আমাদের পাড়ার এক পলিটিশিয়ানের বাড়িতে একটা বিড়াল থাকত। নাম কিসিঞ্জার।
বিড়ালটা সাধারণ বিড়াল ছিল না। ও ছিল “রাজনৈতিকভাবে সচেতন” বিড়াল।
কিসিঞ্জার ছোটবেলা থেকেই মালিকের সব কাজ খুব মন দিয়ে দেখত।
পলিটিশিয়ান সাহেব সকালে চা খেতে খেতে ফোনে বলতেন,
“ওদের সাথে একটু ঝগড়া লাগাও… তারপর আমি এসে মীমাংসা করব।”
কিসিঞ্জার পাশেই বসে ভাবত,
“বাহ! ঝগড়া লাগিয়ে আবার হিরো হওয়া যায়! দারুণ আইডিয়া।”
ড্রয়িংরুমের সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে কিসিঞ্জার তখন পাশের বাড়ির হুলো বিড়াল 'টাইগার'কে বোঝাচ্ছিল। টাইগারের বুদ্ধি হাঁটুতে, সে শুধু চ্যাঁচাতে জানে।
কিসিঞ্জার হাই তুলে বলল, "টাইগার, তুই যে সারাদিন ম্যাও ম্যাও করে পাড়া মাথায় করিস, এতে কি তোর স্ট্যাটাস বাড়ে? বাড়ে না। পলিটিক্স হলো ইশারা-ইঙ্গিতের খেলা। তুই যখন কারো রান্নাঘরে যাবি, চুরি করবি না। সেটা হবে 'জনগণের হক আদায়'। মাছটা মুখে নিয়ে দৌড় দেওয়ার সময় মনে রাখবি, তুই পালাচ্ছিস না, তুই আসলে একটা স্ট্র্যাটেজিক রিট্রিট করছিস।"
টাইগার হাঁ করে তাকিয়ে রইল। সে বলল, "কিন্তু ভাই, গৃহকর্ত্রী যখন ঝাড়ু নিয়ে আসে?"
কিসিঞ্জার চোখ বন্ধ করে উত্তর দিল, "তখন তুই বলবি, এটা হলো বিরোধী দলের দমন-পীড়ন। তুই যখন মার খাবি, তখন পাড়ার অন্য বিড়ালদের বলবি— দেখ, আমি তোমাদের জন্য রক্ত দিচ্ছি। ব্যাস, পরদিন থেকে দেখবি সবাই তোকে লিডার মানছে। পলিটিশিয়ানরা এভাবেই টিকে থাকে। মার খেয়েও বলে, আমরা বিজয়ী!"
লবিং এবং ডেমোক্রেসি
এক রাতে ছাদে একটা জরুরি মিটিং বসল। এলাকার সব বিড়াল এসেছে। এজেন্ডা হলো— 'ডাস্টবিনের দখল কার হাতে থাকবে?'
কিসিঞ্জার লেজটা সপাং করে মেঝেতে বাড়ি দিয়ে বলল, "দেখো হে বিড়াল সমাজ, আমরা এখন একটা ক্রান্তিকাল পার করছি। ডাস্টবিনে যে মুরগির হাড়গুলো পড়ে আছে, ওগুলো নিয়ে লড়াই করা মানে হলো সিভিল ওয়ার। আমরা কি গৃহযুদ্ধ চাই?"
সবাই সমস্বরে বলল, "না!"
কিসিঞ্জার বলল, "ভেরি গুড। তাহলে আমরা একটা সাব-কমিটি গঠন করব। আমি হবো সেই কমিটির আজীবন চেয়ারম্যান। আর টাইগার হবে সিকিউরিটি ইনচার্জ। আমরা ডাস্টবিনটাকে তিন ভাগে ভাগ করব। সামনের অংশটা হলো ভিআইপি জোন, যেখানে আমি খাব। মাঝখানেরটা হলো আমজনতা জোন, সেখানে তোমরা লটারি করবে। আর পেছনের অংশটা হবে ফিউচার ফান্ড, যা কোনোদিন কেউ পাবে না, কিন্তু সবাই আশা নিয়ে বসে থাকবে। একেই বলে ডেমোক্রেসি।"
পুঁটি বিড়ালটা একটু ত্যাঁদড় টাইপের। সে বলল, "ভাই, আপনার ভাগেরটা আপনি একাই খাবেন?"
