মধ্যবিত্তের দিনলিপি

 ঢাকা শহরে মধ্যবিত্তের দুপুরগুলো বড় অদ্ভুত হয়। টিনের চালে চড়ুই পাখির লাফালাফি আর রাস্তার ওপাশ থেকে আসা আইসক্রিমওয়ালার ঘণ্টার আওয়াজ, মাঝে মাঝে কাগজ ক্রেতার লম্বা করে ডাক এইই কাগজ সব মিলেমিশে এক ধরণের তন্দ্রা তৈরি করে।


 আনিস সাহেব সেই তন্দ্রার ভেতরে বসে পুরোনো এক দেয়াল ঘড়ি মেরামত করছেন। ঘড়িটা উনার বাবার আমলের। তার হাত কাঁপছে বয়সের ভারে, কিন্তু একাগ্রতার কমতি নেই।

উনার মেয়ে নীলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছিল। নীলা এ বছর বিসিএস দিচ্ছে। আনিস সাহেব গত কয়েক মাস ধরে ঠিকমতো বাজার করেন না, গায়ে একটা সস্তা মলিন ফতুয়া চড়িয়ে ঘুরে বেড়ান। নীলার খুব মেজাজ খারাপ হয়। সে ভাবে, বাবা রিটায়ারমেন্টের টাকাগুলো নিশ্চয়ই কোনো আজেবাজে জায়গায় খরচ করে ফেলেছেন। এখন মেয়েকে ঠিকমতো একটা ভালো কোচিংয়ে ভর্তি করার টাকা দিতেও উনার কার্পণ্য।

নীলার মা রাবেয়া খাতুন রান্নাঘর থেকে বের হয়ে এসে বললেন, "ঘড়িটা নিয়ে আর কতক্ষণ বসে থাকবে? ওটা তো নষ্ট হয়েই গেছে।"


আনিস সাহেব চশমার ওপর দিয়ে একবার তাকালেন। কিছু বললেন না। এই মানুষটার নীরবতা নীলার কাছে ইদানীং খুব বিরক্তিকর লাগে। সে একদিন বলেই ফেলল, "বাবা, আমার ফর্ম ফিলাপের টাকা লাগবে। তুমি কি জানো না আমার সামনে কত বড় পরীক্ষা? অথচ তুমি এই ভাঙাচোরা ঘড়ি নিয়ে পড়ে আছো!"

আনিস সাহেব পকেট থেকে গুনে গুনে কয়েকটা পাঁচশ টাকার নোট বের করে দিলেন। টাকাগুলো খুব কুঁচকানো, যেন অনেকদিন ধরে কোথাও লুকানো ছিল।

মাস চারেক পর নীলার পরীক্ষার রেজাল্ট দিল। সে টিকে গেছে। খুশিতে আত্মহারা হয়ে সে যখন বাসায় ফিরল, দেখল ঘরে সেই পুরোনো ঘড়িটা নেই। সেই জায়গায় দেয়ালটা একদম ফাঁকা। আনিস সাহেবকেও বাসায় দেখা যাচ্ছে না।

রাবেয়া খাতুন সোফায় বসে কাঁদছেন। নীলা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, "মা, তুমি কাঁদছ কেন? আর বাবা কোথায়?"

মা আঁচলে চোখ মুছে বললেন, "তোর বাবা হাসপাতালে। উনার চোখের অপারেশন হচ্ছে।"

নীলা থমকে গেল। "অপারেশন? বাবার চোখে সমস্যা কবে থেকে?"

রাবেয়া খাতুন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "অনেকদিন। গত এক বছর ধরে তোর বাবা একটা চোখে প্রায় দেখেন না বললেই চলে। ডাক্তার বলেছিলেন দ্রুত অপারেশন করতে, অনেক টাকা লাগবে। কিন্তু তোর বাবা রাজি হননি। তিনি বলতেন, 'আমার দেখার চেয়ে নীলার ভবিষ্যৎ দেখা বেশি জরুরি'। তোর কোচিংয়ের টাকা, ফর্ম ফিলাপের টাকা—সব তিনি জমিয়েছিলেন নিজের চিকিৎসার টাকা বাঁচিয়ে।"

নীলা স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে ভাবত বাবা কৃপণ হয়ে গেছেন, অথচ বাবা নিজের আলো বিসর্জন দিয়ে মেয়ের জন্য আলো কিনছিলেন।

মা আরও বললেন, "তোর বাবা দিনের পর দিন ঐ নষ্ট ঘড়িটা নিয়ে বসে থাকতেন কারণ ঐ ঘড়ির ভেতরের দামী পিতলের যন্ত্রাংশগুলো তিনি এক পুরোনো ঘড়ি সংগ্রাহকের কাছে বিক্রি করার চেষ্টা করছিলেন। আজ সকালে সেই লোকটা এসে ঘড়িটা নিয়ে গেছে, আর সেই টাকা নিয়ে তোর বাবা সরাসরি হাসপাতালে চলে গেছেন যাতে তোর ওপর কোনো বোঝা না পড়ে।"

নীলার মনে হলো আকাশের সব নক্ষত্র যেন একসাথে তার মাথার ওপর ভেঙে পড়েছে। সে বুঝতে পারল, বাবা-মায়ের ভালোবাসা কোনো রেসিপি মেপে হয় না। এটা হচ্ছে বাতাসের মতো, যা দেখা যায় না কিন্তু বেঁচে থাকার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

বিকেলে হাসপাতালে গিয়ে নীলা দেখল আনিস সাহেবের চোখে ব্যান্ডেজ। সে বাবার পাশে গিয়ে হাতটা ধরল। আনিস সাহেব অস্ফুট স্বরে বললেন, "নীলা মা, ঘড়িটার টিকটিক শব্দ কি শোনা যায়? সময় কিন্তু কারও জন্য থেমে থাকে না।"



নীলা বাবার হাতে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। সে জানে, সময় হয়তো থেমে থাকে না, কিন্তু কিছু মানুষের আত্মত্যাগ সময়কে হার মানিয়ে অমর হয়ে থাকে।

ছেলে মেয়েদের কখনো অভিযোগ করা উচিৎ না তোমরা আমাকে কিছুই দাওনি, কারণ তারা তাদের সর্বোচ্চটাই দিতে চেষ্টা করেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

ঘুম গবেষক সুলেমান