ছিঁচকে চোর এর সুন্দরী বউ

আমাদের গ্রামের নাম ছিল মোল্লাপাড়া। নাম শুনে মনে হতে পারে সবাই বড় ধার্মিক,নামাজ কালাম তসবি জপা এগুলোই তাদের কাজ । আসলে মানুষজন মোটামুটি, শুধু একজন ব্যতিক্রম ছিল। তার নাম আজিজুল, তাকে গ্রামে সবাই ডাকত “আজু চোর”।

আজু ছিল ছিঁচকে চোর, কিন্তু এক অদ্ভুত ব্যাপার ছিল—ওর চুরির চেয়ে ওর কথাবার্তা বেশি বিখ্যাত। ধরা পড়লে এমন সব কথা বলত যে, লোকজন রাগ করতে গিয়ে হাসতে হাসতে পেট ধরে বসে যেত।



একদিন হাট থেকে এক ভদ্রলোকের হাঁস চুরি করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়ল।আজু চোরের স্বভাবটা ছিল একটু অন্যরকম। দুনিয়ার সব চোর যখন ধরা পড়ে মার এড়াতে কান্নাকাটি করে, আজু তখন হাসি দিয়ে এমন এক একটা লজিক দাঁড় করায় যে মারধর তো দূরে থাক, লোকজন হাঁ করে তার কথা শোনে।

সেদিন হাটে যে ঘটনাটা ঘটল, সেটা বেশ ইন্টারেস্টিং। আজু এক মুরুব্বি গোছের লোকের বগলের তলা থেকে জ্যান্ত একটা রাজহাঁস সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করছিল। কিন্তু হাঁসটা ছিল বড্ড বেয়াদব। ঠিক মোক্ষম সময়ে প্যাক প্যাক করে ডেকে উঠল। মুরুব্বি হাতেনাতে আজুর কলার ধরে ফেললেন।

চারপাশে নিমেষেই ভিড় জমে গেল। কেউ বলল, "শালা চোর! আজ এরে মেরেই ফেলব।" কেউ আবার কাফনের কাপড়ের দাম নিয়ে আলাপ শুরু করে দিল।

আজু বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। সে শান্ত গলায় বলল, "চাচা, কলারটা ছাড়েন। আপনার হার্টের সমস্যা থাকতে পারে, বেশি উত্তেজনা শরীরের জন্য ভালো না।"

মুরুব্বি গর্জে উঠলেন, "হারামজাদা! আমার হাঁস চুরি করে এখন আবার ডাক্তারী ফলানো হচ্ছে? এই হাঁস তুই নিচ্ছিলি কেন?"

আজু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "চাচা, বিশ্বাস করেন আর নাই করেন, আমি চুরি করছিলাম না। আমি আসলে হাঁসটার ইন্টারভিউ নিচ্ছিলাম।"

ভিড়ের মধ্যে থেকে একজন বলে উঠল, "হাঁসের ইন্টারভিউ! বলিস কী রে?"

আজু মাথা চুলকে বলল, "জ্বি ভাই। আমার ছোটবেলা থেকেই শখ আমি পশুপাখির ভাষা বুঝব। এই হাঁসটা যেভাবে আপনার বগলের তলায় ডানা ঝাপটাচ্ছিল, আমার মনে হলো ও খুব ডিপ্রেশনে আছে। ও আপনার কাছে সুখী কি না, সেটা জানার জন্যই একটু আড়ালে নিয়ে যাচ্ছিলাম। জনসম্মুখে তো আর এসব সেনসিটিভ কথা বলা যায় না।"

মুরুব্বি অবাক হয়ে বললেন, "তোর ইন্টারভিউ নেওয়া শেষ? হাঁস কী বলল শুনি?"

আজু গম্ভীর মুখে বলল, "হাঁস বলল যে আপনি ওকে ঠিকমতো খেতে দেন না। আর সবচেয়ে বড় কথা, আপনি নাকি ওকে কাল রাতে জবাই করে খিচুড়ি খাওয়ার প্লান করছিলেন। এই ভয়ে বেচারা হার্টফেল করতে যাচ্ছিল। আমি ওকে একটু সান্ত্বনা দিতে চেয়েছিলাম। এখন আপনি যদি মনে করেন এটা চুরি, তবে আপনি আমাকে পুলিশে দিতে পারেন। কিন্তু একটা নিরীহ প্রাণীর আর্তনাদ শোনা কি খুব বড় অপরাধ?"আমি মানবজাতির কাছে এ প্রশ্নটা রেখে যেতে চাই

চারপাশের মানুষজন হাসবে না রাগ করবে বুঝতে পারল না। মুরুব্বি লোকটা কিছুক্ষণ আজুর দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাত্‍ করেই খিলখিল করে হেসে দিলেন। তিনি বললেন, "তোর মতো এতো বড় মিথ্যেবাদী আর বাচাল আমি জন্মে দেখিনি। যা ভাগ! হাঁস নিয়ে ইন্টারভিউ দিতে হবে না।"

আজু ভিড় ঠেলে চলে যাওয়ার সময় বিড়বিড় করে বলল, "মানুষ বড়ই অদ্ভুত। সত্য কথা বললে কেউ বিশ্বাস করে না, অথচ একটু গুছিয়ে মিথ্যে বললে সবাই খুশিতে গদগদ হয়ে যায়।"


