নিঝুম রাত। চারদিকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর বাঁশঝাড়ের মাথার ওপর রূপালি চাঁদের আলো। ঠিক এমন একটা পরিবেশে সাধারণ মানুষের গা ছমছম করার কথা। কিন্তু ইয়াসিন ছেলেটা একটু অন্যরকম। সে বারান্দায় বসে একা একা একটা বাসি লুচি চিবুচ্ছিল আর আকাশের তারা গুনছিল
ঠিক সেই সময় একটা দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল। একদম কানের কাছে।
"উহুঁ... উঁহুউউ..."
ইয়াসিন লুচি চিবানো থামিয়ে শান্ত গলায় বলল, "কে? খকখক করে কাশছেন কেন? আদা চা লাগবে?"
অন্ধকার থেকে একটা অবয়ব বেরিয়ে এল। ধবধবে সাদা ধুতি পরা, কিন্তু পা দুটো উল্টো। তবে চেহারাটা মোটেও ভয়ংকর না, বরং বেশ করুণ। বড় বড় দুটো চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে।
ভুতুড়ে কণ্ঠস্বরে সে বলল, "আমি ভূত। আমার নাম... হাবলুচাঁদ।"
ইয়াসিন হো হো করে হেসে উঠল। "হাবলুচাঁদ? এটা কোনো ভূতের নাম হলো? এর চেয়ে আমার বিড়ালটার নাম 'টাইগার' অনেক বেশি ভয়ংকর।"
হাবলুচাঁদ থতমত খেয়ে গেল। সে একটা ভয়ংকর গর্জন দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু বেরোলো মেউ মেউ গোছের একটা শব্দ। তারপর সে ধপাস করে বারান্দার মেঝেতে বসে পড়ল। বসার সময় তার উল্টো পা দুটো বেকায়দায় আটকে গিয়ে সে একটা ডিগবাজিও খেল।
"দেখলে তো? এই আমার জীবন," হাবলুচাঁদ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। "পাঁচশ বছর ধরে ভূত হয়ে আছি, কিন্তু একটা মানুষকেও ঠিকমতো ভয় দেখাতে পারলাম না। কাল রাতে এক বুড়িকে ভয় দেখাতে গেলাম, সে উল্টো আমাকে ঝাড়ু দিয়ে তাড়িয়ে দিয়ে বলল— 'এসেছে ছাতা মেরামত করতে, এখন যাও, কাল সকালে এসো'।"
ইয়াসিনের মায়া হলো। সে তার বাসি লুচির অর্ধেকটা হাবলুচাঁদের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, "নিন, এটা খান। ভূতেরা কি লুচি খায়?"
হাবলুচাঁদ করুণ চোখে তাকিয়ে বলল, "খাই না, কিন্তু আজ খুব খিদে পেয়েছে। ভয় দেখাতে গিয়ে এনার্জি শেষ হয়ে গেছে।" সে লুচিটা মুখে দিয়ে চিবোতে গিয়ে আবার বিপত্তি বাঁধাল। তার আলগা একটা দাঁত খুলে কোলের ওপর পড়ে গেল।
"মাগো! আমার দাঁত!" বলে হাবলুচাঁদ অন্ধকারের মধ্যে হামাগুড়ি দিয়ে দাঁত খুঁজতে শুরু করল। ইয়াসিন টর্চ জ্বালিয়ে তাকে সাহায্য করল। দৃশ্যটা বেশ অদ্ভুত—একটা ছোট ছেলে আর একটা তথাকথিত ভয়ংকর ভূত মিলে মেঝেতে দাঁত খুঁজছে।
দাঁতটা খুঁজে পাওয়ার পর ইয়াসিন বলল, "শুনুন হাবলু ভাই, আপনার দিয়ে ভয় দেখানো হবে না। আপনি বরং আমার বন্ধু হয়ে যান। আমার একটা হোমওয়ার্ক আছে—বাংলার ভূত নিয়ে প্রবন্ধ লেখা। আপনি আমাকে ইনফরমেশন দেবেন, আমি আপনাকে রোজ বিস্কুট খাওয়াব।"
হাবলুচাঁদ আনন্দে নেচে উঠল। "সত্যি? বন্ধু হবে? তাহলে চলো তোমাকে আমাদের শ্যাওড়া গাছের আস্তানায় নিয়ে যাই। সেখানে আমার মামা 'পান্তাভুত' থাকে, সে আবার দারুণ গান গায়।"
চাঁদের আলোয় তখন বাঁশঝাড়ের ছায়াগুলো নাচছে। ঝিরঝিরে বাতাসে শিউলি ফুলের গন্ধ ভেসে আসছে। একটা ছোট ছেলে আর একটা বেকুব ভূত হাত ধরাধরি করে (অবশ্য হাবলুচাঁদের হাতটা একটু বেশিই ঠাণ্ডা আর চটচটে) বাগানের দিকে হাঁটা দিল। হাবলুচাঁদ যাওয়ার পথে তিনবার হোঁচট খেল আর দুবার নিজের ছায়া দেখে নিজেই ভয় পেয়ে লাফিয়ে উঠল।
ইয়াসিন হাসতে হাসতে বলল, "হাবলু ভাই, সাবধানে! আপনি তো ভূত জগতের কলঙ্ক!"
হাবলুচাঁদ লজ্জিত মুখে বলল, "আরে না না, ওটা আসলে প্র্যাকটিস করছিলাম। ভয় পাওয়ার অভিনয় করাও তো একটা আর্ট, তাই না
রাতে বাগানে বসে দুজনের মধ্যে শুরু হলো এক অদ্ভুত আড্ডা। প্রকৃতির নিস্তব্ধতা ভেঙে মাঝে মাঝে ইয়াসিনের খিলখিল হাসি আর হাবলুচাঁদের আজব সব বোকামির গল্পে বাতাস ভারী হয়ে উঠল। ভয় আর আতঙ্কের বদলে জন্ম নিল এক মিষ্টি বন্ধু?

...png)

0 মন্তব্যসমূহ