গ্রামের নাম শান্তিনগর, নাম হওয়া দরকার ছিল কৌতুহল নগর। নামের সঙ্গে বাস্তবের মিল খুব একটা ছিল না। এখানে শান্তির চেয়ে কৌতূহল বেশি। কেউ নতুন স্টাইল এ চুল কাটলে তিন বাসা দূরের খালাম্মা সেটা জেনে ফেলেন। আর প্রেমের খবর? ওটা তো পাড়ার জাতীয় সম্পদ।
এই পাড়াতেই থাকত সেলিম। শান্ত, ভদ্র, একটু লাজুক ধরনের ছেলে। সে যে প্রেম করতে পারে, এটা তার নিজের কাছেও মাঝে মাঝে অবিশ্বাস্য লাগত।
পাশের বাসায় থাকত নুসাইবা। চুলে সবসময় একটা নীল ফিতা বাঁধা থাকত। হাসলে মনে হতো কেউ যেন আলতো করে বাতি জ্বেলে দিয়েছে।
সেলিম প্রথম দিন নুসাইবাকে দেখে ভেবেছিল, “মেয়েটা কি সবসময়ই এত সুন্দর, নাকি আজকেই বিশেষ দিন?”
তারপর থেকে প্রতিদিনই তার কাছে বিশেষ দিন।
সমস্যা হলো, সেলিম সাহসী মানুষ না। সিনেমার নায়কের মতো গিয়ে “আমি তোমাকে ভালোবাসি” বলা তার পক্ষে সম্ভব না। সে ঠিক করল, একটা চিঠি লিখবে।
চিঠি লেখা শুরু করল এক বিকেলে। টেবিলে বসে তিনবার কাগজ ছিঁড়ল। প্রথমটায় লিখেছিল, “প্রিয় নুসাইবা, তোমাকে দেখলেই আমার বুক ধড়ফড় করে।”
পরে মনে হলো, বুক ধড়ফড় করলে মেয়েরা ভয় পেতে পারে।
দ্বিতীয়টায় লিখল, “তোমাকে দেখলে পৃথিবীটা সুন্দর লাগে।”
এটাও খুব সিনেমার মতো লাগল।
শেষে সে লিখল—
“নুসাইবা,
তুমি যদি কখনো ভাবো কেউ তোমাকে চুপচাপ ভালোবাসে, তাহলে জেনে রেখো সেই মানুষটা আমি। তোমার হাসি দেখলে মনে হয় পৃথিবীটা একটু ঠিকঠাক আছে।”
চিঠিটা পড়ে সেলিম নিজেই একটু আবেগপ্রবণ হয়ে গেল। এমনকি আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে বলল, “ভালোই লিখেছিস রে সেলিম।”
তারপর যা হলো, সেটা ইতিহাসে লেখা থাকার মতো ঘটনা।
চিঠিটা পোস্ট করার জন্য বের হওয়ার আগে সে ভুল করে বাবার টেবিলের ওপর রেখে গেল।
সন্ধ্যায় বাবা অফিস থেকে এসে টেবিলে বসে চিঠিটা দেখতে পেলেন।
খাম খুলে পড়লেন।
সেলিম দূর থেকে দেখছে, বাবার মুখ ধীরে ধীরে গম্ভীর হয়ে যাচ্ছে।
তার মনে হলো, আজকে হয়তো তার জীবন এখানেই শেষ।
বাবা চিঠি পড়ে চশমা খুলে বললেন,
“চিঠি খারাপ না।”
সেলিম ভয়ে ভয়ে বলল, “জি?”