কিসিঞ্জার একটা দার্শনিক হাসি দিল। "পুঁটি, তুই বুঝবি না। লিডার যদি না খেয়ে শুকিয়ে মরে, তবে তোদের রিপ্রেজেন্ট করবে কে? আমি মোটা হওয়া মানে হলো বিড়াল জাতির সমৃদ্ধি হওয়া। এটা হলো ট্রিকল-ডাউন ইকোনমি। ওপরের দিকে খাবার জমলে নিচ দিয়ে দু-এক ফোঁটা চুইয়ে পড়বেই। তোরা সেই চুইয়ে পড়া ঝোল খেয়ে ধন্য হবি।"
পরিণতির ট্র্যাজেডি
মুনতাসির সাহেবের পতনের পর কিসিঞ্জারের এই সব থিওরি আর কাজে লাগল না। একদিন ক্ষুধার্ত কিসিঞ্জার একটা আধখাওয়া পাউরুটি নিয়ে পালাচ্ছিল। টাইগার তাকে ধরে ফেলল।
টাইগার গর্জন করে বলল, "কিসিঞ্জার ভাই, আপনি না বলেছিলেন চুরির সময় পালানো মানে স্ট্র্যাটেজিক রিট্রিট? এখন তো আপনি আমাদের এলাকা থেকে রিট্রিট করছেন!"
কিসিঞ্জার শুকনো মুখে বলল, "টাইগার, পলিটিক্সে কোনো চিরস্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নেই। আজ তুই আমাকে ছেড়ে দে, কাল তোকে আমি মেয়রের বিড়াল বানিয়ে দেব।"
টাইগার হাসল। সেই হাসিটা খুব ভয়াবহ। সে বলল, "কিসিঞ্জার ভাই, পলিটিশিয়ানের কাছে থাকলে আতরের গন্ধ লাগে ঠিকই, কিন্তু দুর্গন্ধটা যখন ছড়ায়, তখন আতরও হার মেনে যায়। আপনি আমাদের অনেক স্বপ্ন দেখিয়েছেন, এখন নিজে সেই স্বপ্ন চিবিয়ে খান।"
কিসিঞ্জার বুঝল, যে জালে সে অন্যকে আটকেছে, আজ সেই জালে সে নিজেই আটকা পড়েছে। মানুষকে বোকা বানানো যায়, কিন্তু ক্ষুধার্ত বিড়ালকে থিওরি দিয়ে ভোলানো যায় না।কিসিঞ্জার একটু চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
বিড়ালদের একটা মজার স্বভাব আছে—যার সাথে বেশি ঘোরে, একটু একটু করে তার মতোই হয়ে যায়।
আতরের দোকানে বসা বিড়ালের গায়ে যেমন হালকা সুগন্ধ লাগে,
তেমনি রান্নাঘরের ধোঁয়ার পাশে থাকা বিড়ালের চোখও মাঝে মাঝে জ্বলে।
কিসিঞ্জার সেদিন চুপ করে বসে বুঝল—
সে এতদিন পলিটিশিয়ানের বাড়িতে থেকে থেকে
পলিটিশিয়ানের অনেক কৌশলই শিখে ফেলেছে।
বিড়াল তো শুধু মাছ চুরি করতে শেখে,
কিন্তু সে শিখে ফেলেছে ঝগড়া লাগানো, দল বানানো আর বক্তৃতা দেওয়া।
কিসিঞ্জার লেজ নেড়ে একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
মনে মনে বলল—
“বিড়াল হয়ে মাছ চুরি করা মন্দ না…
কিন্তু বিড়াল হয়ে রাজনীতি শেখাটা বোধহয় একটু বেশি হয়ে গেল।”



0 মন্তব্যসমূহ