যে গ্রামে মানুষ এখনো মানুষ

 নাটোরের পাকুড়িয়া গ্রামে পৌঁছানোর আগে রাস্তার ধুলোটা একটু অন্যরকম লাগে। শহরের ধুলো যেমন কেবল নাকে ঢুকে বিরক্ত করে, গ্রামের ধুলো তেমন না। এই ধুলোতে মাটির গন্ধ থাকে, ধানের গন্ধ থাকে, আর অদ্ভুত এক শান্তি থাকে।


সেদিন ছিল পৌষের সকাল। কুয়াশা এমনভাবে চারপাশ ঢেকে রেখেছে, মনে হয় কেউ যেন তুলোর কম্বল টেনে দিয়েছে পুরো গ্রামটার ওপর।

আমি যখন পাকুড়িয়ায় পৌঁছালাম, তখন ভোরের চা খাওয়ার সময়।

গ্রামের এক চায়ের দোকান। দোকান বলতে বাঁশের খুঁটি, টিনের ছাউনি, আর সামনে একটা লম্বা বেঞ্চ। বেঞ্চটা দেখে মনে হয় বহু যুগ ধরে মানুষ বসে গল্প করছে।

চায়ের দোকানের মালিক করিম চাচা। বয়স কত জিজ্ঞেস করলে বলেন,

“বয়স? আরে বাবা, বয়স গুনে কী হবে? এই এক মুঠ মুড়ি যে  কয়ডা  ততই বয়স ধরো!”

আমি বসতেই তিনি চা ঢাললেন।

চায়ের কাপ হাতে দিয়ে বললেন,

“শহর থেকে এসেছেন মনে হয়?”

আমি বললাম,

“কী করে বুঝলেন?”

তিনি খুব গম্ভীর হয়ে বললেন,

“গ্রামের মানুষ এত সকালে চা খেতে এসে এত চুপচাপ বসে থাকে না। তারা আসলে গল্প করে।”

এই বলে নিজেই হেসে ফেললেন।

চায়ের সাথে তিনি দিলেন মুড়ি আর রশি গুড়।

মুড়ির ওপর গুড়টা এমনভাবে রাখা, যেন সেটা কোনো শিল্পকর্ম।

আমি একটু খেতেই বললাম,

“চাচা, এত মজা কেন?”

তিনি চোখ ছোট করে বললেন,

“কারণ এটা শহরের গুড় না। এটা মাটির গুড়।”

এই সময় পাশের বেঞ্চে বসে থাকা এক লোক বলল,

“করিম, মাটির গুড় আবার কী জিনিস?”

করিম চাচা খুব সিরিয়াস হয়ে বললেন,

“যে গুড় খেলে মনে হয় জীবনটা খারাপ না, ওটাই মাটির গুড়।”

সবাই হেসে উঠল।

পাকুড়িয়া গ্রামের মানুষজন অদ্ভুত রকম সহজ।

এখানে কেউ তাড়াহুড়ো করে না।

একটা গরু রাস্তা পার হচ্ছে, সবাই দাঁড়িয়ে থাকে।

কেউ হর্ন দেয় না। কারণ গরুরও তো একটু সময় দরকার।


গ্রামের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দেখি মাটির ঘর। দেয়ালগুলোতে ফাটল আছে, কিন্তু সেই ফাটলেও একটা গল্প আছে।

একটা বাড়ির সামনে এক বৃদ্ধা রোদে বসে ধান কুড়াচ্ছেন।

আমি জিজ্ঞেস করলাম,

“দাদি, এই কাজটা একা করেন?”

তিনি বললেন,

“একা না, আমার সাথে রোদ আছে।”

আমি একটু অবাক হয়ে বললাম,

“রোদ?”

তিনি হাসলেন।

“হ্যাঁ বাবা। শহরে মানুষ একা থাকে, গ্রামে মানুষ একা না। এখানে রোদ আছে, বাতাস আছে, পাখি আছে।”



এই সময় একটা ছাগল এসে ধানের ওপর মুখ দিল।

বৃদ্ধা ছাগলটার দিকে তাকিয়ে বললেন,

“এই দেখো, এটাও আছে!”

আমি হাসতে হাসতে প্রায় বসে পড়লাম।

পাকুড়িয়া গ্রামের সবচেয়ে জনপ্রিয় মানুষ হচ্ছে জাহাঙ্গীর কাকা।

তার বিশেষ কোনো কাজ নেই। কিন্তু গ্রামের সব খবর তিনি জানেন।

আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম,

“কাকা, আপনি কী করেন?”

তিনি বললেন,

“আমি মানুষের খবর রাখি।”

আমি বললাম,

“মানে?”

তিনি গম্ভীর হয়ে বললেন,

“কে হাসছে, কে কাঁদছে, কে চুপচাপ হয়ে গেছে—এই খবর রাখি।”

তারপর একটু থেমে বললেন,

“শহরে এই কাজটা কেউ করে না।”

বিকেলের দিকে গ্রামের মাঠে গেলাম।

মাঠে কিছু বাচ্চা ক্রিকেট খেলছে। ব্যাটটা বাঁশের, বলটা টেনিস বলের পুরনো চামড়া।

একটা ছেলে আউট হয়ে এত রাগ করল যে ব্যাট ছুঁড়ে ফেলল।


পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরেকটা ছেলে বলল,

“এত  রাগ করলে তর বৌ থাকবনা !”

সবাই হেসে উঠল।

পাকুড়িয়া গ্রামের হাসিটা খুব সহজ।

এখানে হাসার জন্য আলাদা কারণ লাগে না।

সন্ধ্যা নামার সময় কুয়াশা আবার নেমে এল।

দূরে একটা মসজিদের আজান শোনা যাচ্ছে।

কোথাও গরুর ঘণ্টা বাজছে।

কোথাও রান্নার ধোঁয়া উঠছে।

করিম চাচার দোকানে আবার বসেছি।

তিনি চা ঢালতে ঢালতে বললেন,

“শহরে মানুষ অনেক কিছু পায়, কিন্তু একটা জিনিস পায় না।”

আমি জিজ্ঞেস করলাম,

“কী?”

তিনি বললেন,

“সময়।”

আমি চুপ করে রইলাম।

কিছুক্ষণ পরে তিনি আবার বললেন,

“এখানে মানুষ সময় নিয়ে বাঁচে।”

পাকুড়িয়া গ্রামটা খুব বড় না।

কিন্তু এই ছোট গ্রামের মধ্যে একটা বড় জিনিস আছে।

এখানে মানুষ মানুষকে চেনে।

কে অসুস্থ, কে কষ্টে আছে, কে একা হয়ে গেছে—এই খবর সবাই রাখে।

শহরে অনেক আলো আছে, কিন্তু মানুষ একা।

গ্রামে আলো কম, কিন্তু মানুষ একা না।

রাতের দিকে যখন আমি গ্রামটা ছাড়ছিলাম, তখন কুয়াশার ভেতর দিয়ে মাটির ঘরগুলো যেন শান্তভাবে দাঁড়িয়ে ছিল।


মনে হচ্ছিল, তারা কিছু বলছে।

হয়তো বলছে—

জীবনটা খুব বড় কিছু না।

কিন্তু মানুষ যদি একটু সময় নিয়ে, একটু ভালোবাসা নিয়ে বাঁচে…

তাহলে ছোট্ট একটা গ্রামও পুরো পৃথিবীর মতো সুন্দর হয়ে উঠতে পারে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

ঘুম গবেষক সুলেমান