কারেন্ট গেলেই আসল নাটক

 রাত আটটা। ঠিক তখনই বিদ্যুৎ গেল।



এই “ঠিক তখনই” ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত। যখনই খুব দরকার, তখনই বিদ্যুৎ থাকে না। মনে হয় বিদ্যুৎও মানুষের মতো—যেখানে তাকে সবচেয়ে বেশি দরকার, সেখানেই সে অভিমান করে বসে থাকে।

আমাদের বাসার নাম “শান্তি নীড়”। নাম শুনে মনে হতে পারে এখানে সারাক্ষণ শান্তি বিরাজ করে। বাস্তবে অবস্থা একটু উল্টো। এখানে শান্তির চেয়ে শব্দই বেশি—কারও টিভি চলছে, কারও প্রেসার কুকার সিটি দিচ্ছে, কারও আবার ফোনে ঝগড়া চলছে।

যাই হোক, বিদ্যুৎ যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো বিল্ডিং যেন হঠাৎ করে এক অদ্ভুত চুপচাপ অন্ধকারে ঢুকে গেল। পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে সবার মুখ থেকে একই ডায়ালগ বের হলো—
“আবার কারেন্ট গেল!”

আমি বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। অন্ধকারে আশেপাশের বাসাগুলোর জানালায় মোবাইলের আলো জ্বলতে শুরু করেছে। মনে হচ্ছে শহরের ভেতরে ছোট ছোট জোনাকি পোকা জন্ম নিয়েছে।

আমার পাশের ফ্ল্যাটে থাকে রফিক সাহেব। পেশায় ব্যাংকার, কিন্তু মনের দিক থেকে তিনি একজন দার্শনিক। বিদ্যুৎ গেলেই তিনি জীবনের গভীর কথা বলতে শুরু করেন।

তিনি চিৎকার করে বললেন,
“দেখছেন? জীবনটা আসলে এই বিদ্যুতের মতো। কখন যাবে, কেউ জানে না!”

তার স্ত্রী ভেতর থেকে বললেন,
“এইসব দর্শন বাদ দিয়ে আগে মশার কয়েলটা খুঁজেন!”

জীবনের সব বড় দর্শন শেষমেশ গিয়ে মশার কয়েলের কাছে হার মেনে যায়—এটা আমি বহুবার দেখেছি।

নিচে গলির দিকে তাকিয়ে দেখি, বাচ্চারা খুশিতে লাফাচ্ছে। তাদের কাছে বিদ্যুৎ না থাকা একটা উৎসব। তারা চিৎকার করে খেলছে—লুকোচুরি, ভূতের খেলা, আর কী কী যেন।

একটা ছেলে বলল,
“আজকে তো মোবাইল চার্জ নাই, তাই খেলতেই হবে!”

আমি মনে মনে ভাবলাম—এই ছেলেটা বড় হয়ে একদিন বুঝবে, জীবনের অনেক সিদ্ধান্তই এমন—চার্জ না থাকলে খেলতেই হয়।

আমাদের বাসায় মা তখন মোমবাতি খুঁজছেন। মা সবসময় একটা নির্দিষ্ট জায়গায় মোমবাতি রাখেন, কিন্তু বিদ্যুৎ গেলে সেই জায়গাটা আর খুঁজে পান না।
তিনি বললেন,
“এই ঘরে রাখছিলাম, কেউ সরাইছে!”

আমি জানি, “কেউ” আসলে কেউ না। “কেউ” হচ্ছে সময়, যা সব জিনিসকে একটু একটু করে সরিয়ে দেয়।

অবশেষে একটা মোমবাতি পাওয়া গেল। সেটা জ্বালানোর পর ঘরটা হালকা হলুদ আলোয় ভরে উঠল। এই আলোতে মানুষের মুখগুলো একটু অন্যরকম লাগে—কিছুটা নরম, কিছুটা সত্যি।

মা হঠাৎ বললেন,
“এই আলোতে তোকে ছোটবেলার মতো লাগতেছে।”

আমি একটু হেসে বললাম,
“আমি তো একই আছি।”

মা মাথা নেড়ে বললেন,
“না, মানুষ কখনো একই থাকে না। শুধু অন্ধকারে সেটা একটু কম বোঝা যায়।”

মায়েদের কথাগুলো সবসময় সহজ হয়, কিন্তু ভেতরে খুব গভীর কিছু লুকিয়ে থাকে।

হঠাৎ পাশের বাসা থেকে চিৎকার শোনা গেল—
“ইনভার্টার কাজ করছে না!”

বাংলাদেশে ইনভার্টার একটা বিশেষ চরিত্র। বিদ্যুৎ থাকলে কেউ তার খোঁজ নেয় না, কিন্তু বিদ্যুৎ গেলে সে হঠাৎ করে পরিবারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে যায়।

রফিক সাহেব আবার শুরু করলেন,
“দেখলেন? যার ওপর ভরসা করেন, সেই সময়ে কাজ করে না!”

