গ্রামের নাম ধরা যাক নবীনপুর। দুপুরে এখানে এত শান্তি থাকে যে, চায়ের দোকানের বেঞ্চেও মাঝে মাঝে ঘুম নেমে আসে। কিন্তু একদিন হঠাৎ খবর ছড়াল—
“রাব্বানী জার্মানি থেকে বিয়ে করতে আসছে!”
গ্রামের চায়ের দোকানে তখন চা কম, আলোচনা বেশি।
রাব্বানী থাকে Germany-এর পশ্চিম দিকে। সেখানে তার দুইটা ছোট হোটেল আছে।
হোটেল বলতে বড় কিছু না, কিন্তু চলতি। বার্গার, ফাস্টফুড, সাথে কিছু ড্রিংস—এই নিয়েই ব্যবসা।
বিদেশে বছর বছর কাটাতে কাটাতে মানুষটা একটু ক্লান্তও হয়ে গেছে।
একদিন তার মা ফোনে বললেন—
— “বাবা, ব্যবসা তো হলো। এখন বিয়েটাও করো।”
রাব্বানী হেসে বলল—
— “মা, মেয়ে দেখো। আমি ছুটি নিয়ে আসছি।”
বিদেশে ব্যবসা ছেড়ে ছুটি নেওয়া সহজ নয়। তবুও সে কষ্ট করে কয়েক সপ্তাহের ছুটি ম্যানেজ করল।
কারণ তার মাথায় একটা হিসাব—
ছুটি কম, বিয়ে দ্রুত।
ঘটকের প্রবেশ
গ্রামে তখন হাজির হলেন বিখ্যাত করিম ঘটক।
লোকটা এত বিয়ে দিয়েছে যে গ্রামের মানুষ মজা করে বলে—
“করিম ঘটক চাইলে গাছের সাথেও বিয়ে ঠিক করে দিতে পারে!” 😄
করিম ঘটক বলল—
— “একটা মেয়ে আছে। সুন্দর, শিক্ষিত, পরিবারও ভালো।”
সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। একদিন মেয়ে দেখতে যাওয়ার দিন ঠিক হল।
প্রথম দেখা
মেয়ের বাড়িতে গিয়ে সবাই বসেছে।
মেয়ের বাবা ছিলেন এলাকার বড় আইনজীবী।
বাড়ির পরিবেশে একটা আলাদা গাম্ভীর্য।
কিন্তু ছেলের বাবা লক্ষ করলেন—তাকে যেন খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না।
তিনি চুপচাপ বিষয়টা খেয়াল করছিলেন
একসময় মেয়ের বাবা সিগারেট বের করলেন।
ফিল্টারওয়ালা ভালো সিগারেট নিজের জন্য ধরালেন।
তারপর ছেলের বাবার দিকে একটা সিগারেট বাড়িয়ে দিলেন।
ছেলের বাবা হাতে নিয়ে একটু তাকালেন।
তারপর শান্ত গলায় বললেন—
— “আমাকে ফিল্টার ছাড়া কমদামি সিগারেট দেওয়া হয়েছে। এটা স্পষ্ট অপমান। বিয়াই হিসেবে সম্মান না দিলে এই বিয়ে করা ঠিক হবে না।”
ঘরের মধ্যে হঠাৎ নীরবতা নেমে এল।
করিম ঘটক কপালে হাত দিল।
কারণ বিয়েটা প্রায় ঠিক হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু ছেলের বাবা উঠে দাঁড়ালেন।
— “এই বিয়ে হবে না।”
যাত্রা বিরতি
এক কথায় সব শেষ।
ঘটক হতভম্ব।
মেয়ের পরিবার অবাক।
রাব্বানী তখন চুপ করে বসে আছে।
তার মাথায় তখন একটাই চিন্তা—
“আর এক সপ্তাহ পরে আমাকে জার্মানিতে ফিরতে হবে!”
