১৪ই ফেব্রুয়ারির শ্রেষ্ঠ উপহার - নিভৃত সময়

 আজ পহেলা ফাল্গুন, আবার ১৪ই ফেব্রুয়ারি—ভ্যালেন্টাইনস ডে। প্রকৃতির আজ ডাবল প্রোমোশন। আকাশটা যেন আজ নীল শাড়ি পরা কোনো অভিমানী তরুণী। রাস্তার ধারের শিমুল গাছটা রক্তবর্ণ লাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেন কারো জন্য একগুচ্ছ লাল গোলাপ হাতে প্রহর গুনছে। পলাশের বনে আজ আগুন লেগেছে, আর সেই আগুনের আঁচ এসে লেগেছে শহরের যান্ত্রিক ধুলোবালিতেও।



মিনহাজ সাহেব আজ খুব সকালে উঠেছেন। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের পক্ককেশগুলো একটু গুছিয়ে নিলেন। আজ তার মেয়ে ইয়াকিনের আসার কথা। অনেকদিন পর বাবা-মেয়ের দেখা হবে। মিনহাজ সাহেব একসময় বলতেন, "সময় তো টাকা দিয়ে কেনা যায় না, কিন্তু টাকা থাকলে সময়কে আটকে রাখা যায়।"এখন ব্যাঙ্কে টাকার পাহাড়, কিন্তু সময় যেন বড্ড দামি পারফিউমের মতো—খুললেই উবে যায়।

তিনি ইয়াকিনের জন্য তার প্রিয় সাদা রঙের শাড়ি আর এক জোড়া কাঁচের চুড়ি কিনে রেখেছেন। বসন্তের এই দিনে ইয়াকিন যখন ছোট ছিল, বাসন্তী রঙে সেজে বাপের হাত ধরে মেলায় যেত। মিনহাজ সাহেব তখন ঘড়ি দেখতেন আর বলতেন, "তাড়াতাড়ি কর মা, ক্লায়েন্টের সঙ্গে মিটিং আছে। সময় নেই একদম।"

মিনহাজ সাহেবের অফিসের ফাইলগুলোর উচ্চতা আর তার রক্তচাপ যেন পাল্লা দিয়ে বাড়ে। তিনি টাকা জমান। খুব হিসেবি মানুষ। তার সাত বছরের মেয়ে ইয়াকিন প্রতিদিন বিকেলে দরজার পাশে একটা টুলে বসে থাকে। বাবা কখন ফিরবেন? হাতে থাকবে একটা চকলেট অথবা নিছক একটু মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া।



মিনহাজ সাহেব বাসায় ফেরেন মাঝরাতে। ইয়াকিন  তখন গভীর ঘুমে। তিনি মেয়ের কপালে হাত রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবেন, "আর কয়েকটা বছর একটু কষ্ট করি, অনেক টাকা জমলে তখন শুধু মেয়েকে  সময় দেব।"

আজ মিনহাজ সাহেবের হাতে অফুরন্ত সময়। তিনি ড্রয়িংরুমের জানালার পাশে বসে আছেন। বাইরে ফুরফুরে বসন্তের বাতাস বইছে, কৃষ্ণচূড়ার পাপড়িগুলো উঠোনে আলপনা আঁকছে। হঠাৎ ফোনের টুংটাং শব্দ। ইয়াকিনের মেসেজ।

— "বাবা, এয়ারপোর্টে এসেও ফ্লাইটটা মিস করলাম। অফিস থেকে একটা আর্জেন্ট কল এল। ভ্যালেন্টাইনস ডের একটা বড় ক্যাম্পেইন লঞ্চ করতে হবে। আজ আসতে পারছি না। রিয়েলি সরি, জাস্ট টাইম পাচ্ছি না একদম!"মিনহাজ সাহেব ফোনটা রেখে দিলেন। বুকটা একটু টনটন করে উঠল।  "জীবনটা আসলে এক জোড়া জুতো। একটা পা এগোলে অন্যটা পিছিয়ে থাকে। আজ আমার কাছে সময় আছে, কিন্তু দেওয়ার মানুষ নেই। ইয়াকিনের কাছে মানুষ আছে, কিন্তু দেওয়ার মতো সময় নেই।"




