শীতটা সেদিন কেমন জানি বেশি ছিল। কনকনে। কাঁপুনি ধরানো। কিন্তু তার চেয়েও বেশি কাঁপছিল রাহাতের বুকটা।
গাড়িতে নাকি একটুও জায়গা ছিল না।
বরের গাড়ি ভর্তি মানুষ, আত্মীয়, ফিতা বাঁধা ফুল, হইচই, ক্যামেরা।
কিন্তু ভাইয়ের হৃদয়ে বোনের জন্য জায়গা ছিল ভরপুর।
রাহাত তখন ক্লাস ফাইভে পড়ে। তার বোন রিমি, একেবারে মায়ের দ্বিতীয় সংস্করণ। মা যখন বাজারে যেতেন, রিমিই রান্না ঘরে দাঁড়িয়ে ডাল নাড়ত, ভাত চাপাত। নিজের থালার মাছের টুকরোটা চুপচাপ রাহাতের থালায় সরিয়ে দিত। রাহাত যদি জিজ্ঞেস করত, “তুই খাবি না?”
রিমি হেসে বলত, “আমি তো আগেই খেয়ে ফেলেছি।”
সে ‘আগে’ কখন, কেউ জানত না।
রাহাত যদি পাড়ার কারও সাথে মারামারি করে আসত, বাড়িতে বিচার বসত।
বাবা গম্ভীর গলায় ডাকতেন, “রাহাত!”
তার আগেই রিমি এসে বলত, “বাবা, ওকে মারবেন না। দোষ আমারও ছিল।”
বাবা অবাক হতেন। দোষটা কী, কেউ জানত না।
কিন্তু মারটা যেত রিমির পিঠে।
সেই মায়াবতি বোনের আজ বিয়ে। সকাল থেকে মনে হচ্ছে, বাড়ির ঘড়িটাও যেন একটু ধীরে চলছে, যেন সময়ও এই ঘটনাটাকে একটু টেনে লম্বা করতে চায়। মেয়েটা বিয়ের সাজে হাসছে, কিন্তু হাসিটা ঠিক দোকানের ঝকঝকে কাচের মতো, ভেতরের সব কিছু দেখায় না।
বিয়ের দিন, রিমি লাল শাড়িতে বসে আছে, মুখে চাপা কান্না।
রাহাত ভিড় ঠেলে কাছে এসে বলল, “তুই যাবি নাকি সত্যি?”
রিমি চোখ মুছে হেসে বলল, “বিয়ে মানে যেতেই হয় রে বোকা।”
গাড়ি ছাড়ার সময় রাহাত দৌড়ে গিয়ে উঠতে চেয়েছিল।
কেউ একজন বলল, “জায়গা নেই, নামাও নামাও!”
রাহাত নামল ঠিকই, কিন্তু থামল না।
পুরনো নীল সাইকেলটা নিয়ে সে গাড়ির পেছনে পেছনে চলল।
বাষট্টি কিলোমিটার।
রাস্তা ফাঁকা, ঠান্ডা বাতাস ছুরি হয়ে গালে লাগছে। হাত জমে কাঠ।
তবু সে প্যাডেল থামাল না।
মাঝে মাঝে গাড়িটা দূরে সরে যেত। রাহাত মনে করত, বোনটা বুঝি দূরে সরে যাচ্ছে।
তারপর আবার গাড়ির লাল টেললাইট দেখা যেত।
মনে হতো, না, এখনো আছে।
রিমির নতুন বাড়ির সামনে যখন সে পৌঁছাল, তখন রাত। সবাই অবাক।
“এই ছেলে এখানে কীভাবে?”
রাহাত হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “আপুর পাশে থাকব।”
রিমি সিঁড়ি থেকে নেমে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল।
দুজনেই কাঁদল।
সেদিন কাঁদাটা ছিল একসাথে শেষ কাঁদা।
তারপর সময় কেমন যেন বদলে গেল।
রাহাত বড় হলো, কলেজে উঠল, চাকরি পেল।
রিমি ফোন করত, “খেয়েছিস?”
রাহাত বলত, “আরে দিদি, এত ফোন দিস না, ব্যস্ত আছি।”
একদিন রিমি শহরে এলো।
রাহাতের বাসায় যেতে চাইল।
রাহাত একটু অস্বস্তি নিয়ে বলল, “আজ না বোন , বাসায় গেস্ট আছে।”
সেদিন রাতে রিমি একা বাসস্ট্যান্ডে বসে ছিল।
ঠান্ডা ছিল না, কিন্তু তার হাত দুটো কেমন ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল।
সময় মানুষকে বড় করে, কখনও কখনও দূরও করে।
রাহাত বুঝতেই পারেনি, যে মেয়েটা নিজের না খেয়ে তাকে খাইয়েছে, নিজের পিঠ পেতে তাকে বাঁচিয়েছে, তার কাঁদায় কেঁদেছে, সেই মেয়েটা ধীরে ধীরে একা হয়ে যাচ্ছে।
একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে হঠাৎ তার চোখে পড়ল একটা সাইকেল।
পুরনো, নীল রঙের।
মনে পড়ে গেল সেই রাত।
বাষট্টি কিলোমিটার।
কনকনে ঠান্ডা।
আর বোনের জন্য ভরা একটা হৃদয়।
সে হঠাৎ ফোন বের করে নম্বর ডায়াল করল।
ওপাশে রিমির গলা, আগের মতোই নরম, “হ্যালো রে?”
রাহাত একটু চুপ করে থেকে বলল, “আপু , খেয়েছিস?”
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর হালকা হাসি।
“খেয়েছি রে। তুই?”
রাহাত জানে, এই ‘খেয়েছি’ শব্দটার ভেতরে অনেক না-খাওয়া লুকিয়ে থাকতে পারে।আমি তোর জন্য গাড়ি পঠাচ্ছি চলে আশিস, তোর জন্য বাজার থেকে দেশি আড়িয়াল বিলের কৈ মাছ এনেছি,ভাই বোন একসাথে খাব।
ভালোবাসা কখনও হারায় না।
কেবল আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়ি।
দূরত্ব বড় হতে পারে, কিন্তু মনে যদি জায়গা থাকে, তাহলে বাষট্টি কিলোমিটারও খুব বেশি না।
কারণ বোনের জন্য ভাইয়ের হৃদয়ে এখনো জায়গা ভরপুর আছে।



0 মন্তব্যসমূহ