আমাদের পাড়ায় এক ভদ্রলোক আছেন, নাম আব্দুল হালিম। নাম শুনলেই মনে হয় ভদ্রলোক খুব ধৈর্যশীল মানুষ। আসলে তিনি সত্যিই ধৈর্যশীল। পাড়ায় কেউ ঝগড়া করলে তিনি শান্ত গলায় বলেন,
“আচ্ছা আগে চা খাই, তারপর ঝগড়া করব।”
মানুষ রাগে ফুঁসছে, আর তিনি চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন।
হালিম সাহেবের একটা অদ্ভুত তত্ত্ব আছে। তিনি বলেন, মানুষের জীবনে তিনটা জিনিস গুরুত্বপূর্ণ। শান্তি, খাবার, আর আবার খাবার।
তিনি দাবি করেন, তাদের পরিবার নাকি বাদশাহী বংশের। কথাটা কতটা সত্যি কেউ জানে না, তবে তিনি এমনভাবে বলেন যে মনে হয় আকবর বাদশাহর সঙ্গে তার পারিবারিক চা খাওয়ার সম্পর্ক ছিল।
তিনি মাঝেমধ্যে বলেন,
“আমাদের বাপ-দাদারা এমন এমন খাবার খেত, নাম শুনলে তুই দাঁড়িয়ে পড়বি।”
তারপর তিনি এক নিশ্বাসে বলতে থাকেন,
কালিয়া, রেজালা, নেহারি, কাবাব, শাহী টুকরা, বোরহানি, কোরমা…
শুনতে শুনতে মনে হয় আমরা যেন খাবারের ইতিহাসের ক্লাস করছি।
ঢাকার কোথায় কোন খাবার ভালো পাওয়া যায়, এই বিষয়ে তিনি চলমান বিশ্বকোষ। কেউ যদি তাকে রাত দুইটায় ঘুম থেকে তুলে জিজ্ঞেস করে, “ভালো কাবাব কোথায় পাওয়া যায়?”
তিনি চোখ না খুলেই ঠিকানা বলে দিতে পারবেন।
রমজান মাসে তার এক বিশেষ শখ আছে। সেহরি খেতে তিনি পুরান ঢাকায় চলে যান।
একবার আমি জিজ্ঞেস করলাম,
“এই ভোরবেলায় এত দূরে যান কেন?”
তিনি গম্ভীর গলায় বললেন,
“বুঝবি না। সেহরির খাবারেরও একটা আধ্যাত্মিকতা আছে।”
পরে শুনলাম সেই আধ্যাত্মিকতার নাম নেহারি আর মগজ ভুনা।
হালিম সাহেবের আরেকটা গুণ আছে। মন খারাপ হলে তিনি বিশ্রাম নেন না।
তিনি ফ্রিজ খোলেন।
তারপর এমনভাবে ফ্রিজ পরিষ্কার করেন যেন কোনো তদন্ত দল এসে প্রমাণ লুকিয়ে ফেলছে।
একদিন তাকে জিজ্ঞেস করলাম,
“জীবনে সেরা বিনিয়োগটা কোথায় করেছেন?”
তিনি রহস্যময় হাসি দিলেন।
আমি ভাবলাম তিনি হয়তো বলবেন শেয়ার বাজার, জমি বা সোনার কথা।
কিন্তু তিনি বললেন,
“খাবারের প্লেটে।”
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলাম।
তিনি বললেন,
“এই বিনিয়োগের লাভ সরাসরি পেটে যায় আর তৃপ্তি মনে।”
এই ভদ্রলোকের জীবনে একটা সময় প্রেমও এসেছিল।
মেয়েটি নাকি খুব বুদ্ধিমতী। প্রায় ব্যারিস্টারের মতো প্রশ্ন করে।
একদিন নাকি মেয়েটি তাকে জিজ্ঞেস করল,
“আমি কি তোমার কাছে খাবারের চেয়েও কম প্রিয়?”
হালিম সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন,
“প্রশ্নটা একটু অন্যভাবে করা যায়?”
মেয়েটি বলল, “কীভাবে?”
তিনি বললেন,
“ধরো প্রশ্নটা এমন হল— তুমি আর বিরিয়ানি, দুজনকে একসাথে বাঁচাতে হলে কাকে বাঁচাব?”