পাঁচ দিনের ছুটি ইতিমধ্যে চলে গেছে।
গ্রামে আবার আলোচনা শুরু—
“জার্মানির বর বিয়ে না করেই ফিরে যাবে নাকি?” 😅
তড়িঘড়ি নতুন বিয়ে
করিম ঘটক আবার মাঠে নামলেন।
— “চিন্তা করবেন না। আরেকটা মেয়ে আছে।”
সময় কম, খোঁজখবরও খুব একটা নেওয়া গেল না।
দুই দিনের মধ্যে আরেকটা মেয়ে দেখা হল।
রাব্বানী প্রথমে একটু চুপ করে তাকিয়ে ছিল।
মেয়েটা লম্বা, ফর্সা, সুন্দর।
চোখে শান্ত একটা ভাব।
রাব্বানী মনে মনে বলল—
“এটা তো লটারির টিকিটের মতো!”
করিম ঘটক পাশে দাঁড়িয়ে হাসল।
— “দেখলেন? আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন।”
এক্সপ্রেস বিয়ে
তাড়াহুড়ো করেই বিয়ে হয়ে গেল।
গ্রামের লোকজন বলল—
“এই বিয়ে একেবারে এক্সপ্রেস ট্রেন!” 🚆
কয়েক দিনের মধ্যেই রাব্বানী আবার ফিরে গেল Germany।
প্রথম দিকের সংসার
শুরুতে একটু সমস্যা ছিল।
কারণ মেয়েটা গ্রামের মেয়ে, আর রাব্বানীর জীবন বিদেশে।
একদিন রাব্বানী বলল—
— “আজ বার্গার বানাও।”
স্ত্রী বলল—
— “বার্গার আবার কী?”
রাব্বানী হেসে বলল—
— “আচ্ছা, তুমি ভাত রান্না করো। বার্গার আমি বানাবো।” 🍔
ধীরে ধীরে তারা একে অপরকে বুঝতে শিখল।
ঝগড়াও হয়েছে।
আবার হাসিও হয়েছে।
বিদেশের মজার ঘটনা
একদিন জার্মানিতে দোকানে বসে আছে রাব্বানীর স্ত্রী।
একজন জার্মান কাস্টমার এসে বলল—
— “বার্গার।”
সে ঠিক বুঝতে পারল না।
সে জিজ্ঞেস করল—
— “ভাত খাইবেন?” 🍚
কাস্টমার অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
পরে রাব্বানী এসে হেসে বলল—
— “এখানে ভাতের চেয়ে বার্গার বেশি চলে।”
ঘটকের সাথে আবার দেখা
কয়েক বছর পরে রাব্বানী গ্রামে এলো।
করিম ঘটকের সাথে দেখা।
ঘটক হাসতে হাসতে বলল—
— “দেখলেন? আমি না থাকলে আপনি এখনো অবিবাহিত!”
রাব্বানী বলল—
— “আপনি না থাকলে হয়তো অন্য গল্প হতো।”
আজকের সংসার
সময় কেটে গেছে।
আজ তাদের সংসারে দুই ছেলে আর এক মেয়ে।
জার্মানির সেই ছোট হোটেল এখন একটু বড় হয়েছে।
স্ত্রী এখন বার্গারও বানাতে পারে, আবার ভাতও।
একদিন রাব্বানী মজা করে বলল—
— “জানো, যদি সেই প্রথম বিয়েটা হয়ে যেত?”
স্ত্রী হাসল।
— “তাহলে আমি থাকতাম না।”
রাব্বানী চুপ করে হাসল।
কারণ জীবনের একটা অদ্ভুত সত্য আছে—
কখনও কখনও
একটা অপমান, একটা ভাঙা বিয়ে, একটা ভুল সিদ্ধান্ত…
শেষ পর্যন্ত
সবচেয়ে বড় সুখের দরজা খুলে দেয়।
আর করিম ঘটক এখনো গ্রামে বলে—
“আমার দেওয়া বিয়েগুলো লটারি।
কিন্তু রাব্বানীরটা ছিল জ্যাকপট লটারি!” 😄



0 মন্তব্যসমূহ