পেট থেকে প্ল্যাটফর্ম

 কামালের আসল নাম কামাল উদ্দিন। কিন্তু পাড়ার মানুষ তাকে ওই নামে ডাকে না। তারা ডাকে “পেটটা কামাল”।নামটা শুনলে মনে হয় যেন পেটটাই আলাদা একটা নাগরিক, ভোটার আইডি আছে, নিজের মতামত আছে।

কামালের খাওয়ার প্রতি প্রেমটা একেবারে নিষ্ঠাবান প্রেমিকের মতো। বন্ধুর বিয়ে, গায়ে হলুদ, মিলাদ, আকিকা, অফিসের দাওয়াত,সুন্নতে খৎনা —সে কিছুই মিস করে না।তবে খিচুরি খুব একটা পছন্দ করেন না। 


ঘটনাটা ঘটেছিল আষাঢ় মাসের শুরুতে হঠাৎ বৃষ্টি আশ্রয় নিতে গিয়ে সোজা ঢুকে  পরলো বিয়ে বাড়িতে।বিয়েবাড়িটা বেশ সাজানো-গোছানো। কামাল ধীরপায়ে ভেতরে ঢুকে একদম মাঝখানের টেবিলে গিয়ে বসল। আশেপাশে সবাই ব্যস্ত, কেউ তাকে  চেনে না—আবার চেনে না যে, সেটা কেউ বুঝতেও পারছে না। ঠিক যখন গরম কাচ্চির প্লেটটা তাঁর  সামনে এল, তখনই কোত্থেকে এক চশমা পরা বয়স্ক ভদ্রলোক উদয় হলেন। ঝানু গোয়েন্দার মতো কামালের  দিকে তাকিয়ে বললেন, "খুব তো খাচ্ছেন, তা আপনি ঠিক কার লোক? বরপক্ষ নাকি কনেপক্ষ?"

সে  মুখে এক টুকরো খাসির মাংস নিয়ে চিবোতে চিবোতে খুব শান্ত গলায় বললা, "জনাব , আমি আসলে কোনো পক্ষেরই না। আমি হলাম 'খাবার পক্ষ'।"

ভদ্রলোক আকাশ থেকে পড়লেন। চোখ কপালে তুলে বললেন, "সেটা আবার কী পক্ষ?"

পেটটা কামাল   গ্লাসের পানি এক চুমুক খেয়ে হাসিমুখে বললাম, "দেখুন চাচা, রাজনীতিতে যেমন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার থাকে, বিয়েবাড়িতে আমি হলাম সেই নির্দলীয় মেহমান। বরপক্ষ আর কনেপক্ষের মধ্যে হাজারটা ঝগড়া থাকতে পারে, কিন্তু এই কাচ্চি বিরিয়ানির সাথে কারো কোনো শত্রুতা নেই। খাবার হলো সর্বজনীন। আমি জাস্ট সেই সার্বজনীনতার স্বাদ নিতে এসেছি।"

কামালের  যুক্তির গভীরতা মাপতে মাপতেই ভদ্রলোক ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন, আর কামাল  ততক্ষণে জর্দার বাটির দিকে হাত বাড়িয়েছে 

সবাই হাসে। কামালও হাসে। কিন্তু এই হাসির নিচে একটা চাপা কষ্ট আছে।

কামালের চাকরি নেই। চেষ্টা করেছে। দুই-একটা ইন্টারভিউও দিয়েছে। এক জায়গায় তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, “আপনার শক্তি কী?”



সে সোজা বলেছিল, “আমি এক বসায় পাঁচ প্লেট খেতে পারি।”

বোর্ডের একজন কাশি চেপে বলেছিল, “আমরা মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ নিচ্ছি, ফুড রিভিউয়ার না।”

বন্ধুরা আগের মতো আর ডাকে না। আগে ফোন দিত, “দোস্ত, বিয়ে আছে, চল।”

এখন বলে, “দোস্ত, একটু বাজেট টাইট।”

কামাল বুঝে যায়, বাজেট না, সে-ই টাইট।


একদিন সন্ধ্যায় পাড়ার মোড়ে বসে ছিল কামাল। পকেটে টাকা নেই। সামনে নতুন এক রেস্টুরেন্টের সাইনবোর্ড ঝলমল করছে। ভেতর থেকে ভাজা মুরগির গন্ধ এসে তার আত্মাকে নাড়া দিচ্ছে।

সে পকেট হাতড়ে দেখে একটা পুরোনো বাস টিকিট আর একটা লজেন্সের মোড়ক।

পেটটা হালকা শব্দ করল।

কামাল ধীরে বলে, “চুপ থাক, মানসম্মান বলে কিছু আছে।”


কামালের জীবনে সবচেয়ে বড় ঘটনা ঘটল এক বর্ষার বিকেলে।তার জীবনের সব বড় ঘটনার সাথে আজব ভাবে  বৃষ্টি এবং বর্ষার একটা সম্পর্ক থাকে। 

