অন্ধের চোখে দেখা পৃথিবী

বৃষ্টি পড়ছিল একটু আলসেমি ভঙ্গিতে। ঢাকার বৃষ্টি মাঝে মাঝে এমন হয়, মনে হয় আকাশেরও কাজ করতে ইচ্ছে করছে না। শুধু একটু একটু করে পানি ফেলছে, যেন অফিসের শেষ ঘন্টার কর্মচারী



আমি পার্কের পাশ দিয়ে হাঁটছিলাম। হঠাৎ দেখি তিনজন অন্ধ ফকির ধীরে ধীরে হাঁটছে। তিনজনের হাতে লাঠি, কিন্তু হাঁটার ভঙ্গি তিন রকম।

একজন খুব হিসাবি টাইপ। হাঁটার সময়ও মনে হচ্ছে মনে মনে কোনো যোগ-বিয়োগ করছে।

দ্বিতীয়জনের মুখে সারাক্ষণ হাসি। এমন হাসি, যেন পৃথিবীর সব গোপন কৌতুক সে একাই জানে।

তৃতীয়জন একটু চুপচাপ। পরে জানলাম তার নাম রোহিত।

আমি দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। হঠাৎ হাসিখুশি অন্ধটা বলল,

— কে দাঁড়িয়ে আছেন?

আমি একটু চমকে গেলাম।

— কিভাবে বুঝলেন?

সে বলল,

— দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের একটা শব্দ আছে।

আমি বললাম,

— দাঁড়ানোর আবার শব্দ হয় নাকি?

সে বলল,

— হয়। যারা গল্প শুনতে দাঁড়ায়, তাদের নিঃশ্বাস একটু ধীর হয়।

আমি মনে মনে ভাবলাম, লোকটা তো বেশ দার্শনিক।

আমি বললাম,

— আমি গল্প শুনতে চাই।

সে সঙ্গে সঙ্গে বলল,

— তাহলে বসেন। দাঁড়িয়ে গল্প শুনলে গল্পেরও লজ্জা লাগে।

আমি পার্কের বেঞ্চে বসলাম।

আমি জিজ্ঞেস করলাম,

— আপনারা তিনজন একসাথে থাকেন?

হাসিখুশি অন্ধটা বলল,

— থাকি না, ঘুরি।

— পার্থক্য কী?

— সংসারে মানুষ থাকে, বন্ধুত্বে মানুষ ঘোরে।

এই সময় হিসাবি অন্ধটা বলল,

— কথা কম বল। বৃষ্টি আসছে।

হাসিখুশি অন্ধটা বলল,

— বৃষ্টি আসলে সমস্যা কী?

— ইনকাম কমে যায়।

আমি আগ্রহ নিয়ে বললাম,

— ইনকাম কিভাবে ভাগ করেন?

হিসাবি অন্ধটা শান্তভাবে বলল,

— খুব সহজ। তিনজন যা পাই শেষে একসাথে করি। তারপর তিন ভাগ।

হাসিখুশি অন্ধটা বলল,

— মাঝে মাঝে আমি কম পাই।

আমি বললাম,

— তাহলে?

সে বলল,

— তখন আমি বেশি গল্প বলি। গল্পেরও দাম আছে।

আমি হেসে ফেললাম।

আমি বললাম,

— কেউ কি কখনও লুকিয়ে টাকা রাখে?

হাসিখুশি অন্ধটা বলল,

— আমরা অন্ধ, কিন্তু লোভের গন্ধ পাই।

হিসাবি অন্ধটা বলল,

— আর লোভের শব্দও পাই।

আমি বললাম,

— লোভের আবার শব্দ হয় নাকি?

সে বলল,

— হয়। টাকার নোট ভাঁজ করার সময় মানুষ একটু অন্যরকম শব্দ করে।

আমি আবার হাসলাম।

এই সময় চুপচাপ অন্ধটা বলল,

— আমার নাম রোহিত।

আমি বললাম,

— আপনি এতক্ষণ চুপ কেন?



সে বলল,

— আমি বেশি কথা বললে বাসায় সমস্যা হয়।বৌ রাগ করে 

আমি অবাক হয়ে বললাম,

— কেন?

হাসিখুশি অন্ধটা বলল,

— কারণ ওর বউ আছে।


আমি একটু অবাক।

— সত্যি?

