কৃষ্ণচূড়ার শীতল ছায়ায়, বাবর আলী আর আজরাইল

 ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কৃষ্ণনগর গ্রামের  তীর ঘেঁষে, তিতাস নদীর পাশে, যেখানে লাল-কমলা কৃষ্ণচূড়া গাছ শীতল ছায়া দেয়  



সেই সুন্দর গ্রামে সবাই জানে না ঠিক কোন ঘরে বাবর আলী থাকে। আসলেই কারো কাছে তার ঠিকানা নেই। বেশিরভাগ সময় তাকে দেখা যায় গ্রামের বাজারের এক কর্নারে, কৃষ্ণচূড়া গাছের ছায়ায় বসে, মুরগির পাখনা দিয়ে কান চুলকাচ্ছে, আবার হঠাৎ হেঁটে যাচ্ছে, যেন তার নিজস্ব কোন অদ্ভুত সময়সূচি আছে। 

এক বিকেলে,  সিদ্দিক  চেয়ারম্যান  বাজার দিয়ে হেটে যাচ্ছিলেন। বাবার আলীকে দেখলে  সিদ্দিক চেয়ারম্যানের   একটু হাসি মশকরা করার নেশা পেয়ে বসে,এইডা উনার পুরান  রোগ।   যেরকমটা পাগলকে দেখলেই মানুষের রিলিফের মাল মনে করে, সবাই একটু ঢিল দিয়ে ,একটু খোঁচা মেরে আনন্দ পেতে চায়। বাবর আলীকে দেখেই একটু হেসে বললেন,“কিরে, বাবর আলী! কানের ভিতরে চুলকাইয়া  কি বুদ্ধি বের করস নাকি?”


বাবর আলী শান্ত গলায় বলল,“চেয়ারম্যান সাহেব, এতো  বুদ্ধি দিয়া আফনে কি করবেন  মৃত্যু সন্নিকটে । গত শুক্কুর বাড়ে দেখছি আপনার বাড়ির চারপাশে আজরাইল চক্কর দিতাসে । আমার সাথে দেখা হতেই আমি তাকে সালাম দিলাম। বললাম, চেয়ারম্যান সাহেবেরে কৈডাদিন সময় দেন   মাথায় কয়টা চুল আসে, হেইডা পইরা গেলে লইয়া যাইয়েন কুনু আফসুসনাই  ।”

চেয়ারম্যান হকচকিয়ে রইলেন।“কীসব আজেবাজে কথা বলছিস তুই!”

বাবর আলী আরও শান্ত থাকলেন,“আমি তো কিছু কইনাই , হুদা  দেখছি। আপনি ভয় পাইসেন কেড়ে ? যদি বিশ্বাস না করেন, ভয় কিসের?”

চেয়ারম্যান লজ্জা পেলেন, মুখে অদ্ভুত গরম অনুভব করলেন।“আচ্ছা ধরলাম আমি ভয় পাইনি। কিন্তু আজরাইল দেখলে তুই কী করবি?”

বাবর আলী হেসে বলল,“আমি কিছু করব না। যার হিসাব পরিষ্কার, তার ভয় পাওয়ার দরকার নেই।”

লোকজন দূর থেকে তাদের দিকে তাকাল। বাবর আলীর শান্ত অথচ দৃঢ় কথায় যেন একটা অদ্ভুত শক্তি আছে । চেয়ারম্যানও বুঝলেন, এই মানুষটা সত্যিই “পাগল” নয়—বরং একটু বেশিই স্বাভাবিক। কেউ যদি তাকে অপমান করে, সে রাগে ফেটে পড়ত না। বরং এমন যুক্তি দিত, যে অপমানকারী নিজেই নিজের কথার কনফিউসড হয়ে  ভাবতে বসত।

এ দিন থেকে চেয়ারম্যান আর বাবর আলীর সঙ্গে মজা করতে আসেন না। দূর থেকেই রাস্তা বদলান, 

গ্রামের মানুষদের চোখে বাবর আলী এক অদ্ভুত রহস্যের মতো—চুপচাপ, স্বাধীন, এবং নিজের মানসিক পৃথিবীতে স্থির। কৃষ্ণচূড়ার ছায়ায় বসে, মুরগির পাখনায় কান চুলকায়, তার চোখে যে দুনিয়ার গভীরতা, তা শুধু যাঁরা মন দিয়ে দেখেন, তাঁরা বোঝেন।