মাঝে মাঝে মিনহাজ  সাহেব ফোন দেন। ওপাশ থেকে ইয়াকিনের  যান্ত্রিক গলা শোনা যায়, "বাবা, আমি একটা মিটিংয়ে। পরে কথা বলছি।"


মিনহাজ  সাহেব হাসেন। বিষণ্ণ হাসি। তার মনে পড়ে ছোটবেলায় ইয়াকিন  তাকে একটা মাটির ব্যাংক দেখিয়ে বলেছিল, "বাবা, আমি এখানে কয়েন জমাচ্ছি। অনেক টাকা হলে আমি তোমার জন্য কিছু ‘সময়’ কিনে আনব। তাহলে তোমাকে আর অফিস যেতে হবে না।"

এখন মিনহাজ সাহেবের কাছে অফুরন্ত সময়, কিন্তু ইয়াকিনএর  কাছে অজুহাতের পাহাড়।

একবার ইয়াকিন দেশে ফিরল মাত্র দুই দিনের জন্য। মিনহাজ সাহেব খুব উৎসাহ নিয়ে ইয়াকনের  জন্য তার পছন্দের ইলিশ মাছ রান্না করালেন। খাওয়ার টেবিলে নীতু ল্যাপটপ খুলে বসে আছে।

মিনহাজ সাহেব বললেন, "মা, মাছটা খা। ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।"

ইয়াকিন বিরক্ত হয়ে বলল, "বাবা, একটু চুপ করো তো! একটা জরুরি মেইল পাঠাতে হবে। সময় নেই একদম।"

আমি ভাবি, একেই বলে প্রকৃতির বিচার! আমি যখন জওয়ান ছিলাম, তখন সময়ের অভাবে ইয়াকিনকে সময় দিতে পারিনি। আর এখন আমি যখন পক্ককেশ, তখন ইয়াকিনের  কাছে সময়ের আকাল।

আসলে আমরা সবাই যেন এক অদ্ভুত বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। কেউ টাকা দিয়ে সময় কিনতে চাইছে, আবার কেউ সময় বিক্রি করে টাকা বানাচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হলো, দুটোর এক্সচেঞ্জ রেট কোনোদিন মেলে না।

তিনি মনে মনে এক নতুন পৃথিবীর ছক আঁকেন। যেখানে কোনো ঘড়ি থাকবে না। থাকবে না কোনো ক্যালেন্ডার। শুধু থাকবে মানুষে-মানুষে হৃদয়ের টান। যেখানে কেউ কাউকে ভুলে যাওয়ার জন্য কোনো অজুহাত খুঁজে পাবে না।

শহরের যান্ত্রিক কোলাহলে সেই চিন্তা  হারিয়ে যায়। মিনহাজ সাহেব   বোঝেন, সময় একবার চলে গেলে তাকে আর কোনো চেক বই দিয়ে ফেরানো যায় না।

 তার মধ্যে একধনের দার্শনিক চিন্তা হতে থাকে "বসন্ত আসে ফুলে ফুলে, আর ভালোবাসা আসে সময়ে সময়ে। আমরা অজুহাত দিয়ে সময়কে আড়াল করি, কিন্তু ভুলে যাই—যে সময়টা আজ আপনি হাতছাড়া করছেন, পৃথিবীর সব ঐশ্বর্য দিয়েও কাল সেই মুহূর্তটা আর ফেরানো যাবে না। ভালোবাসার শ্রেষ্ঠ উপহার লাল গোলাপ নয়, সেটি হলো আপনার প্রিয় মানুষকে দেওয়া খানিকটা নিভৃত ‘সময়’।"


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

ঘুম গবেষক সুলেমান