আব্বা-নামা ও এক পশলা হাসি


বিকেলটা ছিল যাকে বলে একেবারে 'কাব্যিক'। সূর্যটা আকাশের কোণে এমনভাবে ঝুলে আছে যেন নীল প্যান্টের পকেটে একটা আধুলি। পার্কের গাছগুলো বাতাসে এমনভাবে মাথা দোলাচ্ছে, যেন তারা সবাই মিলে কোনো এক অদৃশ্য কনসার্টে নাচছে। প্রকৃতির এই 'সবুজ' সংকেত পেয়েই সুবাহান বেরিয়ে পড়ল।


সুবাহান ছেলেটা নিজেকে ভাবে মস্ত এক 'স্মার্ট' । কিন্তু মুশকিল হলো, তার বুদ্ধির জোর যতটা, জিহ্বার জোর ততটা নয়।সমস্যা একটাই— আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেই তার জিহ্বাটা বেইমানি শুরু করে।সোজা কথা বলতে গেলে সে 'তোতলায়', কিন্তু তার নিজের ধারণা সে আসলে কথার মাঝে 'পজ' (Pause) দিয়ে নাটকীয়তা তৈরি করে।

সামনে বসে আছে ইয়াকিন। ইয়াকিন দেখতে জীবনানন্দের কবিতার পংতির মত  , কিন্তু তার একটা 'জলজ' সমস্যা আছে। সে হাসলে লোকে ভাবে সে কাঁদছে। কারণ হাসির চোটে তার চোখ দিয়ে মেঘনা, ইছামতি নদী  বইতে শুরু করে।একবার এক বিয়ের বাড়িতে ইয়াকিন হাসতে হাসতে এমন কাঁদল যে কনের মা ভাবলেন, মেয়েটা বুঝি বরের পুরনো প্রেমিকা!       

 সুবাহান আজ ঠিক করেছে ইয়াকিনকে তার মনের 'গোপন' খবরটা দেবে। পকেট থেকে একটা গোলাপ বের করে সে ভাবল— আজ প্রেমের সাগরে ডুব দেবই দেব, তা সে ডুবুরি হয়েই হোক আর ঘটি ডোবানো জলেই হোক।

সুবাহান শুরু করল, "ইয়া-ইয়া-ইয়াকিন, আ-আ-আমি তো-তো-তোমাকে ব-ব-বা..."

ইয়াকিন চোখ কপালে তুলে চাইল। সুবাহান বলতে চেয়েছিল 'ভালোবাসি', কিন্তু তার জিভটা 'ভা' অক্ষরটাকে ডিঙিয়ে সোজা 'বা'-তে গিয়ে ল্যান্ড করল। মুখ দিয়ে বের হলো— "ব-ব-বা... বাবা!"

পাশ দিয়ে এক বয়স্কা মহিলা যাচ্ছিলেন। সুবাহান তাকে দেখে নিজেকে সামলাতে গিয়ে আরও কেলেঙ্কারি করে ফেলল। সে মহিলাকে লক্ষ্য করে বলে উঠল, "আ-আ-আ... আব্বা!"



মহিলাটি থমকে দাঁড়িয়ে বললেন, "ওরে বাপু, আমার এই ছাপোষা কাপড়ের  আড়ালে তুই কোন দিক দিয়ে 'আব্বা' দেখতে পেলি? তোর চোখের পাওয়ার কি মাইনাস থেকে প্লাসে চলে গেছে?"

সুবাহান তখন ঘামছে। সে বোঝাতে চায় যে, সে আসলে লিঙ্গ-ভেদাভেদে বিশ্বাসী নয়, নারী-পুরুষ তার কাছে সব সমান। কিন্তু মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বেরোচ্ছে না, শুধু 'ভ্যা-ভ্যা' শব্দ হচ্ছে।    

 ইয়াকিন আর পারল না। সে খিলখিল করে হাসতে শুরু করল। সে কী হাসি! হাসতে হাসতে তার চোখ দিয়ে টপ টপ করে জল পড়ছে। দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছে মেয়েটা বুঝি অঝোরে কাঁদছে। পাশের বৃদ্ধটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবলেন, আহা বেচারি! ছেলেটা নির্ঘাত ওকে 'বাবা' ডেকে অপমান করেছে, তাই মেয়েটা এমন ডুকরে কাঁদছে।

সুবাহান করুণ মুখে বলল, "কাঁ-কাঁ-কাঁদছ কেন? আমি কি খুব অন্যায় কিছু করেছি?"

ইয়াকিন হাসতে হাসতে হেঁচকি তুলে বলল, "আমি কাঁদছি না গো সুবাহান 'বাবা', আমি হাসছি! তোমার ওই 'বাবা-আব্বা'  শুনে আমার পেটের নাড়িভুঁড়ি সব জট পাকিয়ে গেছে।"

আকাশে তখন একটা ম্লান চাঁদ উঠেছে। সুবাহান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ভাবল, পৃথিবীতে কত মানুষ কত কিছু পায়, আর তার বরাতে জুটল 'বাবা' ডাক। তবে সুবাহান মনে মনে খুশিই হলো। অন্তত ইয়াকিনকে হাসাতে তো পেরেছে। এই রুক্ষ পৃথিবীতে কাউকে প্রাণখুলে হাসাতে পারাটাও তো এক ধরণের পুণ্য।

সে গোলাপটা ইয়াকিনের হাতে দিয়ে বলল, "হা-হা-হাসো। তোমার হা-হা-হাসিটা দেখতে বেশ লাগে।সুবাহান মাথা নিচু করে হাঁটতে শুরু করল। এই অদ্ভুত পৃথিবীতে একজনের হাসির কারণ হতে পারাটাও তো কম ভাগ্যের ব্যাপার নয়!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

ঘুম গবেষক সুলেমান