শিক্ষক: তাহলে আপনি বলতে চাচ্ছেন, আবিরের খুব জ্বর হয়েছে এবং ও আজ স্কুলে আসতে পারবে না?
এপাশ থেকে: হু!
শিক্ষক: আপনি কে বলছেন?
এপাশ থেকে: আমার আব্বু বলছি।
এই পর্যন্ত শুনে শিক্ষক রুমের ভেতর একটু চুপ করে রইলেন। তারপর খুব শান্ত গলায় বললেন, “আবির, ফোনটা স্পিকারে দাও তো। তোমার আব্বুর কণ্ঠটা খুব চেনা চেনা লাগছে।”
এপাশে পাঁচ সেকেন্ড নীরবতা। তারপর হালকা কাশি। তারপর আবার সেই কণ্ঠ, একটু মোটা করার চেষ্টা করে, “আমি আবিরের আব্বা বলছি। ছেলেটার অবস্থা খুব খারাপ। থার্মোমিটার ভেঙে গেছে জ্বরে।”
শিক্ষক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এই দীর্ঘশ্বাসে বিরক্তি কম, মায়া বেশি। তিনি তিরিশ বছরের শিক্ষকতা জীবনে হাজার রকম জ্বর শুনেছেন। পরীক্ষার আগের জ্বর, হোমওয়ার্কের আগের জ্বর, গণিত ক্লাসের বিশেষ জ্বর। এ এক অদ্ভুত ভাইরাস। নাম দিলে ভালো হতো, “অধ্যয়নভীতি ইনফ্লুয়েঞ্জা।”
তিনি বললেন, “ঠিক আছে। তাহলে আপনার ছেলেকে বলবেন, আমি বিকেলে ওর বাসায় আসব খোঁজ নিতে। সঙ্গে গণিতের খাতা নিয়ে আসব। জ্বরের মধ্যেই দুটো অংক করলেই শরীর ঘেমে ভালো হয়ে যাবে।”
এপাশে এবার সত্যিকারের নীরবতা। তারপর খুব আস্তে একটা ফিসফিস, “স্যার, আসলে জ্বরটা একটু কমে গেছে মনে হয়…”
শিক্ষক হেসে ফেললেন। মানুষ যখন মিথ্যা বলে, তখন তার কণ্ঠে একটা কোমল কম্পন থাকে। আবিরের কণ্ঠেও সেটাই। ছেলেটা খারাপ নয়। শুধু একটু আলসেমি আছে, একটু বুদ্ধি বেশি আছে, আর একটু সাহস কম আছে।
পরদিন আবির স্কুলে এল। মুখ গম্ভীর। যেন পৃথিবীর সব দুঃখ তার কাঁধে। শিক্ষক কিছুই বললেন না। শুধু ক্লাসের শেষে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার আব্বুর জ্বর কেমন?”
আবির মাথা নিচু করে বলল, “স্যার, আমার আব্বু তো ভালোই আছেন।”
“ও আচ্ছা। কাল তো উনিই ফোন করেছিলেন।”
আবির চুপ। তারপর খুব লজ্জার হাসি। সেই হাসিতে অপরাধবোধ আছে, আবার একটু স্বস্তিও আছে। ধরা পড়েছে, তবু বকুনি খায়নি।
শিক্ষক বললেন, “দেখো, মিথ্যা বললে সমস্যা একটাই। একদিন সেটা ধরাই পড়ে। আর তখন মানুষ তোমার ওপর থেকে একটু একটু করে বিশ্বাস সরিয়ে নেয়। বিশ্বাস জিনিসটা কাঁচের গ্লাসের মতো। একবার ফাটল ধরলে জোড়া লাগে, কিন্তু দাগ থেকে যায়।”
আবির মাথা নাড়ল। তার চোখে এবার সত্যিকারের জ্বরের মতো জল চিকচিক করছে। লজ্জার জ্বর। এই জ্বর ভালো। এই জ্বর মানুষকে বড় করে।
স্কুল ছুটির পর আবির মাঠে দাঁড়িয়ে ছিল। বন্ধুদের সঙ্গে হাসছিল, আবার মাঝেমধ্যে চুপ হয়ে যাচ্ছিল। সে ভাবছিল, এত কষ্ট করে “আমার আব্বু বলছি” বলা কি দরকার ছিল? একদিন স্কুল না এলে কী হতো? হয়তো কিছুই না। কিন্তু আজ সে বুঝেছে, একটা ছোট মিথ্যা নিজের ভেতরেই একটা ছোট কাঁটা হয়ে থাকে।
শিক্ষক স্টাফরুম থেকে বের হয়ে দূর থেকে ছেলেটাকে দেখলেন। তার মনে পড়ল, ছোটবেলায় সেও একবার এমন করেছিল। নিজের বাবার গলায় নকল করে ছুটি নিয়েছিল। ধরা পড়ে গিয়েছিল। সেই দিনটার লজ্জা আজও টাটকা।
তিনি মৃদু হেসে ভাবলেন, “মানুষ আসলে একই গল্প বারবার করে। শুধু চরিত্র বদলে যায়।”
পরদিন ক্লাসে শিক্ষক হালকা গলায় বললেন, “আজকে কেউ জ্বরে আছে?”
সবাই হেসে উঠল। আবিরও হাসল। সবচেয়ে জোরে। তার হাসিতে আজ কোনো ভয় নেই। কারণ সে জানে, ভুল করা দোষ না। ভুল বুঝে নেওয়াটাই আসল।
আর সেই দিন থেকে স্কুলে একটা নতুন জ্বরের নাম ছড়িয়ে গেল—
“আমার আব্বু বলছি জ্বর।”
তবে মজার ব্যাপার হলো, এরপর থেকে এই জ্বরে আর কেউ আক্রান্ত হয়নি। কারণ সবাই জানে, এই জ্বরের ওষুধ শিক্ষক স্যারের কাছে রেডি আছে। নাম তার— বিশ্বাস আর একটু ভালোবাসা।



0 মন্তব্যসমূহ