এই উত্তর শোনার পর প্রেমের গল্পটা খুব দূর এগোয়নি।
কিন্তু হালিম সাহেবের জীবনের সবচেয়ে বড় ঘটনা ঘটল একদিন ডাক্তারের চেম্বারে।
ডাক্তার রিপোর্ট দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
তারপর বললেন,
“আপনার ওজন দ্রুত কমাতে হবে।”
হালিম সাহেব মাথা নাড়লেন।
ডাক্তার বললেন,
“ভাত কম খাবেন, তেল কম খাবেন, মিষ্টি বাদ।”
সব কথা শুনে তিনি খুব মনোযোগ দিয়ে একটা প্রশ্ন করলেন।
“ডাক্তার সাহেব, বিরিয়ানি খাওয়ার সময় চামচটা বড় ব্যবহার করব না ছোট?”
ডাক্তার চশমা খুলে কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
সেদিন থেকেই শুরু হল তার ডায়েট জীবন।
প্রথম দিন তিনি ঘোষণা দিলেন,
“আজ থেকে ডায়েট।”
সকালে তিনি খালিপেটে গরম পানি খেলেন।
দুপুরে এক প্লেট সালাদ।
পাড়ার সবাই অবাক।
সন্ধ্যা পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল।
রাতে সমস্যা শুরু হল।
তিনি ফ্রিজ খুলে তাকিয়ে থাকলেন।
ভিতরে চিকেন, কাবাব, বিরিয়ানি।
তিনি নিজেকে বোঝালেন,
“না, আমি শক্ত মানুষ।”
পাঁচ মিনিট পর আবার ফ্রিজ খুললেন।
এইবার বললেন,
“শুধু একটু গন্ধ নেব।”
গন্ধ নিতে নিতে কখন যেন আধা প্লেট বিরিয়ানি খেয়ে ফেললেন।
পরদিন তিনি বললেন,
“ডায়েট কাল থেকে ঠিকমতো শুরু হবে।”
তার ডায়েট জীবনে অনেক অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে।
একদিন তিনি জিমে গেলেন।
ট্রেডমিলে দাঁড়িয়ে হাঁটছেন।
হঠাৎ পাশে কেউ বলল,
“কেমন লাগছে?”
তিনি হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন,
“এই মেশিনটা যদি আমাকে পুরান ঢাকার কাবাব দোকান পর্যন্ত নিয়ে যেত, তাহলে খুব ভালো লাগত।”
আরেকদিন তাকে দেখা গেল বাজারে।
তিনি খুব মন দিয়ে লাউ আর শসা কিনছেন।
আমি ভাবলাম ডায়েট খুব সিরিয়াসলি শুরু হয়েছে।
কিন্তু বাড়ি গিয়ে দেখি সেই লাউ দিয়ে মটন কালিয়া রান্না হচ্ছে।
আমি বললাম,
“এটা কি ডায়েট?”
তিনি গর্বের সঙ্গে বললেন,
“লাউ তো আছে!”
সবচেয়ে মজার ঘটনা ঘটল এক রাতে।
তিনি ডায়েট করার শপথ নিয়ে ঘুমাতে গেলেন।
রাতে হঠাৎ স্বপ্ন দেখলেন বিশাল এক বিরিয়ানির পাহাড়।
সেখানে কাবাব নদী বয়ে যাচ্ছে।
হালিম সাহেব সেই নদীতে সাঁতার কাটছেন।
হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল।
তিনি ঘামতে ঘামতে উঠে বসে বললেন,
“এই স্বপ্নটা খুব বিপজ্জনক।”
তারপর ধীরে ধীরে ফ্রিজের দিকে হাঁটলেন।
পরদিন সকালে আবার ঘোষণা দিলেন,
“আজ থেকে সত্যি ডায়েট।”
আমরা সবাই এখন তার ডায়েটের গল্প শুনি।
কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, এত চেষ্টা করেও তার ওজন খুব একটা কমেনি।
তবে একটা জিনিস বেড়েছে।
তার গল্প।
কারণ ডায়েট করতে গিয়ে যত বিপদে পড়েছেন, তত হাসির ঘটনা তৈরি হয়েছে।
পাড়ায় কেউ মন খারাপ করলে এখন একটা সহজ সমাধান আছে।
আমরা বলি,
“চলো হালিম সাহেবের ডায়েটের গল্প শুনি।”
তারপর সবাই হেসে গড়াগড়ি খাই।
আর হালিম সাহেব শান্ত গলায় বলেন,
“হাসিস কেন? ডায়েট খুব কঠিন জিনিস।”
একটু থেমে আবার বলেন,
“আচ্ছা, আগে চা খাই। তারপর ডায়েট নিয়ে আলোচনা করব।” ☕😄



0 মন্তব্যসমূহ