আফরার একটা অদ্ভুত সমস্যা ছিল। তার চোখে পানি আসে বৃষ্টির আগেই। আকাশে মেঘ জমার আগেই। এমনকি কেউ যদি বলে, “ভালো করেছো”, তবুও।
আমাদের পাড়ায় তাকে কেউ “আফরা” বলে ডাকত না। সবাই বলত, “শ্রাবণ”। কারণ তার চোখে সবসময় বর্ষাকাল চলত।
ঘটনাটা শুরু স্কুল থেকে।
সেদিন পরীক্ষায় প্রশ্ন ছিল, “যেকোনো আটটি প্রশ্নের উত্তর দাও।” আফরা উত্তেজনায় দশটা দিয়ে ফেলল। খাতা জমা দেওয়ার পরেই তার মনে হলো, “আমি কি বেশি দিয়ে ফেললাম?”
তারপর যা হওয়ার তাই। চোখে পানি। নাক লাল। মুখ কাঁপছে।
ক্লাসের ছেলেমেয়েরা ভেবেছিল কেউ বোধহয় তাকে বকেছে। একজন তো চুপিচুপি এসে বলল,
“কে মারছে বলো, আমরা আছি।”
আফরা কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমি... দশটা উত্তর দিয়েছি...”
পুরো ক্লাস পাঁচ সেকেন্ড চুপ। তারপর একসাথে “হাঁ?”
স্যার খাতা দেখে বললেন, “আরে বাবা, বেশি লিখলে দোষ কী?”
আফরা মাথা নাড়ল। “না স্যার, নিয়ম ছিল আটটা…”
স্যার হেসে বললেন, “তাহলে আমি ভালো আটটা দেখেই নম্বর দেবো। বাকি দুটো তোমার উৎসাহের জন্য।”
কিন্তু সমস্যা হলো, স্যার এত সুন্দর করে কথা বললেন যে আফরার কান্না আরো বেড়ে গেল। কারণ তাকে কেউ বকেনি। বরং প্রশংসা করেছে।
পাড়ার মানুষজনও কনফিউজড।
কেউ যদি বলে, “তুমি খুব ভালো মেয়ে”, সে কাঁদে।
কেউ যদি বলে, “তুমি একটু বেশি ইমোশনাল”, সে কাঁদে।
কেউ যদি চুপ থাকে, তবুও কাঁদে।
তার ছোট বোন আফতাব একেবারে উল্টো। সে ব্রিটিশদের মতো ক্যালকুলেটেড। মুখে সবসময় হালকা হাসি।
একদিন আফতাব বলল, “আপু, তুমি কি কান্নার সাবস্ক্রিপশন নিয়েছো? মাসে কত জিবি?”
আফরা ওখানেই ফুঁপিয়ে উঠল।
আফতাব তখন শান্ত গলায় বলল, “আচ্ছা আচ্ছা, আমি মজা করলাম। এবার কাঁদো না।”
কিন্তু সে তো কাঁদছেই।
তার মা বলেন, “মেয়েটা খুব নরম।”
বাবা বলেন, “আমার ল্যাপটপের থেকেও সেনসিটিভ।”
একদিন পাড়ার এক খালাম্মা খুব আবেগ নিয়ে বললেন, “তোমার মতো মেয়ে আজকাল দেখা যায় না।”
আফরা ভাবল, “আমি কি বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতি?”
তারপর আবার কান্না।
আসল মজাটা হলো, সে কারও দায়িত্ব এড়ায় না। দুই বোনের মধ্যে বড় সে। বাসায় বাজার আনতে হবে? আফরা।
মায়ের প্রেসক্রিপশন নিয়ে ফার্মেসিতে যেতে হবে? আফরা।
আফতাবের প্রজেক্ট বানাতে হবে? সেটাও আফরা।
কিন্তু কাজ করতে করতে যদি কেউ বলে, “তুই না থাকলে কী হতো”, তখনই সে থেমে গিয়ে দেয়ালে তাকিয়ে থাকে। চোখ ভিজে যায়।
কারণ তার মনে হয়, সে কি সত্যিই এত দরকারি?
একবার স্কুলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তাকে উপস্থাপনা করতে দেওয়া হলো। মাইকে উঠে প্রথম লাইন বলল, “সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দ…”
তারপর গলাটা কেঁপে গেল।
কারণ সামনে বাবা বসে হাসছেন। গর্ব নিয়ে।
সে মাইকে দাঁড়িয়েই কাঁদতে শুরু করল।
পেছন থেকে স্যার ফিসফিস করে বললেন, “কাঁদতে কাঁদতেই বলো, আবেগ তো খারাপ না।”
আফরা কাঁদতে কাঁদতেই অনুষ্ঠান শেষ করল। অদ্ভুত ব্যাপার, সেদিনই সবাই সবচেয়ে বেশি হাততালি দিল।
পাড়ার লোকজন পরে বলল, “মেয়েটার ভেতরে কিছু আছে।”
কেউ বুঝল না ঠিক কী আছে।
আমি বুঝলাম, তার ভেতরে একটা নরম নদী আছে। একটু ছোঁয়া পেলেই ঢেউ ওঠে।
বড় হতে হতে আফরা বদলাল না। শুধু একটা জিনিস শিখল।
কাঁদা মানে দুর্বল হওয়া না।
কাঁদা মানে তার ভেতরের মানুষটা এখনও বেঁচে আছে।
এখন সে কলেজে পড়ে। মাঝে মাঝে নিজেই নিজের ওপর হাসে।
একদিন আফতাব বলল, “আপু, তুমি একদিন দেশের বড় কিছু হবে।”
আফরা এবারও কাঁদল।
তবে একটু কম।
হয়তো একদিন তার কান্না পুরোপুরি থামবে না।
কিন্তু সে এগিয়ে যাবে। দায়িত্ব নিয়ে। নিজের মতো করে।
কারণ পৃথিবীতে সবাই যদি আফতাবের মতো ক্যালকুলেটেড হয়, তাহলে শ্রাবণের দরকার পড়বে না।
আর শ্রাবণ না থাকলে, বৃষ্টি হবে কীভাবে? 🌧️



0 মন্তব্যসমূহ