উত্তরার রাস্তায় এক সুন্দরগঞ্জ

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ-এর মানুষ চান মিয়া। গ্রামে কেউ তার বয়স জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, “বয়স জিজ্ঞেস কইরা লাভ নাই, এখনো দুই মণ ধান একা উঠাইতে পারি।”

লোকজন বলে, “চাচা, আপনি তো এখনো ফিট!”
চান মিয়া গম্ভীর মুখে বলেন “আলহামদুলিল্লাহ”

কৃষিকাজের মৌসুমে তিনি পুরো কৃষক। মাথায় গামছা, পায়ে কাদা, মুখে হাসি। কিন্তু ফসল ঘরে উঠলেই হিসাবের খাতা খুলে বসেন। অংক মেলে না। তখন তিনি সিদ্ধান্ত নেন, আবার শহর যাওয়া দরকার।

ঢাকার উত্তরা-তে গিয়ে রিকশা চালান তিনি। সেখানে রিকশা নিতে হলে সিকিউরিটি মানি জমা দিতে হয়। চান মিয়া মালিককে বললেন,
“ভাই, টাকা নাই। কিন্তু আমি পালামু না।”
মালিক চোখ ছোট করে বললেন, “সবাই এই কথাই কয়।”
চান মিয়া শান্ত গলায় বললেন, “আমি যদি পালাই, এই চেহারা নিয়া কোথায় লুকামু বলেন?”

মালিক হেসে ফেললেন। বললেন, “ঠিক আছে চাচা, আপনারে বিশ্বাস করলাম।”

এরপর থেকে চান মিয়া গর্ব করে বলেন, “আমার গ্যারান্টি আমার চেহারা।”

উত্তরার রাস্তায় তিনি বেশ জনপ্রিয়। একদিন এক স্মার্ট ছেলে উঠে বলল, “চাচা, দ্রুত চালান।”
চান মিয়া বললেন, “বাবা, এই রিকশা ফেরারি না, ধৈর্য ধরেন।”

আরেকদিন এক যাত্রী ভাড়া কম দিতে চাইল।
চান মিয়া বললেন, “ভাই, ভাড়া কমাইলে রিকশা হালকা হয় না।”

রাতে মেসে ফিরে তিনি মোবাইলে ভিডিও কল দেন। বড় ছেলে রায়হান মুখ গম্ভীর করে বলে,
“আব্বা, বন্ধুরা জিজ্ঞেস করে তুমি কী করো।”
চান মিয়া বলেন, “বলবি, আব্বা মানুষ চালায়।”
ছেলে অবাক, “মানুষ চালায়?”
“হ, মানুষ আর রিকশা দুইটাই।”

মেয়ে মুনিয়া আবার একেবারে গর্বিত। একদিন স্কুলে নাকি বলেছে, “আমার আব্বা ঢাকায় গাড়ি চালায়।”
চান মিয়া শুনে বললেন, “ঠিকই তো। রিকশাও তো গাড়ি!”

গ্রামে ফিরে এলে তিনি একেবারে অন্য মানুষ। সকালে মাঠে যান, দুপুরে ঘরে ফিরে ভাত খান। একদিন স্ত্রী রহিমা বেগম রাগ করে বললেন,
“তুমি ঢাকায় গিয়ে ঠিকমতো খাও তো?”
চান মিয়া বললেন, “খাই না মানে? ভাত খাই, ডাল খাই, কষ্ট খাই।”
রহিমা চুপ করে ছিলেন। তারপর হেসে ফেললেন।

সন্ধ্যায় ঘাঘট নদীর পাড়ে বসে চান মিয়া ছেলেকে বলেন,
“দেখ, নদী কেমন চুপচাপ বয়। কিন্তু ভিতরে কত স্রোত।”
ছেলে জিজ্ঞেস করে, “তুমি কি নদীর মতো?”
চান মিয়া একটু ভেবে বলেন, “না রে, আমি রিকশার মতো। টান না দিলে চলে না।”

একদিন রায়হান বলল, “আব্বা, আমি বড় হয়ে অফিসার হব।”
চান মিয়া বললেন, “হবি, কিন্তু মনে রাখবি, অফিসার হইলে মানুষরে দাঁড় করাইয়া রাখিস না। আমি সারাদিন মানুষ দাঁড় করাইয়া রাখি, তাই জানি কষ্ট কেমন।”

সবাই হাসল। কিন্তু কথাটার ভেতরে একটু সত্যি ছিল।

চান মিয়ার জীবন খুব বড় কিছু না। নেই বড় বাড়ি, নেই ব্যাংক ব্যালেন্স। আছে শুধু শক্ত শরীর, সোজা কথা আর একগাদা জেদ।

তিনি বলেন,
“জীবন যদি রিকশা হয়, তাহলে হাসিটা হইলো ঘণ্টি। না বাজাইলে মানুষ রাস্তা ছাড়ে না।”

সুন্দরগঞ্জের মাটিতে তার পায়ের ছাপ আছে। উত্তরার রাস্তায় আছে তার ঘামের দাগ।
কিন্তু দুই জায়গাতেই একটা জিনিস একই থাকে — তার হাসি।

আর সেই হাসিটাই হয়তো তার সবচেয়ে বড় সিকিউরিটি মানি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

ঘুম গবেষক সুলেমান