আয়না ও ঝালমরিচ

 

সেলিম মাহমুদ সাহেবের একটা অদ্ভুত বাতিক আছে। প্রতিদিন সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি নিজের দিকে বিভিন্ন এঙ্গেলে দেখেন । দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, “আহা! এত হ্যান্ডসাম একটা মানুষকে সমাজ আজও বিয়ে দিল না! ঘুনে ধরা সমাজ,সমাজের নানা অনিয়ম নিয়ে বীর বীর করতে থাকেন ?”



আয়না যথারীতি চুপ। সেলিম সাহেবের ধারণা, এই মিথ্যাবাদী দুনিয়ায় কেবল আয়নাই পরম সত্যবাদী। সে অন্তত মিথ্যা না বলে চুপ করে থাকে

কিন্তু শান্তি বেশিদিন টিকল না। দৃশ্যপটে উদয় হলো রিমঝিম। পাশের বাসার করিম আঙ্কেলের মেয়ে। নাম রিমঝিম হলেও পাড়ার লোকে তাকে ডাকে ‘ঝালমরিচ’। নামকরণের সার্থকতা আছে। একবার এক ইভটিজার গলির মোড়ে তাকে ডিস্টার্ব করেছিল; রিমঝিম বটি নিয়ে তাড়া করে তাকে তিন গলি পার করে দিয়ে এসেছিল। সেই থেকে পাড়ার বখাটেরা তো বটেই, বিড়াল-কুকুরও তাকে সমীহ করে চলে

রিমঝিম একদিন সেলিম সাহেবের পেছনে এসে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় বলল, “দোষটা সমাজের না সেলিম ভাই, দোষটা ওই আয়নার।”

সেলিম সাহেব ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললেন, “তুমি কে? মানে, আপনি কে?”



রিমঝিম কোমরে হাত দিয়ে বলল, আমি আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তৃতীয় বর্ষ । কোন বিভাগ? আমি বাস্তবতা বিভাগ থেকে এসেছি। আপনাকে সোজা করতে। আয়না আপনাকে শুধু আপনার ঝকঝকে গায়ের চামড়া দেখায়, কিন্তু আপনার কুঁড়েমি আর ভেতরের জট পাকানো স্বভাবটা দেখায় না। হ্যান্ডসাম হওয়া তো সহজ, কাজের মানুষ হওয়া কঠিন।”

সেলিম সাহেবের মনে হলো, তাঁর মাথার ভেতরকার ‘হ্যান্ডসাম’ সুরটা হঠাৎ বেসুরো হয়ে গেল। রিমঝিমের চোখের আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি প্রথমবারের মতো আয়নার বদলে নিজের ভেতরে তাকালেন। তারপর কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, “ঠিক আছে, আগে মানুষ হই, পরে না হয় হ্যান্ডসাম থাকা যাবে।”

রিমঝিম একটু হাসল। তবে সেই হাসিতে ঝালমরিচের ঝাঁজ নেই, বরং এক ধরণের শাসন মেশানো মায়া আছে। সে বলল, “এইবার বিয়ের লাইনে দাঁড়ান। অন্তত এবার সমাজ আর অজুহাত দেওয়ার সুযোগ পাবে না।”

সেলিম সাহেব এখন আর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের রূপের আরতি করেন না। তিনি এখন অ্যাপার্টমেন্টের ছাদে বসে পুরোনো  ল্যাপটপ নিয়ে কী যেন করেন। সারাদিন কিবোর্ডে খটখট শব্দ, মাঝেমধ্যে আপন মনে হাসেন। প্রতিবেশীরা ভাবে, লোকটা আগে ছিল রূপের পাগল, এখন হয়েছে ইন্টারনেটের পাগল।



রিমঝিম একদিন ছাদে এসে দাঁড়াল। সেলিম সাহেব তখন গভীর মনোযোগে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছেন। রিমঝিম চোখ কুঁচকে বলল, “এই ঘরকুনো কাজ দিয়ে কি পেট চলবে সেলিম ভাই? রোদে বের হন, শরীর খাটান। মাথায় যে ঘিলুটা আছে সেটা কাজে লাগান।”

সেলিম সাহেব ল্যাপটপটা বন্ধ করে শান্ত গলায় বললেন, শরীর খাটিয়ে তো সবাই খায়, আমি না হয় একটু মগজ খাটালাম।”

রিমঝিম মুখ বাঁকিয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই সেলিম সাহেবের ফোনে একটা মেসেজ এল। তিনি স্ক্রিনটা রিমঝিমের দিকে ঘুরিয়ে ধরলেন। সেখানে একটা বিদেশি কোম্পানির লোগো আর ডলারে লেখা মোটা অংকের একটা ফিগার দেখা যাচ্ছে

সেলিম সাহেব মুচকি হেসে বললেন, “শোনো ঝালমরিচ, আমি গত এক মাস ধরে একটা ‘অ্যান্টি-লুক’ অ্যাপ বানাচ্ছিলাম। যারা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের রূপ দেখে প্রেমে পড়ে যায়, এই অ্যাপ তাদের আসল কদর্য স্বভাবটা ধরিয়ে দেবে। আজ সকালেই ওটা চড়া দামে বিক্রি করে দিয়েছি।”

রিমঝিম এবার সত্যিই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। সেলিম সাহেব সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পাঞ্জাবির কলারটা ঠিক করে বললেন, “এখন তো আমার পকেটে টাকা আছে। এবার কি সমাজ আমাকে বিয়ে দেবে, নাকি এখনো আয়নার ওপর দোষ চাপাবে?”

রিমঝিম প্রথমবার সেলিম মাহমুদের চোখের দিকে তাকিয়ে একটু থতমত খেয়ে গেল। লোকটা পাগল হতে পারে, কিন্তু সেই পাগলামির মধ্যে এমন এক অদ্ভুত ধার আছে যা বটির চেয়েও বেশি ধারালো। সে বিড়বিড় করে বলল, “হ্যান্ডসাম পাগলদের এই এক সমস্যা, কখন কী করে বসে বোঝা দায়!”



সেলিম সাহেব হাসলেন। আজ আয়নাটা তাঁর ঘরের এক কোণে পড়ে আছে, ধুলো জমেছে তাতে। কিন্তু তাতে তাঁর কিছু যায় আসে না। কারণ তিনি বুঝে গেছেন, জীবনের আসল রিফ্লেকশন কাঁচের আয়নায় নয়, বরং ব্যাংক ব্যালেন্স আর বুদ্ধির ঝিলিকই হলো আসল ‘হ্যান্ডসাম’ হবার লক্ষণসেলিম সাহেব এখন আর আয়নার সামনে দাঁড়ান না। তিনি জানেন, আয়না বড়জোর মানুষের ছায়াটুকু দেখায়, ভেতরের মানুষটাকে  বদলানোর ক্ষমতা তার নেই।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

ঘুম গবেষক সুলেমান