রাত সাড়ে বারোটা। মশারির ভেতরে শুয়ে আছে রাশেদ। মশারির বাইরে একটা মশা দাঁড়িয়ে আছে—মনে হচ্ছে সে ঢোকার ভিসা পাচ্ছে না বলে রাগ করে তাকিয়ে আছে। রাশেদের হাতে মোবাইল। ইউটিউব খোলা। ভিডিওর টাইটেল—
“Earn $1000 per day without investment | 100% real 😱”
রাশেদ হালকা করে হেসে বলল,
“আজকে দেখি, কাল থেকে আমিও শুরু করব…”
এই ‘কাল থেকে’ কথাটা রাশেদের জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই কাল আর আসে না, কিন্তু কথা সবসময় থাকে।
রাশেদের মা পাশের ঘর থেকে বললেন,
“ঘুমাবি না? সারাদিন ফোন, রাতেও ফোন!”
রাশেদ উত্তর দিল না। কারণ এই মুহূর্তে সে একটা গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় ব্যস্ত—কিভাবে কিছু না করেও টাকা আয় করা যায়।
ভিডিওতে এক ভাই বলছে,
“বন্ধুরা, আমি মাত্র ১৫ দিনে ৫০০০ ডলার ইনকাম করেছি…”
রাশেদ একটু থেমে নিজের দিকে তাকাল।
তার পকেটে এখন ৫০ টাকা। তাও বিকালের ফুচকা খাওয়ার পর বেঁচে গেছে।
সে আবার ভিডিওতে মন দিল।
সকাল আটটা।
রাশেদ ঘুম থেকে উঠেছে। চোখ লাল। কারণ সে রাত তিনটা পর্যন্ত earning ভিডিও দেখে গেছে।
মা চা দিয়ে বললেন,
“তুই কি রাতে কাজ করিস নাকি?”
রাশেদ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে খুব সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল,
“আমি এখন online sector এ আছি।”
মা কিছু বুঝলেন না। তবে মাথা নেড়ে বললেন,
“ভাত খা, sector পরে দেখিস।”
রাশেদের বন্ধু সুমন একটা চাকরি করে। মাস শেষে ১৫ হাজার টাকা পায়।
সুমন একদিন বলল,
“তুই এত ভিডিও দেখিস, কিছু শুরু করিস না কেন?”
রাশেদ গম্ভীর হয়ে বলল,
“আমি research phase এ আছি। আগে পুরো system বুঝতে হবে।”
সুমন হেসে ফেলল।
“তোর research শেষ হতে হতে YouTube বন্ধ হয়ে যাবে।”
রাশেদের ঘরে একটা ডায়েরি আছে। নাম—
“Earning Master Plan”
ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা—
“Step 1: Learn everything”
Step 2 থেকে আর কিছু লেখা নেই।
কারণ Step 1 এখনও শেষ হয়নি।
একদিন রাশেদ সিদ্ধান্ত নিল—আজকে থেকে কাজ শুরু।
সে একটা ভিডিও বানাবে—
“How to earn money online in Bangladesh”
ভিডিও বানানোর আগে সে ২০টা ভিডিও দেখে নিল—কিভাবে ভিডিও বানাতে হয়।
তারপর ১০টা ভিডিও—কিভাবে thumbnail বানাতে হয়।
তারপর ১৫টা ভিডিও—কিভাবে SEO করতে হয়।
দিন শেষে সে বুঝল—আজও শুধু শেখা হলো। কাজ কাল থেকে।
এই কালটা খুব মিষ্টি। কিন্তু একটু ধোঁকাবাজ।
রাশেদের ছোট বোন মিম একদিন বলল,
“ভাইয়া, তুমি সারাদিন কী করো?”
রাশেদ বলল,
“আমি earning শিখি।”
মিম হেসে বলল,
“তুমি earning শিখো, আর earning করে YouTuber?”
রাশেদ চুপ করে গেল।
এই প্রথম কেউ তার মনের ভিতরের কথাটা এত সহজে বলে ফেলল।
রাতে রাশেদ ছাদে উঠে বসে।
আকাশে চাঁদ।
চাঁদটা খুব শান্তভাবে তাকিয়ে আছে—মনে হচ্ছে সে অনেক কিছু জানে, কিন্তু কিছুই বলে না।
রাশেদ ভাবল—
“আমি আসলে কী করছি?”