রোহিত মাথা নাড়ল।

— হ্যাঁ।

আমি বললাম,

— আপনার বউ কি আপনাকে দেখাশোনা করে?

রোহিত বলল,

— মাঝে মাঝে।

হাসিখুশি অন্ধটা সাথে সাথে বলল,

— আর মাঝে মাঝে বকাবকি করে।

আমি বললাম,

— কেন?

রোহিত একটু লজ্জা পেয়ে বলল,

— একদিন ভুল করে অন্য বাসায় ঢুকে পড়েছিলাম।

আমি হেসে ফেললাম।

— তারপর?

— ওই বাসার মহিলা বলল, “আপনি কে?”

আমি বললাম,

— আপনি কী বললেন?

রোহিত বলল,

— আমি বললাম, “আমি ভুল করে ঢুকে গেছি, কিন্তু চা খেয়ে যেতে পারি।”

হাসিখুশি অন্ধটা এত জোরে হাসল যে পাশের কাক উড়ে গেল।

সে বলল,

— তারপর চা খেয়েছিল।

আমি অবাক।

— সত্যি?

রোহিত বলল,

— হ্যাঁ। মানুষ মাঝে মাঝে খুব ভালো হয়।

আমি বললাম,

— ভবিষ্যতের কোনো পরিকল্পনা আছে?

হাসিখুশি অন্ধটা বলল,

— আছে।

— কী?

— একদিন ধনী হব।

আমি বললাম,

— কিভাবে?

সে বলল,

— কেউ যদি ভুল করে আমাদের সামনে এক বস্তা টাকা ফেলে যায়।

আমি বললাম,

— তারপর?

সে বলল,

— আমরা তিনজন বসে সিদ্ধান্ত নেবো, টাকা তুলব নাকি পুলিশ ডাকব।

আমি বললাম,

— আপনারা কী সিদ্ধান্ত নেবেন?

সে বলল,

— প্রথমে টাকা তুলব, তারপর পুলিশ ডাকব।

আমি আবার হেসে ফেললাম।

এই সময় রোহিত আস্তে বলল,

— আমি একটা স্বপ্ন দেখি।

আমি বললাম,

— কী স্বপ্ন?

— আমার ছেলে ডাক্তার হবে।

হাসিখুশি অন্ধটা বলল,

— ডাক্তার হলে আগে আমাদের চোখ ঠিক করবে।

রোহিত বলল,

— না, আগে আমার বউয়ের রাগ ঠিক করবে।

তিনজন একসাথে হেসে উঠল।

বৃষ্টি তখন জোরে পড়ছে।

আমি বললাম,

— আপনারা ভিজবেন?

হাসিখুশি অন্ধটা বলল,

— সমস্যা নেই।

— কেন?

— আমরা আকাশ দেখতে পাই না। তাই বৃষ্টি আমাদের কাছে শুধু ঠান্ডা পানি।

হিসাবি অন্ধটা বলল,

— আর বৃষ্টি হলে মানুষ বেশি দয়া করে।

হাসিখুশি অন্ধটা বলল,

— তবে বেশি দয়া করলে সমস্যা।

আমি বললাম,

— কেন?

সে বলল,

— তখন মনে হয় আমরা খুব দুঃখী।

রোহিত আস্তে বলল,

— আমরা দুঃখী না। আমরা শুধু অন্ধ।

এই কথাটা বলার সময় তার গলায় এমন শান্তি ছিল যে আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম।

তিনজন হাঁটতে শুরু করল।

আমি বললাম,

— কোথায় যাচ্ছেন?

হাসিখুশি অন্ধটা বলল,

— চা খেতে



— এত বৃষ্টিতে?

— বৃষ্টির দিনে চা না খেলে বৃষ্টি রাগ করে।

আমি বললাম,

— বৃষ্টি আবার রাগ করে নাকি?

সে বলল,

— অবশ্যই। তখন আরও বেশি পড়ে।

তিনজন ধীরে ধীরে দূরে চলে গেল।

আমি দাঁড়িয়ে রইলাম।

হঠাৎ মনে হলো, পৃথিবীতে অনেক মানুষ আছে যারা চোখে সব দেখে, কিন্তু কিছুই বুঝে না।

আর এই তিনজন মানুষ, যারা চোখে কিছুই দেখে না, তারা জীবনের মজাটা খুব ভালো বুঝে ফেলেছে। 




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

ঘুম গবেষক সুলেমান