সমাদ সাহেব নিজেকে “স্বল্পভাষী ও গভীর চিন্তাশীল” মানুষ বলেন। আমরা বলি, উনি আসলে “স্বল্পভাষী নন, স্বল্পবিরতিহীন।” মানে, কথা শুরু করলে মাঝখানে দাঁড়ি-কমা কিছু থাকে না। উনার দাবি, পাড়া থেকে জাতিসংঘ—সবখানেই উনার নিগূঢ় লোক সেট করা আছে। আমরা মাঝে মাঝে সন্দেহ করি, উনি হয়তো জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেলেরও দুলাভাই।
পাড়ার চিপগলির মোল্লা সাহেব থেকে শুরু করে মুদি দোকানের বাবুল—সবাইকে উনি নাম ধরে ডাকেন। “বাবুল, কালকে যে চালটা দিলে, ওই চাল কিন্তু সোজা ব্রাজিল থেকে এসেছে।”
বাবুল হা করে তাকায়। ব্রাজিল মানে ওর কাছে নেইমার। চাল কিভাবে ব্রাজিল থেকে আসে, সেটা আর জিজ্ঞেস করে না।
সমাদ সাহেবের বিশেষ প্রতিভা হলো লাইনের আগা। আপনি ব্যাংকে যান, দেখবেন উনি আগেই বসে আছেন। আপনি হাসপাতালে যান, উনি ডাক্তারের রুম থেকে বের হচ্ছেন। একদিন তো দেখলাম, কোরবানির গরুর লাইনে দাঁড়ানো মানুষজনের আগেও উনি দাঁড়িয়ে আছেন। আমি বললাম, “আপনি তো গরু কিনবেন না?”
উনি গম্ভীর মুখে বললেন, “আমি কিনব না, কিন্তু গরুর মালিকেরা আমার সঙ্গে কথা বলবে। দেশের অর্থনীতি বুঝতে হলে মাঠে থাকতে হয়।”
পাড়ায় সবাই উনাকে একটু মজার মতো অপছন্দ করে। কিন্তু কেউ কিছু বলে না। কারণ উনি খুব রহস্যময় ভঙ্গিতে বলেন, “দেখো, আমি কিন্তু চুপচাপ মানুষ। আমার কথা বেশি বলা উচিত না।”
এই বলে উনি আরও পঁচিশ মিনিট কথা বলেন।
একদিন পাড়ায় খবর এল—ড্রেনের ঢাকনা চুরি গেছে। সবাই মিলে আলোচনা করছি। সমাদ সাহেব গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, “এই চুরি সাধারণ চুরি না। এর পেছনে আন্তর্জাতিক চক্র আছে।”
আমরা থ। ড্রেনের ঢাকনা আর আন্তর্জাতিক চক্র—কেমন করে যুক্ত হলো?
উনি বললেন, “তোমরা বুঝবে না। জাতিসংঘে আমার এক লোক আছে। ও বলেছে, দক্ষিণ এশিয়ায় এখন ড্রেনের ঢাকনার ওপর চাপ বাড়ছে।”মানুষের মনোযোগ ড্রেনের দিকে সরিয়ে বর ধরনের কিছু একটা করার চেষ্টা।
তারপর উনি এমনভাবে মাথা নেড়ে দিলেন, যেন পৃথিবীর মানচিত্রটা উনার পকেটে ভাঁজ করে রাখা।
সমস্যা হলো, উনি অলসও বটে। কাজের সময় উনাকে পাওয়া যায় না। কিন্তু লাইনের আগায় কিভাবে যেন পৌঁছে যান। একদিন বাজারে তেল কম এসেছে। লম্বা লাইন। আমরা ঘেমে-নেয়ে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ দেখি সমাদ সাহেব তেলের বোতল হাতে হেঁটে যাচ্ছেন।
আমি বললাম, “আপনি কিভাবে?”
উনি হেসে বললেন, “কানেকশন।”
আমি মনে মনে ভাবলাম, তেলেরও নাকি কানেকশন লাগে!
তবে উনার একটা ভালো দিক আছে। পাড়ায় কারও মন খারাপ হলে উনি পাশে বসেন। খুব গম্ভীর গলায় বলেন, “দেখো, জীবনটা হচ্ছে দাবার খেলা।”
তারপর নিজের জীবনের এমন সব গল্প বলেন, যেগুলোতে উনি একাই সব চাল চালেন, আর সবাই মুগ্ধ দর্শক। শুনতে শুনতে মানুষ একটু হেসে ফেলে। মনও হালকা হয়।
একবার স্কুলে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। সমাদ সাহেব বিচারক হতে চাইলেন। বললেন, “আমি আন্তর্জাতিক মানের বিচারক।”
আমরা ভয় পেলাম। যদি সত্যি উনার কোনো লোক থাকে!
শেষমেশ উনাকে দড়ি টানাটানির রেফারি বানানো হলো। খেলা শুরু। দুই দল টানছে। হঠাৎ উনি বাঁশি বাজিয়ে বললেন, “স্টপ! এই দড়ি আন্তর্জাতিক মানের না।”
সবাই হেসে গড়াগড়ি।
কিন্তু সেই হাসির মাঝেও একটা অদ্ভুত স্নেহ থাকে। কারণ আমরা জানি, সমাদ সাহেব আসলে ক্ষতিকর না। উনি নিজের ভেতরে একটা বড় পৃথিবী বানিয়ে রেখেছেন। সেখানে উনি গুরুত্বপূর্ণ, দরকারি, প্রভাবশালী। হয়তো বাস্তবে তেমন না, কিন্তু কল্পনায় তিনি রাষ্ট্রদূত।
এক সন্ধ্যায় আমি উনাকে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনার এত লোক কিভাবে?”
উনি একটু চুপ করে থাকলেন। তারপর আস্তে বললেন, “মানুষের ভিড়ে দাঁড়ালে কেউ মনে রাখে না। তাই ভাবি, আমার কিছু লোক আছে। তাহলে নিজেকে একটু বড় লাগে।”
সেদিন উনাকে খুব সাধারণ লাগছিল। জাতিসংঘের কানেকশন নেই, আন্তর্জাতিক চক্র নেই—শুধু একা এক মানুষ।
আমি হেসে বললাম, “আপনার লোক না থাকলেও আমরা তো আছি।”
উনি মুখ ফিরিয়ে বললেন, “আমি জানি। তাই তো বলি, আমার লোক আছে।”
তারপর থেকে আমরা যখনই উনাকে লাইনের আগায় দেখি, একটু জায়গা ছেড়ে দিই। কারণ কিছু মানুষ আছে, যারা সামনে দাঁড়াতে ভালোবাসে। আর কিছু মানুষ আছে, যারা সামনে দাঁড়ানো মানুষটাকে নিয়ে গল্প বানাতে ভালোবাসে।
সমাদ সাহেব দুই দিকেই পারদর্শী। আর আমাদের পাড়া, উনাকে ছাড়া, একটু ফাঁকা ফাঁকা লাগে।


0 মন্তব্যসমূহ