রেস্টুরেন্টে বসে সে যখন বলছিল, “এই কাবাবে দুঃখ আছে, তবে সাহসও আছে,” তখন পাশের এক কলেজপড়ুয়া ছেলে ভিডিও করে ফেলল। সেই ভিডিও ফেসবুকে দিল। ক্যাপশন লিখল, “পেটটা কামালের সৎ রিভিউ।”

ভিডিও ভাইরাল।

কামাল প্রথমে ভেবেছিল “ভাইরাল” মানে জ্বর-টর কিছু। পরে বুঝল, জ্বর না, বরং জোশ।

মালিক এসে বলল, “ভাই, আপনি তো সেলিব্রিটি।”

এরপর পাড়ার ছেলেরা তাকে বলল, “ভাই, ইউটিউব চ্যানেল খোলেন।”

চ্যানেলের নাম রাখা হলো, ‘পেটটা কামাল অফিসিয়াল’।

প্রথম ভিডিওতেই কামাল ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,

“আমি সত্য বলি। মিথ্যা বললে বদহজম হয়।”পেটের র ভিতর অনবরত গুডুর গুডুর শব্দ হয়।  

তার স্টাইল আলাদা।

কেউ বলে, “ভাই, রেটিং দেন।”

সে বলে, “পাঁচের মধ্যে চার। এক নম্বর কেটে দিলাম, কারণ ডিমটা আমাকে দেখে হাসেনি।”


মানুষ পাগলের মতো সাবস্ক্রাইব করতে লাগল।

তিন মাসের মধ্যে সাবস্ক্রাইবার দাঁড়াল সাড়ে তিন লাখ।

কামাল সংখ্যাটা দেখে চুপ করে বসে রইল।

সে আগে ভাবত, তিনশ টাকা থাকলেই সে রাজা। এখন তিন লাখ মানুষ তার কথা শুনছে।


লাইভে এসে সে একদিন বলল,

“বন্ধুরা, আগে আমি ফ্রি খেতে যেতাম। এখন দোকানদাররা আমাকে টাকা দেয় খাওয়ার জন্য। ।”


কেউ কমেন্টে লিখল, “ভাই, আপনি অনুপ্রেরণা।”

কামাল পড়ে একটু চুপ হয়ে গেল।

তার মনে পড়ল সেই দিনগুলোর কথা, যখন দাওয়াতের কার্ড পেত না। যখন পকেটে টাকা না থাকায় দূরে দাঁড়িয়ে গন্ধ নিত।


এখন সে গাড়ি চড়ে রিভিউ দিতে যায়।

তবে বদলায়নি একটা জিনিস।

খাবার খাওয়ার আগে সে এক সেকেন্ড চোখ বন্ধ করে। যেন মনে মনে বলে, “আজও যেন সত্যি বলতে পারি।”

একদিন এক বড় রেস্টুরেন্টের মালিক তাকে আলাদা করে বলল,

“ভাই, একটু ভালো বলবেন। আমরা স্পনসর করব।”

কামাল হেসে বলল,

“আমি ভালো বলব, যদি ভালো লাগে। না হলে আমার পেট মেনে নেবে না।”

এই সোজা কথাটাই মানুষকে আরও টানল।

তার ভিডিওতে এখন শুধু খাবার না, গল্পও থাকে।

সে বলে, “জীবনে লবণ কম হলে মানুষ টের পায়। কিন্তু সম্মান কম হলে কেউ টের পায় না। তাই দুটোই ঠিক রাখেন।”

মাঝে মাঝে লাইভে এসে সে পুরোনো দিনের কথা তোলে।

“বন্ধুরা, আমি এক সময় ভাবতাম, আমার পেটটাই সমস্যা। পরে বুঝলাম, সমস্যা ছিল আমি নিজেকে নিয়ে লজ্জা পাচ্ছিলাম। যেদিন লজ্জা বাদ দিয়ে কাজ শুরু করলাম, সেদিন থেকেই বদল।”



মা একদিন টিভির সামনে বসে তার ভিডিও দেখছিলেন।

কামাল স্ক্রিনে বলছে,

“এই বিরিয়ানির মধ্যে পরিশ্রম আছে।”

মা মৃদু হেসে বললেন, “আমার ছেলের মধ্যেও আছে।”

সাড়ে তিন লাখ সাবস্ক্রাইবার।

কিন্তু কামালের কাছে সবচেয়ে দামি জিনিসটা এখনও সততা দেবং সরলতা। 

কারণ সেদিনই সে বুঝেছিল, ক্ষুধা লজ্জা না।

ক্ষুধা একটা শক্তি।

শুধু তাকে সঠিক দিকে চালাতে জানতে হয়।


আর পেটটা?

সে এখন ক্যামেরা-ফ্রেন্ডলি।

মাঝে মাঝে ফ্রেমের বাইরে চলে যায়।

কিন্তু গল্পের বাইরে যায় না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

ঘুম গবেষক সুলেমান