বাঘের চোখে জমে থাকা বিষন্নতা

 

সায়েম খুব বেশি কথা বলে না। সবাই ভাবে ছেলেটা ইন্ট্রভার্ট ।  যে বাচ্চা কম কথা বলে, সে ভিতরে ভিতরে পুরো সংসদ বসিয়ে রাখে। যারা চুপচাপ থাকে কথা কম বলে  তাদের আমাদের গ্রামের ভাষায় বলা হয় নিমচা  শয়তান,এই  কিসিমের মানুষেরা   ভিতরে ভিতরে অনেক দুষ্ট থাকে কিন্তু বাহিরে দেখায় যে ভাজা মাছটা উল্টিয়ে খেতে জানে না. সায়েম  আসলে কি ধরনের এখনই  ঠিক বোঝা যাচ্ছে না বড় হলে দাড়ি মোচ গজালে বুঝা যাবে আসলে কেমন ধরনের গতি বিধি 



সেদিন ছিল শুক্রবার। সায়েমের বাবা ঘোষণা দিলেন, “চলো, আজ আমরা চিড়িয়াখানায় যাব।”

ঘোষণাটা এমনভাবে দিলেন যেন প্লেনে করে  ভুটান সফরে নিয়ে  যাচ্ছেন ।উনি বোধ হয় ভাবছিলেন হুররে করে সবাই হাতে তালি  দেবে।   

চিড়িয়াখানায় ঢুকেই সায়েমের চোখ গোল। হরিণ দেখল, বানর দেখল, এক জায়গায় দাঁড়িয়ে একটা উটকে এমনভাবে দেখছিল যেন উটটাই ভুল করে পৃথিবীতে এসেছে। কিন্তু আসল ঘটনা ঘটল বাঘের খাঁচার সামনে।

বাঘটা হাঁটছিল ধীর পায়ে। তার হাঁটার মধ্যে একটা বিরক্ত ভাব আছে। যেন সে বলছে, “মানুষগুলো সারাদিন তাকিয়ে থাকে,প্রেমিক প্রেমিকার দিকেও বোধ হয়  এভাবে তাকায় তাকায় না, কাজকর্ম কিছু নেই নাকি ?”

সায়েমের বাবা গম্ভীর গলায় বললেন,

“দেখো সায়েম, বাঘ ককিন্তু খুব  ভয়ংকর প্রাণী। খুব হিংস্র। খৎ করে মানুষ খেয়ে ফেলে।”

বাবারা কেন জানি এই ‘খেয়ে ফেলে’ কথাটা খুব পছন্দ করেন। যেন প্রতিটা প্রাণীর চূড়ান্ত কাজই মানুষ খাওয়া।

সায়েম চুপ করে ছিল। তারপর হঠাৎ বাবার হাত শক্ত করে ধরল। তার চোখে পানি টলমল করছে।




বাবা নরম গলায় বললেন,

“কী হয়েছে বাবা?”

সায়েম কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,

“বাবা… এই বাঘ যদি তোমাকে খেয়ে ফেলে…?”

বাবা একটু আদুরে হেসে বললেন,

“তাহলে কী হবে?”

সায়েম এক সেকেন্ড ভেবে, খুব বাস্তব চিন্তা করে বলল,

“আমি বাসায় যাব কীভাবে? ভ্যা…”

বাঘের হিংস্রতা নয়, বাবার জীবন নয়, ছেলের মূল দুশ্চিন্তা হলো লজিস্টিক সমস্যা। পরিবহন সংকট।

সায়েমের বাবা একটু থমকে গেলেন। মনে হলো তিনি আশা করেছিলেন ছেলে বলবে, “আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি।”

কিন্তু ভালোবাসার চেয়েও জরুরি হলো বাসায় ফেরা।

পাশে দাঁড়ানো এক আন্টি ফিক করে হেসে ফেললেন। বাঘটাও যেন একটু থামল। হয়তো ভাবছে, “মানুষের বাচ্চাগুলোও কম যায় না।”

সায়েমের যুক্তি কিন্তু পরিষ্কার। বাবা খেয়ে গেলে সমস্যা একটাই না।

১. বাসায় যাবে কীভাবে।

২. মা জিজ্ঞেস করলে কী বলবে।

৩. টিফিন বক্সটা কার কাছে আছে।

এই বয়সে বাচ্চারা এমনসব জিনিস ভাবে যা বড়রা ভাবতেই পারে না। বড়রা সবকিছু নাটকীয় করে ফেলে। বাচ্চারা করে বাস্তব।

ফেরার পথে সায়েম চুপচাপ ছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম,

“তুমি ভয় পেয়েছিলে?”

সে মাথা নাড়ল।

তারপর ধীরে বলল,

“বাঘটা দুঃখী ছিল।”

আমি চমকে গেলাম।

“কেন?”

সে বলল,

“ওর বাসায় যাওয়ার রাস্তা নেই।”



এই এক বাক্যে আমার পুরো দর্শন বদলে গেল। আমরা যাকে হিংস্র ভাবি, সে হয়তো বন্দি। আমরা যাকে শক্তিশালী ভাবি, সে হয়তো একা।

সায়েম কথা কম বলে ঠিকই, কিন্তু মাঝে মাঝে এমন একটা কথা বলে বসে যে মনে হয়, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয়টা ওর মাথার ভেতর।

সেদিনের পর থেকে বাঘ দেখলে আমি আর শুধু দাঁত দেখি না। খাঁচাটাও দেখি। আর মনে পড়ে যায় ছোট্ট একটা ছেলে, যার সবচেয়ে বড় চিন্তা ছিল বাসায় ফেরা।

সত্যি বলতে কী, আমাদের সবারই ভেতরে একটা সায়েম আছে।বাচ্চাদের  বুদ্ধি  ছোট নয়—তারা শব্দ কম ব্যবহার করে, কিন্তু অনুভূতি বেশি  আর সত্যিটা অনেক সময় আমাদের চেয়ে গভীরভাবে দেখে ফেলে।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

ঘুম গবেষক সুলেমান