আজুর চুরির নেশার চেয়েও বড় নেশা ছিল মানুষের মন বোঝা। কিন্তু মন বুঝতে গিয়ে নিজেই যে একদিন ধরা পড়ে যাবে, সেটা সে কল্পনাও করেনি। সেই ঘটনাটাই আজুর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল।

আজু চোর হলেও তার হৃদয়ের কোণায় একটা সূক্ষ্ম হাহাকার ছিল। সে ভাবত, দুনিয়ার সব মানুষের জন্য কেউ না কেউ অপেক্ষা করে, অথচ সে যখন গভীর রাতে পাঁচিল টপকায়, তার জন্য কেউ এক গ্লাস পানি  নিয়ে বসে থাকে না। এই 'কেউ না কেউ' এর অভাবটাই ছিল আজুর বড় দুঃখ।



একদিন বর্ষার রাতে আজু গেল নীলগঞ্জ গ্রামের মাস্টার সাহেবের বাড়ি। ঘরের জানলাটা একটু ফাঁক ছিল। আজু সন্তর্পণে ভেতরে ঢুকল। কিন্তু আলমারি খোঁজার বদলে তার চোখ আটকে গেল তক্তপোশে বসে থাকা এক অপরূপ সুন্দরী তরুণীর দিকে। মেয়েটির নাম নীলু। নীলু অন্ধ, সে চোখে দেখে না। কিন্তু তার শ্রবণশক্তি প্রখর।

নীলু শান্ত গলায় বলল, "কে? আজু ভাই? আজ আসতে এত দেরি হলো কেন?"

আজু তো থমকে গেল। সে তো আগে কোনোদিন এখানে আসেনি। সে ফিসফিস করে বলল, "আপনি আমাকে চেনেন?"

নীলু হাসল। অন্ধকার ঘরে সেই হাসি দেখে আজুর মনে হলো, চুরি করা বড় পাপ। নীলু বলল, "আপনার গায়ের গন্ধ চেনা। বৃষ্টির দিনে মাটির সোঁদা গন্ধ আর বিড়ির গন্ধ মিশে এক অদ্ভুত ঘ্রাণ হয় আপনার। আমি রোজ রাতে জানলার পাশে বসে আপনার পায়ের শব্দ শুনি। আপনি পাশের বাড়ির আমগাছ থেকে আম পেড়ে নেন, আমি জানি।"

আজু থতমত খেয়ে বলল, "আমি তো আসলে... মানে..."

"আপনি তো চোর, তাই না?" নীলু খুব সহজভাবে প্রশ্নটা করল। "কিন্তু চোর হলেও আপনি মানুষটা খুব ভালো। কারণ আপনি যখন আম পাড়েন, তখন খুব সাবধানে পা ফেলেন যাতে গাছের নিচে শুয়ে থাকা কুকুরটার ঘুম না ভাঙে।"

আজুর জীবনে এর আগে কেউ তাকে নিয়ে এত গভীর চিন্তা করেনি। তার চোখে জল চলে এল। সে বলল, "আমি আর চুরি করব না নীলু। কিন্তু আমি তো অন্য কিছু জানি না।"

নীলু বলল, "জানতে হয় না। মানুষ ইচ্ছা করলে অনেক কিছু পারে। আপনি কাল থেকে আমাদের বাগানে কাজ করবেন? আমার বাবা একজন ভালো মানুষ খুঁজছেন।"

জীবনের নতুন শুরু আজু চোর থেকে হয়ে গেল মালী। তার সেই বাচাল স্বভাবটা কিন্তু গেল না। সে যখন গাছে জল দেয়, তখন গোলাপ ফুলের সাথে রাজনীতি নিয়ে আলাপ করে। নীলু পাশে বসে হাসে।

গ্রামের মানুষ এখনো তাকে 'আজু চোর' বলেই ডাকে, কিন্তু সেটা এখন আর গালি নয়, বরং আদরের ডাক। আজু এখন আর কারো ঘরে সিধ কাটে না, বরং নীলুর মনের ঘরে পাকাপাকিভাবে সিঁধ কেটে বসে আছে।

মাঝে মাঝে আজু আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, "চুরি বিদ্যা বড় বিদ্যা যদি ধরা না পড়ো। আর আমি ধরা পড়লাম এমন একজনের কাছে, যে চোখেই দেখে না। কুদরত! সবই কুদরত!" কুদরতে এলাহী!

নীলু দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আলতো ধমকের সুরে বলে, "আবার শুরু হলো আপনার পাগলামি? ঘরে আসেন, চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। নিজের ঘরের মানুষের হাতে এক কাপ চা খাওয়ার জন্য তো সারা জীবন চোর হয়ে ঘুরে বেড়ালেন, এখন চা রেডি থাকলেই যত দেরি!"



আজু হাসে। এই নীলুই তাকে অন্ধকার থেকে টেনে এনে নিজের আলোয় ভাসিয়েছে। সে ধীরপায়ে নীলুর পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। নীলুর কাঁধে হাত রেখে নিচু স্বরে বলে, "আসছি তো। যে চায়ের জন্য সারাটা জীবন যাযাবর হয়ে থাকলাম, সেই চা আর চায়ের মানুষ—দুটোকেই তো এখন নিজের করে পেলাম।"

নীলু একটু লাজুক হাসে। আজু বোঝে, কুদরতে এলাহীর কী অসীম মহিমা! যে চোরকে সবাই ঘৃণা করত, আজ তার জন্য পরম মমতায় ঘরের বাতি জ্বলে, আর কেউ একজন তার  অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

ঘুম গবেষক সুলেমান