কুকুর ও কবি সমাচার

 

মন্টি নামের কুকুরটির জীবন বেশ রহস্যময়। সাধারণ কুকুরদের নামের কোনো বালাই থাকে না। পাড়ার ছেলেরা ‘কুত্তা’ বলে ডাক দেয়, আর তারা লেজ নেড়ে চলে আসে। কিন্তু মন্টির ব্যাপারটা আলাদা। সে যখন ছোট, একদম তুলতুলে এক দলা পশম, তখন এক ছোট খুকি তাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে নাম রাখল ‘মন্টি’। সেই থেকে সে মন্টি। তার একটা আত্মসম্মানবোধ আছে। কেউ তাকে ভুল করে ‘কুত্তা’ ডাকলে সে এমনভাবে তাকায় যেন বলতে চায়, “আপনার রুচিবোধ দেখে আমি যারপরনাই লজ্জিত।”



মন্টির বাবার নাম কী, এটা একদিন পাশের পাড়ার এক সিনিয়র  কুকুর জানতে চেয়েছিল। মন্টি বেশ গম্ভীর হয়ে বলেছিল,

“আমার বাবা ছিলেন ভদ্র ধরনের কুকুর। তিনি কখনও অকারণে ঘেউ ঘেউ করতেন না। শুধু প্রয়োজন হলে।”

এই উত্তর শুনে সবাই চুপ। কারণ ভদ্র কুকুর এই এলাকায় বিরল প্রজাতি।

মন্টি আসলে খুবই ভদ্রগোছের প্রাণী। তবে তার একটা বিচিত্র স্বভাব আছে। একা থাকলে সে আকাশের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর মুখে ঘেউ ঘেউ করে। লোকে ভাবে সে ডাকছে, আসলে মন্টি তখন মনে মনে কবিতা লেখে। কুকুরের কবিতা মানুষের বোঝার সাধ্য নেই, তবে তার ছন্দ যে দারুণ, সেটা তার লেজ নাড়ানো দেখলেই বোঝা যায়।

মন্টি শুধু কবি নয়, সে একজন পুরোদস্তুর সমাজকর্মী। পাড়ার কুকুরদের মধ্যে যখন ঝগড়া বাঁধে, মন্টি সেখানে উপস্থিত হবেই।

দুই দল কুকুর যখন দাঁত মুখ খিঁচিয়ে মারামারি করতে যায়, মন্টি মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ায়।

সে হালকা একটা শব্দ করে বোঝাতে চায়, “ভাইসব, ঝগড়া করে কী হবে? জীবনটা তো ছোট।”

মারামারি চরমে উঠলে সে এমন এক বিশেষ ভঙ্গিতে তাকায় যে বড় বড় গুন্ডা কুকুরগুলোও লজ্জা পেয়ে যায়।


শেষে সে লেজ নেড়ে অপরাধী কুকুরটাকে ক্ষমা করে দেওয়ার জন্য ইশারা করে।

সবাই শান্ত হলে সে একটা হাই তুলে পার্কে নিজের জায়গায় গিয়ে শুয়ে পড়ে। যেন এক মস্ত বড় সালিশ শেষ করে মুরুব্বি মানুষটি বিশ্রামে গেলেন।

মন্টির খাদ্যাভ্যাস বেশ রাজকীয়। রাস্তার ময়লা আবর্জনা সে ছুঁয়েও দেখে না। পার্কের পাশেই ‘আজওয়া’ নামের একটা খাবারের দোকান আছে। সেখানকার মালিক মন্টি সাহেবের ভক্ত। একদিন এক বড়লোক খদ্দের শখ করে মন্টিকে একটা আস্ত বার্গার কিনে দিল। মন্টি প্রথমে কিছুক্ষণ বার্গারটার দিকে তাকিয়ে রইল। সে ভাবছিল, “মানুষের বুদ্ধিশুদ্ধি এত বাড়ে কী করে? পাউরুটির ভেতরে মাংসের কাবাব, তার ওপর চিজের প্রলেপ—অসাধারণ!”

সেদিন বার্গারটা খেয়ে মন্টি উপলব্ধি করল, সাধারণ হাড় চিবিয়ে জীবন কাটানো আসলে সময়ের অপচয়। এখন মাঝে মাঝে সে দোকানের সামনে গিয়ে এমন করুণ চোখে তাকিয়ে থাকে যে, কোনো না কোনো দয়ালু মানুষ তাকে মজার কিছু একটা কিনে দেয়। খেয়ে সে আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা ধন্যবাদ সূচক শব্দ করে। হয়তো সৃষ্টিকর্তাকে বলে, “বার্গারটা ভালো ছিল, তবে সসটা একটু বেশি হলে মন্দ হতো না।”

ও হ্যা  মন্টির কিন্তু  রোমান্টিক মুডও আছে।

পার্কে একটা সাদা কুকুরী আসে। নাম কেউ জানে না। মন্টি চুপচাপ তাকিয়ে থাকে।

কিছু বলতে পারে না। শুধু ঘেউ করে।

ওই সাদা কুকুরী ভাবে, মন্টি খুব দার্শনিক।

আসলে সে লাজুক।

একদিন বৃষ্টি হচ্ছিল। সবাই ছুটোছুটি করছে। মন্টি ভিজে এক কোণে দাঁড়িয়ে।

হঠাৎ সেই ছোটবেলার বাচ্চা মেয়েটা এসে বলল, “মন্টি, ভিজিস না।”

একটা পুরোনো ছাতা তার মাথার উপর ধরল।

মন্টির মনে হলো, পৃথিবীতে এখনও ভালোবাসা আছে।

সেদিন সে ঝগড়া মিটাতে  যায়নি। কবিতাও লেখেনি। শুধু চুপচাপ ছিল।

রাতে অন্য কুকুরেরা জিজ্ঞেস করল,

“কি রে, আজ এত চুপ কেন?”

মন্টি গম্ভীর হয়ে বলল,

“জীবনটা আসলে খুব জটিল। মানুষ ছাতা দেয়, আবার পাথরও ছোড়ে।”

তারপর একটু থেমে যোগ করল,

“তবে বার্গার দিলে সব ভুলে যাই।”


মন্টির জীবন খুব বড় কিছু না। তবু তার মধ্যে এক ধরনের নাটকীয়তা আছে।

সে  প্রেম করে, কবিতা লেখে, ঝগড়া মেটায়, আর মাঝেমধ্যে বড়লোকি বার্গার খায়।


রাতে পার্ক ফাঁকা হলে সে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে।

মনে হয় ভাবছে,

“আমি যদি মানুষ হতাম?”

তারপর নিজেই উত্তর দেয়,

“না, মানুষ হলে এত স্বাধীনভাবে ঘেউ করতে পারতাম না।”



শেষরাতে সে আবার দুলে দুলে ঘেউ করে।

ওই ঘেউয়ের মধ্যে আছে একটু অভিমান, একটু আনন্দ, আর একটু বার্গারের স্বাদ।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

ঘুম গবেষক সুলেমান