ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কৃষ্ণনগর গ্রামে গ্রামে খবর ছড়াতে বেশি সময় লাগে না, কার ছেলে বিদেশ থেকে অনেক টাকা নিয়ে এসেছে, কার গাছে কচি লাউ এসেছে, কার গরুর বাছুর এক ঠ্যাং ভাঙ্গা সব খবর মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে যায়। এই গ্রামেরই বড় ভাই ট্রেনে করে বাড়ি ফিরছেন। তার গলায় ঝোলানো বাইনোকুলার দেখে পাশের যাত্রী জিজ্ঞেস করলেন,—আপনি একবারও বাইরে তাকাচ্ছেন না, তবু বাইনোকুলার সঙ্গে এনেছেন কেন?
মতিউর হেসে বললেন,
—দূরের দৃশ্য দেখার জন্য না। দূরের
আত্মীয় দেখার জন্য।
—মানে?
—যার বাড়ি যাচ্ছি, সে আমার ছোট ভাই। আগে খুব কাছের ছিল। এখন দূরসম্পর্কের।
পাশের লোকটি চুপ করে গেল। এমন উত্তর
শুনলে আর কী বলা যায়!
একসময় এই দুই ভাইয়ের সম্পর্ক ছিল
গ্রামের ঈদের সেমাইয়ের মতো মিষ্টি। ছোট ভাই সামিউল পড়াশোনায় কাঁচা ছিল, ব্যবসায় কাঁচা ছিল, জীবনের হিসাবেও
কাঁচা ছিল। বড় ভাই মতিউরই সব সামলাতেন। তাঁর
ধার শোধ করেছেন, সামিউলকে দোকান করে দিয়েছেন। তখন সামিউল বলত,
—দাদা, আপনি না থাকলে আমি শেষ।সমস্যা হলো, একসময় মতিউরের নিজের ব্যবসায় ভাটা পড়ল। ধারদেনা, লোকসান, মান-সম্মান সব একসঙ্গে গলে গেল। মানুষ
অদ্ভুত প্রাণী। রোদে পাশে দাঁড়ায়, বৃষ্টিতে ছাতা
গুটিয়ে নেয়।
সামিউল তখন একটু দূরে সরে গেল। ফোন ধরত
না। বাজারে দেখা হলে বলত,
—এই সময়টা একটু ব্যস্ত আছি দাদা,
পরে কথা বলব।
গ্রামের চায়ের দোকানে লোকজন ফিসফিস
করত। কেউ বলত, “টাকা থাকলে আত্মীয় বাড়ে, কেউ আবার বলত, “দূরত্ব মাপার জন্য মিটার লাগে না, পকেটই যথেষ্ট।”
টাকা থাকলে পাড়ার বড় ভাই থেকে শুরু করে
সাত পুকুর দূরের আত্মীয়ও আপনাকে চিনে নেবে। আর টাকা না থাকলে? নিজের ছায়াও মনে হয় মাঝেমধ্যে পাশ কাটিয়ে চলে যায়
মতিউর কিছু বলতেন না। তিনি ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করলেন। ধীরে ধীরে ভাগ্য ফিরল। আল্লাহর রহমতে আবার ঘুরে দাঁড়ালেন। এবার গ্রামে ফিরছেন, কিন্তু মনে একধরনের অদ্ভুত শান্তি আর অদ্ভুত সংকোচ।
বাড়িতে গিয়ে তিনি আলাদা একটি ছোট ঘর
তুললেন। মানুষ ভাবল, বড় ভাই রাগ করে আলাদা হলেন। আসলে তিনি
রাগ করেননি। শুধু দূরত্বের সম্মান রেখেছেন।
গ্রামে ফিরে তিনি আলাদা একটা ঘর
তুললেন। লোকজন জিজ্ঞেস করল,
—বড় ভাই আলাদা থাকেন কেন?
মতিউর বললেন,—সম্পর্কে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখছি।
একদিন বিকেলে তিনি দূরবীন দিয়ে ছোট
ভাইয়ের উঠোন দেখছিলেন। সামিউলের ছেলে পড়ছে।সে তার বাবাকে জিজ্ঞাসা করল
—আব্বু, বড় চাচা কি রাগ করেছে?
সামিউল বলল,
—না রে, ও ব্যস্ত।
ছেলে বলল,
—দূর থেকে আমাদের দেখছেন দূরবীন দিয়ে,বাবা দূরবীন দিয়ে দেখলে কি মানুষ ছোট লাগে?
মতিউর দূরবীন নামিয়ে মনে মনে বললেন,
—না রে, মন ছোট হলে মানুষ ছোট লাগে।
সেদিন রাতে সামিউল লজ্জা লজ্জা মুখে
এলো।
—দাদা, দূরবীন ছাড়া কি আমাদের দেখা
যায়?
মতিউর মুচকি হেসে বললেন,
—যদি মনটা পরিষ্কার থাকে, তাহলে চশমাও লাগে না।
দুই ভাই বসে চা খেল। চায়ের কাপে দুধ কম,
কিন্তু মনের কাপে অভিমান বেশী ।
কৃষ্ণনগরের লোকেরা পরদিন বলল,
—দুই ভাই আবার এক হয়েছে।
এক বৃদ্ধ উত্তর দিলেন,
—আরে ভাই, রক্তের সম্পর্ক কখনও দূরসম্পর্ক হয় না। শুধু মাঝখানে একটু অভিমানের
ধুলা পড়ে।
শেষে মতিউর তার দূরবীনটা আলমারিতে তুলে
রাখলেন। কারণ তিনি বুঝেছেন, দূরত্ব দেখার যন্ত্র আছে, কিন্তু কাছাকাছি হওয়ার যন্ত্র একটাই। সেটা হলো মন।কৃষ্ণনগরের কুয়াশা
সেদিন একটু কম ছিল। হয়তো দুই ভাইয়ের মাঝের দূরত্বও।



0 মন্তব্যসমূহ