বাবা বললেন,
“কিন্তু পোস্ট করার আগে বানানটা ঠিক করে নিও। ‘ভালোবাসি’ বানানটা ভুল হয়েছে।”
সেলিম তখন বুঝল, পৃথিবীতে সবচেয়ে ভয়ংকর জিনিস হলো শান্তভাবে কথা বলা বাবা।
পরের দিন সাহস করে চিঠিটা একটা ছোট ছেলের হাতে দিল। বলল, “ওই যে নুসাইবা আপুর বাসা, দিয়ে আসবি।”
ছেলেটা মাথা নেড়ে গেল।
কিন্তু ভাগ্য সেলিমের সঙ্গে তখন একটু রসিকতা করছিল।
ছেলেটা ভুল করে চিঠিটা দিয়ে এল পাশের বাসার নাসিম স্যারের হাতে।
নাসিম স্যার ছিলেন স্কুলের সবচেয়ে কড়া মাস্টার। ছাত্ররা তাকে দেখে এমনভাবে চুপ হয়ে যেত, যেন হঠাৎ করে স্কুলে পুলিশ ঢুকেছে।
পরদিন ক্লাসে সেলিম দেখল, নাসিম স্যার অদ্ভুতভাবে তার দিকে তাকাচ্ছেন।
তারপর মুচকি মুচকি হাসছেন।
এই হাসিটা খুবই বিপজ্জনক হাসি।
সেলিমের মনে হচ্ছিল, হয়তো জীবনে সে আর কখনো শান্তিতে স্কুলে যেতে পারবে না।
ক্লাসের মাঝখানে নাসিম স্যার বললেন,
“সেলিম, দাঁড়াও।”
সেলিম দাঁড়াল। তার হাঁটু একটু কাঁপছিল।
স্যার বললেন,
“চিঠি লেখো?”
পুরো ক্লাস একসাথে “ওওও” করে উঠল।
সেলিম মনে মনে ভাবল, “হে আল্লাহ, এখনই যদি পৃথিবীটা একটু ফেটে যেত!”
কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, নাসিম স্যার রাগ করলেন না।
তিনি হাসতে হাসতে বললেন,
“প্রেমপত্র লেখা খারাপ কিছু না। কিন্তু বানান ঠিক রাখতে হবে। তোমার বাবাও ঠিকই বলেছেন।”
ক্লাস তখন হাসিতে ফেটে পড়েছে।
সেদিন বিকেলে সেলিম মন খারাপ করে বাড়ি ফিরছিল। তার মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সব লজ্জা আজকে তার কপালে জুটেছে।
হঠাৎ পিছন থেকে একটা কণ্ঠস্বর।
“সেলিম!”
সে ঘুরে তাকাল।
নুসাইবা দাঁড়িয়ে আছে।
চুলে সেই নীল ফিতা।
নুসাইবা একটু হাসল। তারপর বলল,
“তোমার চিঠিটা আমি পড়েছি।”
সেলিম অবাক।
“কীভাবে?”
নুসাইবা বলল,
“নাসিম স্যার আমার মামা।”
সেলিম মনে মনে ভাবল, তার জীবনে নাটকের অভাব নেই।
নুসাইবা আবার বলল,
“তোমার বানান ভুল ছিল ঠিকই। কিন্তু কথাগুলো সুন্দর ছিল।”
সেলিম কিছু বলতে পারল না।
তার বুক আবার ধড়ফড় করতে লাগল। এবার সে মনে মনে ঠিক করল, এই কথাটা আর চিঠিতে না লিখে সরাসরি বলবে।
নুসাইবা একটু হেসে বলল,
“আর একটা কথা।”
“কি?”
“পরের চিঠিটা সরাসরি আমাকে দিও। মাঝখানে এত মানুষ লাগবে না।”
সেলিম তখন বুঝল, প্রেমের গল্পগুলো খুব বড় কিছু দিয়ে শুরু হয় না।
একটা ভুল বানান, একটা ভুল ঠিকানা, আর একটু লাজুক হাসি দিয়েই অনেক সময় শুরু হয়ে যায়।
আর দূরে কোথাও নাসিম স্যার হয়তো বসে বসে ভাবছেন—
“ছেলেটার বানান এখনও একটু দুর্বল, কিন্তু হৃদয়টা মন্দ না।”



0 মন্তব্যসমূহ