কৃষ্ণনগরের মোবারক হোসেনের জীবনটা বড়ই ট্র্যাজিক। পেশায় সে চোর, কিন্তু গ্রামের লোক তাকে ডাকে 'মুরগি মোবারক' নামে। চোর হিসেবে এর চেয়ে বড় অপমান আর কী হতে পারে? মোবারক স্বপ্ন দেখে সে একদিন আলমারি ভাঙবে, সিন্দুক সরাবে, পুলিশ তাকে ধরার জন্য হুলিয়া জারি করবে—অথচ কপালে জুটছে কেবল পাতিকাক মার্কা পাতি চোর হওয়ার তকমা।
মোবারক ঠিক করল, আজ রাতেই সে তার ইতিহাসের চাকা ঘুরিয়ে দেবে। সে চুরি করতে যাবে গ্রামের শেষ মাথায় সেই ভাঙা পুরনো দালানটায়। লোকে বলে ওটা একটা বড়লোক বাড়ির ধ্বংসাবশেষ। মোবারকের ধারণা, ধ্বংসাবশেষ হলেও সেখানে গোপন সিন্দুক থাকা অস্বাভাবিক নয়।
গভীর রাত। চারদিকে ঝিঁঝিঁ পোকার কনসার্ট চলছে। মোবারক লুঙ্গি মালকোঁচা মেরে, কপালে কালো তিলক কেটে (যাতে অন্ধকারে কেউ দেখতে না পায়) বের হলো। হাতে তার একটা জং ধরা শাবল আর একটা ছোট টর্চলাইট।
বাড়ির জানলাটা ভাঙাই ছিল। মোবারক অতি কষ্টে ভেতরে ঢুকল। ঘরে ঢুকেই সে টর্চটা জ্বালল। অমনি একটা খসখসে কণ্ঠস্বর শোনা গেল।
"ভাই, টর্চটা একটু বাঁ দিকের কোণায় ধরেন তো।"
মোবারক চমকে গিয়ে টর্চ ফেলে দেওয়ার উপক্রম করল। তাকিয়ে দেখে মেঝের এক কোণায় জীর্ণ একটা কাঁথা গায়ে দিয়ে এক ব্যক্তি শুয়ে আছে। তার নাম রিয়াজ সাহেব। রিয়াজ সাহেব মোটেও ভয় পাননি, বরং কাঁচুমাচু হয়ে বললেন, "ভাই, দুই দিন ধরে একটা দশ টাকার নোট খুঁজে পাচ্ছি না। অন্ধকারে তো কিছু দেখা যায় না। আপনি যখন কষ্ট করে আসলেনই, একটু খুঁজে দিয়ে যান না ভাই।"
মোবারক হতভম্ব। চোরকে দেখে মানুষ পুলিশ ডাকে, আর এ লোক তাকে দিয়ে টাকা খোঁজাচ্ছে! মোবারক রাগের মাথায় টর্চটা সেই কোণায় ধরল। দেখা গেল সেখানে দশ টাকার নোট নয়, একটা ছেঁড়া সিগারেটের প্যাকেট পড়ে আছে।
রিয়াজ সাহেব হতাশ হয়ে বললেন, "আরে না, এটাও তো না। আচ্ছা ভাই, বসেন। আজ আমারও পকেট খালি, আপনারও খালি। আমরা দুজন মিলে কিছুক্ষণ দেশের অর্থনীতি নিয়ে কান্নাকাটি করি।"
মোবারক মেঝের এক কোণায় ধপ করে বসে পড়ল। তার বড় চোর হওয়ার শখ মিটে গেছে। রিয়াজ সাহেব একটা মোমবাতি জ্বালালেন। মোমবাতির কাঁপা আলোয় রিয়াজ সাহেবের মুখটা বেশ করুণ দেখাল। মোবারক দেখল তার পকেটে আগের দিনের একটা বিস্কুটের প্যাকেট রয়ে গেছে। সে অনিচ্ছাসত্ত্বেও প্যাকেটটা বের করে বলল, "নেন ভাই, দুজনে ভাগ করে খাই। দেশের অর্থনীতির যে দশা, আপনারে দেখে মনে হচ্ছে আপনি আমার চেয়েও বড় বিপদে আছেন।"
রিয়াজ সাহেব বিস্কুট চিবোতে চিবোতে বললেন, "ভাই, আলমারিটা একবার খুলে দেখেছিলেন? ওটা খালি, ওখানে কিছু পাবেন না। বরং ওই কোণায় মশারিটা পড়ে আছে, ওটা একটু টাঙিয়ে দিয়ে যান। এই মশাগুলোর উৎপাতে একদম ঘুমানো যাচ্ছে না। আপনি না টাঙিয়ে দিলে আমি কিন্তু চিৎকার করে আশেপাশের সব লোক জড়ো করব। ঘুমটা আমার খুব দরকার।"
মোবারক দেখল অদ্ভুত বিপদ। এই প্রথম কোনো বাড়িতে এসে সে কাজ করছে কিন্তু সেটা চুরি নয়, সমাজসেবা। সে অনিচ্ছাসত্ত্বেও মশারিটা টাঙিয়ে দিল। মশারির ফুটো দিয়ে আবার মশা ঢুকছে দেখে সে নিজের পকেট থেকে একটা মশার কয়েল বের করে জ্বালিয়ে দিল।
রিয়াজ সাহেব তৃপ্তির শ্বাস ফেলে বললেন, "আপনি মানুষ হিসেবে খুব ভালো ভাই। নামটা কী আপনার?" মোবারক বিড়বিড় করে বলল, "মোবারক।" রিয়াজ সাহেব হাসলেন, "আহা! নামের সার্থকতা। আপনি আজ আমার রাতে মোবারকবাদ নিয়ে এসেছেন। ঘুমটা ভালোই হবে।"
মোবারক নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। কৃষ্ণনগরের আকাশে তখন শেষ রাতের চাঁদ উঠেছে। মোবারক বুঝল, বড় চোর হওয়া তার কপালে নেই। সে আসলে 'মুরগি মোবারক'ই রয়ে গেল, তবে আজ রাতে সে একটা মানুষকে নিশ্চিন্তে ঘুমানোর সুযোগ করে দিয়েছে। বড় চোর হওয়ার চেয়ে বড় মানুষ হওয়া কি খুব খারাপ?
শাবলটা ঝোপের আড়ালে ফেলে দিয়ে মোবারক নিজের বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল। কাল থেকে সে আর চুরি করবে না, দরকার হলে রিকশা চালাবে। অন্তত রিকশায় তো আর কাউকে মশারি টাঙিয়ে দিতে হবে না!



0 মন্তব্যসমূহ