তার স্ত্রী আবারও বললেন,
“আপনি আগে পাখা দিয়ে বাতাস দেন!”

আমি মনে মনে ভাবলাম—জীবনের সব বড় দুঃখের সমাধান শেষে গিয়ে দাঁড়ায়—“পাখা দিয়ে বাতাস দেন”।

নিচে একটা চায়ের দোকান আছে। বিদ্যুৎ গেলেই সেখানে আড্ডা জমে ওঠে। আজও ব্যতিক্রম না। আমি নিচে নেমে গেলাম।

চায়ের দোকানের মালিক কুদ্দুস ভাই বললেন,
“এই যে, বিদ্যুৎ গেলে ব্যবসা বাড়ে!”

আমি বললাম,
“কেন?”

তিনি হেসে বললেন,
“মানুষ তখন কথা বলে। আর কথা বললে চা লাগে।”

এই কথাটা শুনে মনে হলো—বিদ্যুৎ আসলে আমাদের চুপ করিয়ে রাখে, আর অন্ধকার আমাদের কথা বলতে শেখায়।

এক কোণে বসে আছে সেলিম। সে সারাদিন মোবাইলে গেম খেলে। আজকে তার মুখে একটু অস্বস্তি।

আমি জিজ্ঞেস করলাম,
“কি রে, গেম খেলছিস না?”

সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“চার্জ শেষ।”

আমি বললাম,
“তাহলে মানুষের সাথে কথা বল।”

সে একটু ভেবে বলল,
“ওটা তো আপডেটেড না!”

আমি হেসে ফেললাম। সত্যিই, এখন মানুষের সাথে কথা বলা যেন পুরোনো ভার্সনের একটা অ্যাপ।

হঠাৎ হালকা বাতাস বইতে শুরু করল। অন্ধকারে সেই বাতাসের স্পর্শটা আলাদা লাগে। মনে হয় কেউ খুব আস্তে করে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।

কুদ্দুস ভাই বললেন,
“এই বাতাসটা বিদ্যুৎ থাকলে টেরই পেতাম না।”

আমি মাথা নেড়ে বললাম,
“হুম, অনেক কিছুই আমরা তখন বুঝি, যখন সেটা থাকে না।”

এই সময়ে হঠাৎ করে পুরো এলাকা আলোয় ভরে উঠল।

বিদ্যুৎ চলে এসেছে।

সবাই একসাথে বলল,
“আসছে!”

একটা অদ্ভুত আনন্দ। যেন কেউ দূর থেকে ফিরে এসেছে।

কিন্তু মজার ব্যাপার হলো—যেই বিদ্যুৎ এলো, সবাই আবার নিজের নিজের জগতে ঢুকে গেল। কেউ টিভি চালালো, কেউ মোবাইল, কেউ আবার ফ্যানের নিচে গিয়ে বসে পড়ল।

আমি আবার বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম।

অন্ধকারটা চলে গেছে, কিন্তু মনে হলো—কিছু একটা যেন হারিয়ে গেল।

এই কয়েকটা মিনিটে মানুষ মানুষকে একটু বেশি দেখেছিল, একটু বেশি শুনেছিল, একটু বেশি বুঝেছিল। এখন আবার সবাই ব্যস্ত—নিজের নিজের আলোতে।

রফিক সাহেব শেষবারের মতো বললেন,
“জীবনটা আসলে খুব ছোট।”

তার স্ত্রী এবার কিছু বললেন না। হয়তো তিনিও বুঝেছেন—এই কথাটার উত্তর নেই।

আমি আকাশের দিকে তাকালাম। সেখানে কোনো বিদ্যুৎ যায় না, আসে না। তবুও তারা জ্বলে।

হয়তো মানুষও এমন হতে পারত—ভেতর থেকে জ্বলতে পারত, বাইরের বিদ্যুতের ওপর এত নির্ভর না করে।

কিন্তু আমরা মানুষ। আমরা বিদ্যুৎ গেলে মোমবাতি খুঁজি, আর আলো এলে একে অপরকে ভুলে যাই।

হঠাৎ মনে হলো—বিদ্যুৎ না থাকা আসলে একটা ছোট্ট সুযোগ। একটু থামার, একটু দেখার, একটু অনুভব করার।

আর সবচেয়ে বড় কথা—নিজের ভেতরের অন্ধকারটা বুঝার।

কারণ বাইরে অন্ধকার হলে মানুষ ভয় পায়,
কিন্তু ভেতরের অন্ধকারটা—সেটা আমরা লুকিয়ে রাখি।

হয়তো কোনো একদিন, বিদ্যুৎ না থাকলে আমরা শুধু মোমবাতি না, নিজেদের ভেতরেও একটু আলো জ্বালাতে শিখব।

তার আগে পর্যন্ত—
“আবার কারেন্ট গেল!”
এই ডায়ালগটাই আমাদের জীবনের সবচেয়ে বাস্তব কবিতা হয়ে থাকবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

ঘুম গবেষক সুলেমান