আকাশে আজ মেঘের রঙটা ঠিক কলাপাতা ছোপানো সবুজ। এই মেঘ দেখলে বৃষ্টির চেয়ে বেশি বিষণ্নতা পায়। আনিস সাহেব বারান্দায় দাঁড়িয়ে মেঘ দেখছিলেন। হুট করে তার মনে হলো, আজ যদি তিনি রান্না করেন তবে মন্দ হয় না। তার স্ত্রী নীলু বাপের বাড়ি গেছে। ঘরে একা থাকা মানেই এক ধরনের অরাজকতা সৃষ্টির সুযোগ।
আনিস সাহেবের রান্নার হাত অবশ্য বিশ্ববিখ্যাত—বিখ্যাত তার ভয়াবহতার জন্য। গতবার যখন তিনি ডিম ভাজতে গিয়েছিলেন, তখন সেই ডিমের অবয়ব দেখে নীলু জিজ্ঞেস করেছিল, "এটা কি খাবার না কোনো ভিনগ্রহের প্রাণীর ময়নাতদন্তের রিপোর্ট?"
আজকের টার্গেট: মুরগির ঝোল আর সাদা ভাত। রান্নাঘরে ঢুকেই আনিস সাহেবের মনে হলো তিনি এক বিশাল যুদ্ধক্ষেত্রের সেনাপতি। তবে এই সেনাপতির হাতে তলোয়ারের বদলে আছে একটা ভোঁতা বঁটি। মুরগি কাটা নিয়ে তিনি বিপাকে পড়লেন। মুরগির হাড়গুলো যেন তার সাথে জেদ ধরেছে। একেকটা কোপ মারেন আর হাড়গুলো পিছলে ড্রেনের কাছে চলে যায়।
যুদ্ধের শুরু: মসলার রণক্ষেত্র
রান্না শুরু হলো। তেলের ওপর পেঁয়াজ ছাড়তেই এক বিশাল আওয়াজ হলো—'শাঁঁআআঁঁ'। আনিস সাহেব এক হাত পিছিয়ে গেলেন। তার মনে হলো কড়াইয়ের ভেতর কোনো এক অতৃপ্ত আত্মা চিৎকার করে উঠল।
গল্পের চরিত্ররা প্রায়ই নিজেদের সাথে কথা বলে। আনিস সাহেবও বললেন, "আনিস, ঘাবড়াবে না। পেঁয়াজ লাল হওয়া মানেই বিজয়ের শুরু।"
কিন্তু পেঁয়াজ লাল হলো না, মুহূর্তের মধ্যেই তা কুচকুচে কালো হয়ে গেল। পোড়া পেঁয়াজের গন্ধে সারা ঘর ভরে গেছে। ঠিক এই সময়ে কলিংবেল বাজল। দরজা খুলতেই দেখা গেল পাশের বাসার মতিন সাহেব। লোকটা ছোটখাটো, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা।
মতিন সাহেব নাকে রুমাল দিয়ে বললেন, "আনিস সাহেব, আপনাদের বাসায় কি টায়ার পোড়ানো হচ্ছে?"