সে সারাদিন অন্যদের earning দেখে।
কিন্তু নিজে কিছু করে না।
একটা অদ্ভুত সত্যি—
যে ভিডিও বানায়, সে আয় করে।
যে দেখে, সে শুধু দেখে।
এইটা বুঝতে তার অনেক সময় লাগল।
পরের দিন সকালে একটা পরিবর্তন হলো।
রাশেদ মোবাইল খুলল। ইউটিউব খুলল।
তারপর আবার বন্ধ করে দিল।
আজ সে ভিডিও দেখবে না।
সে একটা খাতা নিল। লিখল—
“আজ আমি শুধু ১টা কাজ করব।”
সে ঠিক করল—একটা simple Facebook page খুলবে।
নাম দিল—
“Daily Simple Income”
নামটা শুনে একটু হাসি পায়। কারণ আয় এখনও শূন্য।
প্রথম পোস্ট দিল—
“আজ থেকে আমি earning journey শুরু করলাম। Alhamdulillah 😊”
লাইক—২টা।
একটা তার নিজের।
আরেকটা তার ছোট বোনের।
কিন্তু রাশেদ খুশি।
কারণ আজ সে দেখেনি—করেছে।
কিছুদিন পর সে ছোট ছোট পোস্ট দিতে লাগল।
“Freelancing কী?”
“Blogging কী?”
“Simple income ideas”
সবই সে নিজের ভাষায় লিখে।
কারণ সে expert না। কিন্তু beginner হিসেবে বুঝে।
এটাই তার শক্তি।
একদিন একটা মেসেজ এলো—
“ভাই, আপনার পোস্ট দেখে আমি Fiverr account খুলছি।”
রাশেদ অনেকক্ষণ মেসেজটার দিকে তাকিয়ে থাকল।
তার মনে হলো—
“আমি কিছু একটা করছি।”
এই অনুভূতিটা খুব শান্ত।
অনেকটা ভোরের বাতাসের মতো।
কিছুদিন পর সে আবার ভিডিও বানাল।
এইবার টাইটেল—
“Why you are not earning online”
সে নিজের গল্প বলল।
কিভাবে সে শুধু দেখত, কিছু করত না।
ভিডিওটা খুব বেশি ভিউ পেল না।
কিন্তু কয়েকটা কমেন্ট এলো—
“ভাই, আপনার কথা real লাগছে।”
“Exactly same problem!”
রাশেদ হাসল।
একটা ছোট সত্যি সে বুঝে গেছে—
earning এর সবচেয়ে বড় বাধা skill না,
অভ্যাস।
আর সবচেয়ে বড় সমস্যা—
“আরও একটু দেখে নিই” রোগ।
এই রোগে মানুষ সারাদিন দেখে।
শেষে earning করে অন্য কেউ।
রাতে আবার মশারির ভেতরে শুয়ে আছে রাশেদ।
মোবাইল পাশে রাখা।
আজ ইউটিউব খোলা না।
মশাটা আবার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু আজ রাশেদের দিকে না তাকিয়ে,
মনে হচ্ছে একটু সম্মান করছে।
কারণ আজ রাশেদ শুধু স্বপ্ন দেখেনি—
একটু হেঁটেছে।
জীবন খুব মজার।
এখানে অনেক মানুষ আছে—
যারা অন্যের গল্প দেখে।
আবার কিছু মানুষ আছে—
যারা নিজের গল্প লেখে।
দুটার মধ্যে পার্থক্য খুব ছোট—
একটা “Play” বাটন,
আর একটা “Start” বাটন।
রাশেদ অনেকদিন Play চাপত।
এখন সে Start চাপতে শিখছে।
শেষে একটা কথা—
earning ভিডিও খারাপ না।
কিন্তু শুধু দেখলে লাভ নেই।
কারণ—
YouTube কখনো আপনাকে টাকা দেয় না
ভিডিও দেখার জন্য।
ওটা দেয়—
ভিডিও বানানোর জন্য।
এই সহজ কথাটা বুঝতে
অনেকের বছর লেগে যায়।
রাশেদের লেগেছিল…
কিছুটা সময়।
তবু ভালো—
সে বুঝেছে।

0 মন্তব্যসমূহ