পহেলা বৈশাখের সকালগুলো সবসময় একটু আলাদা হয়। কেমন যেন নতুন খাতার প্রথম পাতার মতো—কিছুই লেখা নেই, কিন্তু ভেতরে ভেতরে অনেক কিছু লেখার প্রস্তুতি চলছে।
রাশেদ সেই সকালটা শুরু করল অ্যালার্মের আগেই। এটা তার জীবনে বিরল ঘটনা। সাধারণত অ্যালার্ম বাজে, সে চোখ বন্ধ রেখে ভাবে—“আর পাঁচ মিনিট”—তারপর ঘুম ভাঙে দুপুরে। কিন্তু আজ ভিন্ন। আজ পহেলা বৈশাখ।
তার মা রান্নাঘরে পান্তা-ইলিশের আয়োজন করছে। হাঁড়ির ভেতর থেকে ভাতের হালকা টক গন্ধ উঠছে। পাশে কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ কাটা—সব মিলিয়ে একটা পুরোনো দিনের স্মৃতি।
রাশেদ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখছিল। তার মনে হলো, “আমার জীবনে যত নতুন বছর এসেছে, আমি কি সত্যিই কখনো নতুন হয়েছি?”
এই প্রশ্নটা একটু বিপজ্জনক। কারণ এর উত্তর সাধারণত ভালো আসে না।
মা বললেন,
—“এই যে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দর্শন করিস কেন? হাত-মুখ ধুয়ে আয়, খেতে বসবি।”
রাশেদ হেসে বলল,
—“মা, আজকে আমি নতুন মানুষ হবো।”
মা চামচ নাড়তে নাড়তে বললেন,
—“এই কথাটা তুই গত পাঁচ বছর ধরে প্রতি বৈশাখে বলিস।”
এইটাই হলো মায়ের বিশেষ প্রতিভা—কথার ভেতর দিয়ে সত্য ঢুকিয়ে দেওয়া।
পাড়ার রাস্তায় বের হতেই রাশেদের মনে হলো সে যেন কোনো সিনেমার সেটে চলে এসেছে। ছোট ছোট বাচ্চারা লাল-সাদা জামা পরে ঘুরছে, কারো হাতে বেলুন, কারো হাতে কাগজের ঘুড়ি। মেয়েরা শাড়ি পরে, মাথায় ফুল গুঁজে হাঁটছে—যেন বসন্ত নিজে হাঁটতে বের হয়েছে।
তার বন্ধু বিপ্লব রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে ছিল। মুখে অদ্ভুত সিরিয়াস ভাব।
—“কি রে, তুই এত সকালে?”
বিপ্লব বলল,
—“আমি আজকে লাইফে একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
রাশেদ একটু ভয় পেল। বিপ্লবের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত মানেই সাধারণত কিছু অদ্ভুত ঘটনা ঘটে।
—“কি সিদ্ধান্ত?”
—“আমি আজকে প্রেম করবো।”
রাশেদ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল,
—“প্রেম কি আজকে স্পেশাল অফারে পাওয়া যাচ্ছে?”
বিপ্লব বিরক্ত হয়ে বলল,
—“তুই বুঝবি না। পহেলা বৈশাখে প্রেম করলে নাকি বছরটা ভালো যায়।”
এই ধরনের যুক্তিকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে—‘যে-কোনো-কিছু-কে-যে-কোনো-কিছুর-সাথে-জোড়া লাগানো তত্ত্ব’।
ওরা দুজন রমনা বটমূলে গেল। সেখানে মানুষের ভিড়—কেউ গান শুনছে, কেউ ছবি তুলছে, কেউ শুধু দাঁড়িয়ে আছে যেন সে খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু করছে।
একজন বাউল গান গাইছিল—
“মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি...”
রাশেদ গানটা শুনে একটু থমকে গেল। সে ভাবল, “মানুষকে ভজতে গেলে আগে মানুষটা বুঝতে হয়। আর আমি তো নিজেকেই ঠিকমতো বুঝি না।”
বিপ্লব তখন একদম অন্য জগতে। সে চারপাশে তাকাচ্ছে—কারো সাথে চোখ মেলে কিনা। হঠাৎ একটা মেয়ের সাথে তার চোখাচোখি হলো। মেয়েটা হাসল।
বিপ্লব ফিসফিস করে বলল,
—“দেখছিস? শুরু হয়ে গেছে!”
রাশেদ বলল,
—“ওটা হাসি না, ওটা ‘তুমি একটু সরে দাঁড়াও’ টাইপের ইঙ্গিতও হতে পারে।”
বিপ্লব গুরুত্ব দিল না। সে এগিয়ে গেল।
মেয়েটার নাম নীলা। সে খুব সাধারণভাবে কথা বলল। কোনো নাটকীয়তা নেই, কোনো সিনেমার ডায়লগ নেই।
বিপ্লব একটু হতাশ হলো—সে ভেবেছিল প্রেম মানেই ব্যাকগ্রাউন্ডে গান বাজবে।
নীলা বলল,
—“আপনারা কি প্রতিবছর এখানে আসেন?”
