মানুষ চেনা ,আর তরমুজ চেনা দুটোই কঠিন

 মিজান সাহেবের একটা সমস্যা আছে। তিনি মানুষকে বিশ্বাস করেন। আর মানুষ তাকে শিক্ষা দেয়।

ঘটনাটা আজ বিকেলের। বাজারে গিয়ে তিনি তরমুজের স্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে খুব ভদ্র গলায় বললেন,

“ভাই, ভালো দেখে একটা তরমুজ দেন তো। আমি কিন্তু আপনাকে বিশ্বাস করছি।”

বিক্রেতা এমন ভঙ্গিতে তরমুজ দিল, যেন সে মানবতার শেষ প্রতিনিধি।



বাড়ি ফিরে তরমুজ কাটা হলো।

ভিতরে শুকনো, ক্লান্ত, রসহীন এক পৃথিবী।

স্ত্রী তাকিয়ে বললেন,

“তুমি জীবনে কবে শিখবা?”

মিজান সাহেব একটু ভেবে বললেন,

“আমি তো শিখতেছি।”


তিনি সত্যিই শিখছেন।

কিন্তু তার শেখা অন্যরকম।

কেউ বই পড়ে শেখে, কেউ অভিজ্ঞতা থেকে শেখে, আর মিজান সাহেব শেখেন বাঁশ খেয়ে খেয়ে।

স্কুলে পড়ার সময় বন্ধু বলেছিল, আই  আমরা টিফিন ভাগাভাগি করে খাই বলে সে তার রুটিটা আমাকে গছিয়ে দিয়ে আমার ডিমটা খেয়ে ফেলেছিল,মিজান সাহেবের জীবনটা যেন বিশ্বাসের উপর নির্মিত এক বহুতল ভবন।

তিনি প্রায়ই বলেন,

“আমি শিক্ষা পেয়েছি।

আসলে তার শিক্ষা হয়েছে। তবে সেটা বই পড়ে নয়, বাঁশ খেয়ে খেয়ে।

একবার এক আত্মীয় এসে বলেছিল,

“পনের দিন  থাকি, দ্রুত একটা কাজ খুঁজে নিয়ে চলে যাবো ।”

সে আত্মীয় চার মাস থেকে, পাঁচটা চেয়ার ভেঙে, ফ্রিজের আইসক্রিম শেষ করে, বিদায় নিল। যাওয়ার সময় বলল,

“দোয়া করবেন।”

মিজান সাহেব দোয়া করেছিলেন। এখনো করেন।

তরমুজের শুকনো ভেতরটা দেখে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন না।

বরং বললেন,

“বাহির দেখে মানুষ বিচার করা ঠিক না।”

স্ত্রী বললেন,

“তাহলে তুমি কেন বারবার বাহির দেখে কিনো?”

এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে তিনি একটু থামলেন।

তারপর চুপ করে বারান্দায় গিয়ে বসে রইলেন।

রাতে তাকে দেখা গেল তরমুজের একটা শুকনো টুকরো হাতে নিয়ে গভীরভাবে তাকিয়ে আছেন।

হঠাৎ তিনি বললেন,

“তরমুজটা দোষী না। বিক্রেতাও পুরো দোষী না। আসল দোষ আমার। আমি বিশ্বাস করি।”

স্ত্রী হাসলেন ,বললেন,

“তাহলে বিশ্বাস করা বন্ধ করো।”




মিজান সাহেব মাথা নাড়লেন।

পরদিন আবার বাজারে গেলেন।

অন্য দোকান।

অন্য বিক্রেতা।

অন্য হাসি।

তিনি দাঁড়িয়ে বললেন,

“ভাই, ভালো দেখে একটা  তরমুজ দেন। আমি কিন্তু আপনাকে বিশ্বাস করছি।”

এইবার বিক্রেতা একটু থেমে তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন ,সেই  হাসিতে আছে আন্তরিকতা, আছে বিশ্বাসের মর্যাদা রাখার সুপ্ত বাসনা 

“বিশ্বাস করেন? তাহলে কাটা তরমুজ নেন। ভেতর দেখে নেন।”

মিজান সাহেব হকচকিয়ে গেলেন।

কাটা তরমুজ!

মানে, তরমুজের খোলসের ভেতরে লুকায়িত ভবিষ্যৎকে বাস্তবে নিয়ে আসা !

তিনি তরমুজের ভেতরটা দেখলেন। রসে ভরা।

বাড়ি ফিরে তরমুজ দেখালেন।

স্ত্রী বললেন,

“এবার ঠিক আছে?”

মিজান সাহেব হেসে বললেন,

“হ্যাঁ। আজ আমি বিশ্বাস করেছি, তবে চোখ খোলা রেখে।”

তারপর খুব গম্ভীর হয়ে যোগ করলেন,

“জীবনে ঠকা খারাপ না। কিন্তু একই জায়গায় দাঁড়িয়ে ঠকা একটু অলসতা।”

মিজান সাহেব এখনো মানুষকে বিশ্বাস করেন।

তবে আগে ভেতরটা একটু দেখে নেন।

তিনি বুদ্ধিমান হয়েছেন কিনা বলা মুশকিল।

পরদিন আবার বাজারে গেলেন। অন্য দোকান। অন্য মুখ।

“ভাই, ভালো দেখে একটা দেন তো। আমি কিন্তু আপনাকে বিশ্বাস করছি।”

বাজারের ভিড়ে হাওয়া একটু থমকালো।  ইতিহাস  আবার কোন দিকে মোড় নেই সেটাই  দেখার  বিষয় 



মিজান সাহেব আসলে বোকা না। তিনি জানেন, মানুষ ঠকায়। তবু তিনি বিশ্বাস করেন। কারণ তিনি ভাবেন, যদি সবাই সন্দেহ করে বাঁচে, তাহলে পৃথিবীটা আরও শুকনো তরমুজ হয়ে যাবে।

মিজান সাহেব বারবার ঠকেছেন কারণ তিনি মানুষকে সুযোগ দিয়েছেন, কিন্তু যাচাই করেননি। তিনি মনে করেছেন ভালো কথা মানেই ভালো মানুষ। হাসি মানেই সততা। বাহিরে লাল মানেই ভিতরে রস।

মানুষকে বিশ্বাস করো, কিন্তু চোখ বন্ধ করে নয়। অভিজ্ঞতা যদি আচরণ না বদলায়, তাহলে সেটা শিক্ষা নয়, শুধু স্মৃতি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

ঘুম গবেষক সুলেমান