বাবুর মিষ্টি হিসাব

আমাদের পাড়ায় এক ধরনের মানুষ আছে, যারা সকালবেলা উঠে বলে, “আজ কিছু একটা করা দরকার”… তারপর চা খেয়ে ভাবে, “আগামীকাল থেকে করব।”বাবু সেই দলের সভাপতি।



বাড়ির কোণায় মুদি দোকানের সামনে একটা লাল প্লাস্টিকের চেয়ার ছিল। চেয়ারের বয়স যত না, বাবুর বসার সময় তার চেয়ে বেশি। সকাল দশটা থেকে দুপুর দুইটা পর্যন্ত সে সেখানে বসে থাকত। হাতে চা, মুখে রাষ্ট্রনীতি।
কেউ জিজ্ঞেস করত, “বাবু, কাজকর্ম কিছু করিস না?”
বাবু ভ্রু কুঁচকে বলত, “আমি স্বাধীনচেতা মানুষ। কারো আন্ডারে চাকরি করব না।”

কথাটা সে এমন ভঙ্গিতে বলত যেন অন্তত জাতিসংঘ তাকে চাকরির প্রস্তাব দিয়েছিল, সে ফিরিয়ে দিয়েছে।

মজার ব্যাপার হলো, আড্ডা দিতে দিতে বাবুর মাথায় একদিন ব্যবসার বুদ্ধি এলো। গুড়ের ব্যবসা। কারণ সে শুনেছে, “মিষ্টি জিনিসের চাহিদা চিরকাল।”
সে ঘোষণা দিল, “আমি এখন উদ্যোক্তা।”
আমরা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। যে মানুষ দুপুর পর্যন্ত উঠতেই চায় না, সে উদ্যোক্তা!

প্রথম দিনই বাবু দশ মণ গুড় বাকিতে কিনে ফেলল।
দোকানদার জিজ্ঞেস করল, “টাকা কবে দেবেন?”
বাবু শান্ত গলায় বলল, “ব্যবসা মানে বিশ্বাস।”

এই ‘বিশ্বাস’ শব্দটা উচ্চারণ করার সময় তার মুখে এমন এক রহস্যময় হাসি ছিল, যেন সে নিজেই বুঝতে পারছে না কী বলছে।

শুরুর দিকে অবস্থা খারাপই ছিল। গুড় বিক্রি কম, বাকি বেশি।
গ্রাহকরা বলত, “মাস শেষে দেব।”
মাস শেষ হলে তারা বলত, “আরেক মাস পরে।”

বাবু সন্ধ্যায় এসে আবার সেই মুদি দোকানের চেয়ারে বসত। আমরা ভাবতাম, এবার বুঝি ব্যবসা গুটিয়ে ফেলবে।
কিন্তু সে বলত, “ধৈর্য ধরো। বড় কিছু হতে গেলে সময় লাগে।”



অলস মানুষের একটা বিশেষ গুণ আছে, তারা তাড়াহুড়ো করে না। কারণ তাদের করার তাড়া কম।

কিন্তু ধীরে ধীরে কেমন যেন বদল এল। বাবু সকালবেলা উঠে নিজেই গুদাম ঘুরে দেখে, হিসাব লিখে।
একদিন দেখি সে খাতা খুলে হিসাব করছে।
আমি বললাম, “এত সিরিয়াস কবে থেকে?”
সে মৃদু হেসে বলল, “বাকি দিলে মানুষকে খুঁজতে হয়। খুঁজতে গেলে হাঁটতে হয়। হাঁটতে গেলে ঘুম কমে যায়।”

দেখা গেল, সেই বাকি আদায় করতে করতেই সে এলাকার অর্ধেক মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক বানিয়ে ফেলেছে। কারো ছেলের বিয়ে, কারো নতুন দোকান, কারো ধানের ফলন—সব খবর তার জানা।
গুড়ের সাথে সাথে তার পরিচিতিও বেড়েছে।

দুই বছর পর আমরা অবাক হয়ে দেখলাম, বাবুর নিজস্ব গুদাম হয়েছে।
পাঁচ বছর পর তার দোতলা বিল্ডিং।
আর আজ সে তিনটা ট্রাকে গুড় পাঠায় জেলা শহরে।

মুদি দোকানের লাল চেয়াটা এখনো আছে। তবে সেখানে আর বাবু বসে না।
সন্ধ্যায় মাঝে মাঝে আসে, দাঁড়িয়ে চা খায়।
কেউ জিজ্ঞেস করলে হাসে, “আমি তো অলসই আছি। কাজগুলো নিজেরাই হয়ে যায়।”

বাবুর দিকে তাকালে আমার মনে হয়, মানুষকে চেনা বড় কঠিন। যে ছেলেটাকে আমরা আড্ডাবাজ ভাবতাম, সে আসলে সময় নিচ্ছিল।
হয়তো তার অলসতা ছিল প্রস্তুতির সময়।
হয়তো সে কারো আন্ডারে কাজ করতে চায়নি বলে নিজের জন্য একটা পথ বানিয়ে নিয়েছে।

শেষবার তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “তোর সিক্রেট কী?”
সে চা নেড়ে বলল, “মিষ্টি জিনিস বিক্রি করলে মুখের কথাও মিষ্টি রাখতে হয়। আর বাকি দিলে খাতায় নয়, মনে লিখে রাখো।”



তারপর হেসে উঠল।
হাসিটা খুব সাধারণ।
কিন্তু সেই হাসির ভেতরেই একটা ছোট শহরের বড় স্বপ্ন লুকিয়ে আছে।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

ঘুম গবেষক সুলেমান