সোহেল আজকে সকালে উঠেই বুঝে গেল—দিনটা অন্যরকম।
কারণটা খুব বড় কিছু না। তার পুরনো অ্যালার্ম ঘড়িটা আজকে বেজে ওঠেনি। অথচ সে ঠিক সময়েই ঘুম থেকে উঠে গেছে। সাধারণত এমন হলে মানুষ খুশি হয়। কিন্তু সোহেল একটু চিন্তিত হয়ে গেল। সে বিশ্বাস করে—জীবনে কোনো কিছু অস্বাভাবিকভাবে ঠিকঠাক হলে, পরে কোথাও একটা গোলমাল হবেই।
তার মা রান্নাঘর থেকে ডাক দিলেন,
—“ওই সোহেল, আজকে কিন্তু ডিম ভাজি করছি, নাস্তা করে যাস।”
সোহেল অবাক।
এই বাসায় ডিম ভাজি মানে উৎসব। সাধারণত ডাল-ভাত বা আলু ভর্তা।
সে চুপচাপ বসে ডিম ভাজি খেতে লাগল। মনে মনে ভাবল—
“আজকে কিছু একটা হবেই।”
সোহেল ঢাকার এক ছোট অফিসে কাজ করে। পদবি বড় কিছু না—“Assistant Manager ”, কিন্তু কাজের চাপ দেখে মনে হয় পুরো কোম্পানি তার একার কাঁধে।
বাসায় থেকে বের হয়ে সে বাসে উঠল। আজ আশ্চর্যজনকভাবে বাসে সিটও পেল। পাশে বসা লোকটা তাকে দেখে হাসলোও।
সোহেল মনে মনে বলল,
“আজকে যদি প্রেমও হয়ে যায়, তাও অবাক হবো না।”
লোকটা একটু পর বলল,
—“ভাই, এইটা কি উত্তরা যাবে?”
সোহেল বলল,
—“না, এইটা তো মোহাম্মদপুর।”
লোকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—“জীবনটাই ভুল বাসে উঠে আছি ভাই।”
সোহেল একটু হেসে ফেলল। মনে হল—লোকটা শুধু বাস না, জীবন নিয়েই কথা বলছে।
অফিসে গিয়ে আরেকটা চমক।
বস আজকে তাকে ডেকে বললেন,
—“সোহেল, তোমার কাজ দেখে আমি খুশি।”
এই কথাটা সোহেল জীবনে প্রথম শুনল।
তার মনে হল—
“এটা কি সত্যি? না কি আমি স্বপ্ন দেখছি?”
বস আবার বললেন,
—“তোমাকে একটা নতুন প্রজেক্ট দিচ্ছি। ভালো করলে প্রমোশন।”
সোহেলের মাথা একটু ঘুরে গেল। সে বুঝতে পারছিল না—এইসব ভালো ঘটনা একদিনে কেন হচ্ছে।
লাঞ্চ ব্রেকে সে তার সহকর্মী রাফির সাথে বসে খাচ্ছিল।
রাফি বলল,
—“তোর মুখ দেখে মনে হচ্ছে লটারিতে জিতছিস।”
সোহেল একটু থেমে বলল,
—“জানি না ভাই, সবকিছু আজকে খুব ঠিকঠাক লাগছে। ভয় লাগছে।”
রাফি হেসে বলল,
—“জীবনে যখন কিছু ভালো হয়, তখন ভয় পাওয়া উচিত না। তখন চুপচাপ উপভোগ করা উচিত।”
সোহেল বলল,
—“আমার তো মনে হয়, আল্লাহ আগে একটু সুখ দেখায়, পরে টেস্ট নেয়।”
রাফি বলল,
—“তোর সমস্যা কী জানিস? তুই সুখকে বিশ্বাস করিস না।”
এই কথাটা সোহেলের মনে গেঁথে গেল।
অফিস শেষে সে বাসায় ফিরছিল। রাস্তায় একটা ছোট্ট ঘটনা ঘটল।
একটা বাচ্চা ছেলে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল। হাতে একটা বেলুন, কিন্তু বেলুনটা ফেটে গেছে।
সোহেল কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—“কাঁদছো কেন?”
