ভোরবেলা সিলেট রেলওয়ে স্টেশন–এ কুয়াশা নামলে ঝন্টুকে দেখলে মনে হয় সে-ই যেন স্টেশনের আসল মালিক। মাঝে মাঝে কুলির কাজ করে, কিন্তু কাজের চেয়ে তার আগ্রহ বেশি ট্রেনের বাঁশির শব্দে। সে বলে, “ট্রেন মানে স্বাধীনতা। টিকিট লাগে না, শুধু সাহস লাগে!
সিলেট থেকে ঢাকা, ঢাকা থেকে চিটাগাং—তার মুখে জায়গার নামগুলো এমনভাবে বের হয়, যেন সব শহরই তার মামাবাড়ি। ঢাকা–র ভিড় তাকে ভয় দেখায় না, বরং মজা দেয়। আর চট্টগ্রাম–এর সমুদ্রের কথা বলতে গেলে তার চোখ চকচক করে ওঠে।
কিন্তু একটা জায়গায় এসে ঝন্টু থেমে যায়। যখন স্টেশনের বড় ছেলেগুলো ফিসফিস করে নেশার কথা বলে। সে দূরে সরে যায়। কেউ হাসে, বলে, “কী রে, ভয় পাস?”
ঝন্টু হাসে না। তার ভেতরে অন্যরকম নীরবতা।
তার বাবা নেশা করত। তারপর বাসায় চিৎকার, গালাগাল, মারধর। মা চুপচাপ থাকতেন। একদিন মা আর উঠলেন না। তখন ঝন্টুর বয়স খুব কম।
বাবা পরে আবার বিয়ে করলেন। নতুন সংসারে ঝন্টুর জায়গা হলো না। সে নিজেই বেরিয়ে এল। বলল, “রেললাইন সোজা, মানুষ বাঁকা।” এই ডায়লগটা সে নিজেই বানিয়েছে, খুব গর্ব নিয়ে বলে।
এখন স্টেশনই তার বাড়ি। প্ল্যাটফর্ম তার বিছানা, আকাশ তার ছাদ।
একদিন তার পরিচয় হলো হুমায়ূনের সাথে। হুমায়ূন থাকে স্টেশনের পাশের এক বড় বাড়িতে। বাড়িটা এমন, দেখলে মনে হয় ভেতরে ঢুকলেই স্যান্ডেল খুলে ফেলতে হবে, না হলে ফ্লোর রাগ করবে।
হুমায়ূন প্রথম দিনই ঝন্টুকে জিজ্ঞেস করল,
— “তুই পড়াশোনা করিস?”
ঝন্টু বলল,
— “আমি লাইফ পড়ি। বই পড়লে পাস করা যায়, লাইফ পড়লে বাঁচা যায়!”
হুমায়ূন হেসে ফেলল। কিন্তু সেই হাসির ভেতর একটু চিন্তা ছিল।
ধীরে ধীরে তাদের কথা বাড়ল। ঝন্টু একদিন হঠাৎ বলল,
— “তোর বাসায় মা আছে?”
— “আছে।”
— “মাকে কখনো কাঁদতে দেখেছিস?”
হুমায়ূন উত্তর দিতে পারল না।
সেদিন সন্ধ্যায় হুমায়ূন প্রথম বুঝল, বিলাসবহুল বাড়ির ভেতরেও অনেক কিছু অজানা থাকে। আর রেললাইনের পাশে থাকা একটা ছেলেও জীবনের নগ্ন সত্য জানে।
কয়েকদিন পর হুমায়ূন ঝন্টুকে নিয়ে গেল একটা স্কুলে। এতিম আর অসহায় বাচ্চাদের জন্য। থাকা, খাওয়া, পড়াশোনার ব্যবস্থা আছে।
ঝন্টু ভুরু কুঁচকে বলল,
— “আমাকে কি ভদ্রলোক বানাবি?”
হুমায়ূন বলল,
— “না, মানুষ বানাতে চাই।”
ঝন্টু একটু চুপ করে রইল। তারপর বলল,
— “মানুষ হতে ফি কত?”
হুমায়ূন বলল,
— “ফি নেই। শুধু সাহস লাগে।”
ঝন্টু আকাশের দিকে তাকাল। তার মনে হলো, ট্রেনের লাইন যেমন দূরে দূরে গিয়ে মিশে যায়, তেমনি হয়তো তার জীবনও কোথাও গিয়ে বদলাতে পারে।
ভর্তি হওয়ার দিন সে খুব গম্ভীর ছিল। অন্য বাচ্চারা হাসছিল, দৌড়াচ্ছিল। ঝন্টু চুপচাপ দাঁড়িয়ে।
হুমায়ূন বলল,
— “কী রে, ভয় পাচ্ছিস?”
ঝন্টু হেসে বলল,
— “না। শুধু ভাবছি, এতদিন ট্রেনে ট্রেনে ঘুরেছি। এবার লাইফটা একটু স্টেশনে দাঁড়াক।”
সেদিন রাতে ঝন্টু প্রথমবার নিজের বিছানায় ঘুমাল। ছাদে ফ্যান ঘুরছে। বালিশ আছে। কম্বল আছে।
ঘুমের আগে সে মনে মনে বলল,
“মা, আমি নেশা করিনি। আমি পালাইনি। আমি শুধু একটু ভালো থাকার চেষ্টা করছি।”
তারপর খুব আস্তে ঘুমিয়ে পড়ল।
রেললাইনের ছেলে ঝন্টু সেদিন বুঝল, জীবন সবসময় দৌড়ানোর নাম না। কখনো কখনো থামার ভেতরেই সবচেয়ে বড় যাত্রা শুরু হয়।



0 মন্তব্যসমূহ