আনিস সাহেব অমায়িক হেসে বললেন, "না না, একটু ক্যারামেলাইজড পেঁয়াজ বানানোর চেষ্টা করছি। ফ্রেঞ্চ স্টাইল।"
মতিন সাহেব সন্দেহী দৃষ্টিতে তাকিয়ে বিদায় হলেন।
লবণের সমুদ্র ও মরিচের ঝাল
মসলা কষানোর পর্যায়ে আনিস সাহেব আবিস্কার করলেন তিনি হলুদের বদলে ভুলে লাল মরিচের গুঁড়ো বেশি দিয়ে ফেলেছেন। কড়াইয়ের রঙ এখন উদীয়মান সূর্যের চেয়েও লাল। দেখতে মনে হচ্ছে আগ্নেয়গিরির লাভা ফুটছে।
তিনি ভাবলেন, "ঝাল কমাতে মিষ্টি দরকার।" তিনি আধাকাপ চিনি ঢেলে দিলেন। এরপর মনে হলো স্বাদ ব্যালেন্স করতে লবণ লাগবে। লবণের বয়াম উপুড় করে দিলেন।
মুরগির ঝোল যখন ফুটছে, আনিস সাহেব এক চামচ মুখে দিয়ে দেখলেন। তার চোখের মণি স্থির হয়ে গেল। স্বাদটা ঠিক বর্ণনা করা সম্ভব নয়। মনে হলো কেউ একজন তার জিভের ওপর এসিড ঢেলে দিয়েছে, আবার একই সাথে এক বস্তা চিনি আর দুই চামচ লবণের মিশ্রণ খাইয়ে দিচ্ছে। এই স্বাদ মানুষের জন্য নয়, সম্ভবত কোনো রাক্ষসের পছন্দের মেনু হতে পারে।
আবেগ ও দর্শন
রান্নাঘরের জানালার পাশে একটা চড়ুই পাখি বসে ছিল। আনিস সাহেব পাখিটার দিকে তাকিয়ে করুণ স্বরে বললেন, "বুঝলে ভাই চড়ুই, রান্না একটা আর্ট। আর আমি হলাম সেই শিল্পী যার আঁকা ছবি কেউ বুঝল না।"
তার মনে পড়ল নীলুর কথা। নীলু যখন রান্না করে, তখন তার হাতে কোনো জাদু থাকে না, থাকে মায়া। সেই মায়ার বলেই সাধারণ ডাল-ভাত অমৃত হয়ে ওঠে। অথচ তিনি আজ তেরো পদের মসলা দিয়েও যা বানিয়েছেন, তা ডাস্টবিনে ফেলারও অযোগ্য।
হঠাৎ নীলুর ফোন এল। — "কী করছো?" — "বিশেষ কিছু না। মেঘ দেখছিলাম।" — "রান্নাঘরের জানালার কাঁচটা কি খোলা? আমার মনে হচ্ছে তুমি কিছু একটা পুড়িয়েছ। আমি এখান থেকেই গন্ধ পাচ্ছি।"
আনিস সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মেয়েদের ঘ্রাণশক্তি মাঝে মাঝে টেলিপ্যাথির মতো কাজ করে।
চূড়ান্ত বিপর্যয়: কুকারের বিস্ফোরণ
ভাত বসানো হয়েছিল প্রেসার কুকারে। হঠাৎ একটা বিকট শব্দ—'ফুঁসসস'। তারপরই মনে হলো রান্নাঘরে তুষারপাত শুরু হয়েছে। না, তুষার নয়, ভাতের মাড় আর চালের কণা দেয়াল, সিলিং আর আনিস সাহেবের চশমায় লেপ্টে গেছে।
আনিস সাহেব আয়নায় নিজেকে দেখলেন। ভাতের মাড় তার চুলে লেগে আছে, মনে হচ্ছে তিনি হঠাৎ করেই বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। চশমার এক পাশে একটি সেদ্ধ চাল ঝুলে আছে, যা লেন্সের ওপর এক অদ্ভুত প্রতিবিম্ব তৈরি করেছে।
উপসংহার ও সারমর্ম
গভীর রাতে আনিস সাহেব বারান্দায় বসে আছেন। সামনে এক বাটি মুড়ি আর চানাচুর। রান্না করা সেই মুরগিটা ডাস্টবিনে শায়িত। পাশের বাসার কুকুরটা সেই মুরগির হাড় মুখে নিয়েও কেন যেন কুঁইকুঁই শব্দ করে পালিয়ে গেল। সম্ভবত কুকুরটাও বুঝতে পেরেছে, এই রান্নার সাথে পাল্লা দেওয়া তার সাধ্যের বাইরে।
আনিস সাহেবের মনে হলো, মানুষের সব জেদ শেষ পর্যন্ত পেটের কাছে এসে হেরে যায়। তিনি মুড়ি চিবোতে চিবোতে ভাবলেন—আগামীকাল নীলু ফিরলে তাকে এক জোড়া কাঁচের চুড়ি কিনে দিতে হবে। যে হাত এই বিভীষিকা থেকে তাকে প্রতিদিন বাঁচিয়ে রাখে, সেই হাতের সম্মান হওয়া উচিত।

0 মন্তব্যসমূহ