুষ্টামি করে না, ফেসবুকে রহস্যময় স্ট্যাটাস দেয় না, মাঝরাতে কাউকে ফোনও করে না। নায়করা আরও সোজা। সমাজের জটিলতা বুঝতে গেলে তারা একটু চা খেয়ে নেয়, তারপর বলে, “আরে, এত ভেবে কী হবে?”

এই মানুষটা এক সময় ব্যাংকের ম্যানেজার ছিলেন। টাই পরে অফিসে যেতেন। লোকজন সম্মান করে “স্যার” বলত। কিন্তু একদিন তিনি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভাবলেন, “আমি কবি মানুষ। আমার গোলামী সাজে না।” পরদিনই চাকরি ছেড়ে দিলেন। বাড়ির লোকজন ভেবেছিল, উনি বুঝি কোনো আন্তর্জাতিক কবি সম্মেলনে যাচ্ছেন। আসলে তিনি গেলেন এক বন্ধুর পাল্লায় পড়ে কন্ট্রাক্টরি ব্যবসায়।

ব্যবসা যে কবিতার মতো নয়, এটা তিনি প্রথম ধাক্কাতেই বুঝলেন। হিসাবের খাতায় যোগ-বিয়োগ করতে গিয়ে কবিতার লাইন ঢুকে যাচ্ছিল। “বালুর বদলে বেদনা” লিখে ফেলেছিলেন একদিন। ফলাফল, টাকা লস। তার ওপর চাকরিটাও নেই। পাড়ার মানুষ তখন বলত, “দেখেছো, কবি হলে এমনই হয়।”

কবির সাহেব তখনও হাসলেন। বললেন, “ব্যর্থতাও এক ধরনের অভিজ্ঞতা। এটাকে নিয়ে কবিতা লেখা যায়।”

এরপর আবার নতুন করে ব্যবসা শুরু করলেন। এবার এক বিশ্বস্ত বন্ধু পাশে ছিল। বন্ধুটা হিসাব রাখত, আর উনি রাখতেন মনোবল। ধীরে ধীরে সংসার চলতে লাগল। খুব বড়লোক হলেন না, কিন্তু কারো কাছে হাত পাততে হয়নি। তার ছেলেরা পড়াশোনা করে প্রতিষ্ঠিত হলো। এখন তারা বাবাকে খুব আদর করে। কেউ চশমা পরিষ্কার করে দেয়, কেউ বলে, “আব্বা, আপনি শুধু লিখুন।”

পাড়ার লোকেরা এখনো খোঁচা দেয়। একদিন চায়ের দোকানে একজন বলল, “কবি সাহেব, আপনার গল্পে নায়িকা এত ভদ্র কেন? একটু ঝাল-মশলা দেন না?”


কবির সাহেব চা নেড়ে শান্ত গলায় বললেন, “আমার গল্পে ঝাল দিলে পাঠকের গ্যাস হতে পারে। আমি হজমের জন্য লিখি।”

সবাই হেসে উঠল। তিনি-ও।

তার একটা অদ্ভুত গুণ আছে। তিনি মানুষের খারাপ দিক দেখেন না। কেউ তাকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করলে তিনি উল্টো তার প্রশংসা করেন। একবার এক যুবক বলল, “কবি সাহেব, আপনার কবিতা বুঝি না।”

তিনি বললেন, “তা হলে তুমি খুব বুদ্ধিমান। আমি নিজেও মাঝে মাঝে বুঝি না।”

এই সরলতা অনেককে বিরক্ত করে, আবার অনেককে মুগ্ধও করে। তিনি কারো সঙ্গে শত্রুতা করেন না। পাড়ার যে ছেলে কাল তাকে নিয়ে মজা করেছে, আজ সে যদি চাকরির জন্য রেফারেন্স চায়, কবির সাহেব হাসিমুখে লিখে দেন, “ছেলেটা ভালো। শুধু একটু বেশি সৎ।”

রাতে তিনি বারান্দায় বসে লেখেন। তার কলমে ব্যাংকের চাকরি নেই, কন্ট্রাক্টরির লস নেই। আছে মানুষের ছোট ছোট ভালোমানুষি। আছে সেই চায়ের দোকানের হাসি।

একদিন আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “আপনি এত কিছু হারালেন, আফসোস হয় না?”

তিনি বললেন, “আমি কি হারিয়েছি? চাকরি গেছে, ঠিক আছে। কিন্তু গল্প পেয়েছি। লস হয়েছে, কিন্তু অভিজ্ঞতা পেয়েছি। মানুষ আমাকে কবি বলে ডাকে, মজা করে হোক, তবু তো কবি ডাকে।”

তারপর একটু চুপ থেকে যোগ করলেন, “জীবনে সবাই সিরিয়াস চরিত্র হতে চায়। আমি ভাবলাম, একটু সাইড চরিত্র হই। সাইড চরিত্ররাই কিন্তু গল্প বাঁচিয়ে রাখে।”

আমি বুঝলাম, পাড়ার লোকেরা যাকে খোঁচা দিয়ে “কবি কবির” বলে, সে আসলে নিজের জীবনটাই গল্প বানিয়ে ফেলেছে। আর সেই গল্পে বড় কোনো ট্র্যাজেডি নেই। আছে মৃদু হাসি, সামান্য বোকামি, আর একরাশ ভালোমানুষি।

হয়তো বড় সাহিত্যিক হবেন না। কিন্তু আমাদের পাড়ার ইতিহাসে তিনি থাকবেন। নামের পাশে ছোট করে লেখা থাকবে, “ভদ্রলোক। কবি। মানুষ।”

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

ঘুম গবেষক সুলেমান