রাশেদ বলল,
—“আমরা আসি, কিন্তু প্রতি বছর নতুন কিছু বুঝে যাই।”
বিপ্লব বলল,
—“আমি আজকে নতুন কিছু শুরু করতে এসেছি।”
নীলা হেসে বলল,
—“নতুন কিছু শুরু করার জন্য শুধু দিন বদলালেই হয় না।”
এই কথাটা শোনার পর রাশেদ মনে মনে বলল—“এই মেয়েটা বিপজ্জনক। সত্য কথা বলে।”
ওরা তিনজন মেলা ঘুরতে লাগল। নাগরদোলায় উঠল, ফুচকা খেল, পুতুল কিনল—সবকিছুতেই একটা শিশুসুলভ আনন্দ।
একটা জায়গায় দেখা গেল একজন লোক মুখে রঙ মেখে দাঁড়িয়ে আছে—মানুষের ছবি আঁকছে।
বিপ্লব বলল,
—“আমার একটা ছবি আঁকাবো। প্রেমিকের মতো।”
লোকটা জিজ্ঞেস করল,
—“প্রেমিক মানে কেমন?”
বিপ্লব একটু থেমে বলল,
—“চোখে একটু দুঃখ থাকবে, কিন্তু ভেতরে আগুন।”
লোকটা ছবি আঁকল। শেষ হলে দেখা গেল—চোখে দুঃখ আছে, কিন্তু আগুনের বদলে একটু ঘুমঘুম ভাব।
রাশেদ বলল,
—“এইটাই তোর আসল রূপ।”
নীলা হেসে ফেলল।
দুপুরের দিকে সবাই একটু ক্লান্ত। একটা গাছের নিচে বসে তিনজন চুপচাপ।
হঠাৎ নীলা বলল,
—“আপনারা কখনো খেয়াল করেছেন, আমরা সবাই নতুন বছর শুরু করি, কিন্তু পুরোনো অভ্যাসগুলো সাথে নিয়ে আসি?”
রাশেদ বলল,
—“হ্যাঁ, আমরা ক্যালেন্ডার বদলাই, কিন্তু চরিত্রটা আপডেট করি না।”
বিপ্লব বলল,
—“আমি কিন্তু আজকে প্রেম শুরু করেছি।”
নীলা হেসে বলল,
—“প্রেম শুরু করা সহজ, ধরে রাখা কঠিন।”
এই কথাটা শুনে বিপ্লব একটু চুপ হয়ে গেল।
বিকেলের দিকে আকাশে হালকা মেঘ। বাতাসে এক ধরনের অলসতা।
রাশেদের মনে হলো, এই দিনটা খুব দ্রুত চলে যাচ্ছে। সে ভাবল—“আমরা কি আসলে কোনোদিন কিছু ধরে রাখতে পারি? নাকি সবকিছুই একটু একটু করে হাত ফসকে চলে যায়?”
নীলা উঠে দাঁড়াল।
—“আমাকে যেতে হবে।”
বিপ্লব একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল,
—“আবার দেখা হবে?”
নীলা বলল,
—“হতে পারে। যদি আপনারা শুধু দিন বদলাতে না চান, নিজেরাও একটু বদলাতে চান।”
এই বলে সে চলে গেল।
ফিরতি পথে বিপ্লব চুপচাপ।
রাশেদ বলল,
—“কি রে, প্রেম কেমন লাগলো?”
বিপ্লব বলল,
—“প্রেমটা কঠিন মনে হচ্ছে।”
রাশেদ বলল,
—“জীবনের সহজ জিনিসগুলোই আসলে কঠিন।”
বিপ্লব হঠাৎ বলল,
—“আমি হয়তো আজকে প্রেম করিনি। কিন্তু একটা জিনিস শিখেছি।”
—“কি?”
—“নিজেকে একটু ঠিক করতে হবে।”
রাশেদ হেসে বলল,
—“এইটাই পহেলা বৈশাখের আসল অফার।”
রাতে বাসায় ফিরে রাশেদ ডায়েরি খুলল।
সে লিখল—
“নতুন বছর মানে শুধু নতুন জামা না। নতুন বছর মানে একটু নতুন চিন্তা।
আমরা সবাই ভাবি—আগামীকাল থেকে বদলাবো। কিন্তু কাল কখনো আসে না।
আজ যদি একটু বদলাই, তবেই কালটা সত্যি হবে।”
তারপর সে একটু থেমে লিখল—
“আর প্রেম?
প্রেম আসলে পহেলা বৈশাখের মতো।
সবাই নতুন করে শুরু করতে চায়, কিন্তু যারা ধরে রাখতে পারে, তারাই সত্যি মানুষ হয়ে ওঠে।”
ডায়েরি বন্ধ করে সে জানালার দিকে তাকাল।
দূরে কোথাও আতশবাজি ফুটছে।
আলোটা খুব বেশি সময় থাকে না, কিন্তু সেই কয়েক সেকেন্ডেই মনে হয়—জীবনটা সুন্দর।
রাশেদ মনে মনে বলল—
“নতুন বছর, একটু ভালো করে শুরু করি। অন্তত চেষ্টা তো করা যায়।”
তারপর সে লাইট বন্ধ করল।
ঘর অন্ধকার।
কিন্তু ভেতরে ভেতরে কোথাও একটা ছোট আলো জ্বলছে।

0 মন্তব্যসমূহ