চেয়ারম্যান সাহেব দ্রুত পায়ে সেখান থেকে সরে গেলেন। কিন্তু মনের ভেতর খচখচানিটা রয়েই গেল। তিনি বাড়িতে ঢুকে আয়নার সামনে দাঁড়ালেন। বাবর আলী ঠিকই বলেছে, মাথার মাঝখানটা মরুভূমির মতো খাঁ খাঁ করছে। মাত্র কয়েকটা চুল কোনোমতে টিকে আছে। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আজরাইল কি তবে সত্যিই চুল গোনে?

সাতদিন পর। বাবর আলী বরাবরের মতো কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচেই বসে আছে। তবে আজ সে কান চুলকাচ্ছে না, একা একা হাসছে। সামনে একটা ভাঙা রেডিও পড়ে আছে, যেখান থেকে কেবল চিড়বিড় শব্দ বেরোচ্ছে

চেয়ারম্যান সাহেবকে দেখে বাবর আলী একটু নড়েচড়ে বসল। পকেট থেকে একটা বিড়ি বের করে ধীরেসুস্থে ধরিয়ে বলল, — চেয়ারম্যান সাহেব, আজ শরীরটা কেমন? ফুরফুরে লাগছে নাকি ধুকপুক করছে?


চেয়ারম্যান থমকে দাঁড়ালেন। তিনি ঠিক করেছেন আজ আর রাগ করবেন না। নরম গলায় বললেন, — বাবর, শোন। সেদিন তুই আজরাইলের কথা বললি না? আজরাইল কি তোরে বলেছে যে সে আমার জন্যই আসছে?

বাবর আলী বিড়ির ধোঁয়া ছেড়ে আকাশের দিকে তাকাল। আকাশটা আজ অদ্ভুত নীল। সে নিস্পৃহ গলায় বলল, — উনি তো আর এপয়েন্টমেন্ট লেটার দিয়ে আসেন না চেয়ারম্যান সাহেব। উনি আসেন মেহমান হয়ে। তবে আমার সাথে যখন দেখা হলো, তখন উনি একটা চিরুনি খুঁজছিলেন

চিরুনি দিয়ে কী হবে? — ওই যে বললাম, আপনার মাথার চুল গোনার জন্য। উনি বললেন, যার মাথায় চুল যত কম, তার দুনিয়ার মায়া কাটাতে তত সহজ। যার মাথাভর্তি চুল, তার জট ছাড়াতে সময় লাগে। আপনার তো জট নেই। পরিষ্কার মাথা। চাইলে আজই রওনা দিতে পারেন

চেয়ারম্যান সাহেবের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমল। তিনি শুকনো গলায় বললেন, — তোর কাছে কি কোনো বুদ্ধি আছে? মানে... চুল যদি আবার গজায়?

বাবর আলী মিটিমিটি হাসল। বলল, — বুদ্ধি একটাই। মায়া কমানো। কৃষ্ণচূড়া গাছটার দিকে তাকিয়ে দেখেন। ওর যখন পাতা ঝরে যায়, ও কি কাঁদে? কাঁদে না। ও জানে আবার নতুন পাতা আসবে। আপনিও ভাবেন আপনি একটা গাছ। আজরাইল সাহেবকে দেখলে একটা সালাম দিয়েন, উনি বড় বিনয়ী লোক


চেয়ারম্যান সাহেব সেদিন আর কথা বাড়ালেন না। তবে বাজারের লোক অবাক হয়ে দেখল, দাপুটে চেয়ারম্যান সাহেব কৃষ্ণচূড়া গাছটার দিকে অদ্ভুত এক মায়া নিয়ে তাকিয়ে আছেন। আর বাবর আলী তার ভাঙা রেডিওতে কান পেতে সম্ভবত পরকালের কোনো স্টেশনের খবর শোনার চেষ্টা করছে

মানুষ আসলে পাগলকে ভয় পায় না, ভয় পায় পাগলের বলা সহজ সত্যিগুলোকে

 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

ঘুম গবেষক সুলেমান