ছেলেটা বলল,
—“আমার বেলুনটা ফেটে গেছে।”
এত ছোট একটা কারণে কেউ এত কাঁদতে পারে—এই দৃশ্য দেখে সোহেলের মনে একটু নরম কিছু হলো।
সে পাশের দোকান থেকে একটা নতুন বেলুন কিনে দিল।
ছেলেটা হেসে ফেলল।
এই হাসিটা খুব ছোট, কিন্তু অদ্ভুতভাবে গভীর।
সোহেল হঠাৎ বুঝল—
আজকের দিনের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য এইটাও হতে পারে।
বাসায় ফিরে সে দেখল—তার মা খুব খুশি।
—“শোন, তোর মামা ফোন দিছে। তোকে নাকি একটা জায়গায় চাকরির কথা বলবে।”
সোহেল অবাক।
—“আরেকটা?”
মা বললেন,
—“হ, ভালো জায়গা নাকি।”
সোহেল চুপ করে বসে রইল।
তার মনে হল—
আজকে যেন সৌভাগ্য একটু বেশি উদার হয়ে গেছে।
রাতে ছাদে উঠে সে একা বসে থাকল।
ঢাকার আকাশে খুব বেশি তারা দেখা যায় না, তবুও সে তাকিয়ে থাকল।
তার মনে হচ্ছিল—
“সৌভাগ্য আসলে কী?”
হঠাৎ পাওয়া একটা ভালো খবর?
না কি একটা ছোট্ট হাসি?
না কি এমন একটা দিন, যেদিন কিছুই খারাপ হয় না?
তার পাশেই একজন বৃদ্ধ এসে বসলেন। এই লোকটাকে সে আগে দেখেছে, কিন্তু কখনো কথা হয়নি।
বৃদ্ধ বললেন,
—“কি ভাবছো?”
সোহেল একটু হেসে বলল,
—“আজকে দিনটা খুব ভালো গেছে। তাই ভাবছি, কেন এমন হলো।”
বৃদ্ধ বললেন,
—“তুমি কি মনে করো, ভালো দিন হঠাৎ আসে?”
সোহেল বলল,
—“না জানি… কিন্তু আজকে তো তাই লাগছে।”
বৃদ্ধ একটু হেসে বললেন,
—“সৌভাগ্য হঠাৎ আসে না। এটা আস্তে আস্তে জমে। ঠিক ব্যাংকে টাকার মতো।”
সোহেল অবাক হয়ে তাকাল।
—“মানে?”
—“তুমি যখন কাউকে সাহায্য করো, কাউকে হাসাও, নিজের কাজ ঠিকমতো করো—সবকিছু জমতে থাকে। একদিন হঠাৎ মনে হয়—আজকে সব ভালো হচ্ছে। আসলে সেটা হঠাৎ না।”
সোহেল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তার মনে পড়ল—
সেই বাচ্চাটার হাসি,
অফিসের পরিশ্রম,
মায়ের জন্য ছোট ছোট দায়িত্ব পালন।
সব মিলিয়ে আজকের দিনটা তৈরি হয়েছে।
বৃদ্ধ উঠে যাওয়ার আগে বললেন,
—“একটা কথা মনে রেখো—সৌভাগ্য কখনো দরজায় নক করে না। এটা চুপচাপ ঢুকে পড়ে।”
সোহেল ছাদে একা বসে থাকল।
তার মনে আর কোনো ভয় নেই।
সে বুঝে গেছে—
আজকের ভালো দিনটা কোনো অলৌকিক কিছু না।
এটা তার নিজেরই তৈরি করা।
পরদিন সকালে আবার অ্যালার্ম বেজে উঠল।
বাসে সিট পেল না।
অফিসে বস একটু বকা দিলেন।
সবকিছু আবার আগের মতো।
কিন্তু একটা জিনিস বদলে গেছে।
সোহেল এখন আর ভাবে না—
“ভালো কিছু হলে খারাপ আসবেই।”
বরং সে মনে মনে হাসে—
“আজকে হয়তো জমা হচ্ছে… কালকে আবার ভালো দিন আসবে।”
জীবনটা আসলে এমনই।
আমরা ভাবি—সৌভাগ্য হঠাৎ আসে।
কিন্তু সত্যি হলো—
সৌভাগ্য প্রতিদিন একটু একটু করে তৈরি হয়।
কখনো একটা ডিম ভাজি দিয়ে,
কখনো একটা বাসের সিট দিয়ে,
কখনো একটা অচেনা শিশুর হাসি দিয়ে।
আর সবচেয়ে বড় কথা—
আমরা যখন বুঝে যাই,
তখনই আমরা সত্যিকারের ভাগ্যবান হয়ে যাই।

0 মন্তব্যসমূহ