নকল ও নীল মাছি

 মফস্বল শহরের বৈশাখী দুপুর। মাথার ওপর সিলিং ফ্যানটা গোঁ-গোঁ শব্দে ঘুরছে ঠিকই, কিন্তু বাতাস দিচ্ছে না। বরং মনে হচ্ছে ওপর থেকে গরম ডাল ঢেলে দিচ্ছে। পরীক্ষার হল মানেই এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা, যেখানে কলমের খসখস শব্দকে মনে হয় কামানের গর্জন। আমার ঠিক সামনে বসেছে আনিস। আনিস ছেলেটা ভালো, কিন্তু তার একটা মুদ্রাদোষ আছে। টেনশন বাড়লে সে অনবরত ঘাড় চুলকায়। আজ সে ঘাড় চুলকাচ্ছে মানেই বিপদের সংকেত।


আমি আজ প্রস্তুতি নিয়ে এসেছি ‘অজেয়’ হয়ে। পকেটে ছোট ছোট চিরকুট, যাকে আমাদের ছাত্রসমাজে অতি আদরে ‘তুকতাক’ বা ‘নকল’ বলা হয়। আমার পাঞ্জাবিতে পকেট আছে চারটা, আর প্রতিটা পকেটে এক একটা জ্ঞানের খনি। কিন্তু সমস্যা হলো, আজ গার্ড পড়েছেন রফিক স্যার।

রফিক স্যার মানুষটা গোলগাল, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। তাকে দেখলে মনে হয় তিনি খুব দয়ালু, কিন্তু আসলে তিনি ডিটেকটিভ শার্লক হোমসের বাঙালি সংস্করণ। তার নাকের ডগায় একটা তিল আছে, যেটা রাগের মাথায় কাঁপতে থাকে।

আমি যখন পকেট থেকে অতি সন্তর্পণে একটা চিরকুট বের করার চেষ্টা করছি, ঠিক তখনই রফিক স্যার আমার বেঞ্চের পাশে এসে দাঁড়ালেন। আমার হৃৎপিণ্ড তখন ড্রাম সেটের মতো বাজছে। তিনি নিচু হয়ে ফিসফিস করে বললেন, "খোকা, পকেটে কি জ্যান্ত বিচ্ছু আছে নাকি? হাতটা ওভাবে কাঁপছে কেন?"

আমি আমতা আমতা করে বললাম, "স্যার, আসলে একটু অ্যাজমার সমস্যা তো, ইনহেলারটা খুঁজছিলাম।"

রফিক সাহেব হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো মমতা নেই, আছে কেবল হিমশীতল রহস্য। তিনি বললেন, "ইনহেলার পকেটে থাকে না খোকা, ওটা ব্যাগে রাখতে হয়। যাই হোক, পরীক্ষা দাও। তবে মনে রেখো, ওপরওয়ালা সব দেখছেন, আর আমি তো নিচেই আছি।"

তিনি চলে যেতেই আমি ঘামতে শুরু করলাম। আমার ঠিক ডানপাশে বসা মফিজ। মফিজের আবার আধ্যাত্মিক ভাবের বালাই আছে। সে হঠাৎ খাতা থেকে মুখ তুলে আমাকে বলল, "দোস্ত, তোর কপালে একটা নীল মাছি বসেছে। এটা অশুভ লক্ষণ।"

আমি মনে মনে বললাম, নীল মাছি না, আজ যদি যমদূতও এসে বসে তাতেও আমার কিছু যায় আসে না। আমাকে পাস করতে হবে। আমার বাবা স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, এবার ফেল করলে আমাকে সোজা গ্রাম পাঠিয়ে দেবেন হালচাষ করতে। আমি গরুর লেজ ধরে আলপথে হাঁটতে রাজি নই।

আমি আবার পকেটে হাত দিলাম। এবার একটা লম্বা চিরকুট হাতে এল। ওটাতে ‘রেনেসাঁ’ যুগের বর্ণনা লেখা। কিন্তু চিরকুটটা বের করতেই দেখি সেটা মাঝখান থেকে ছিঁড়ে গেছে। অর্ধেকটা আমার হাতে, বাকি অর্ধেক পকেটের গহ্বরে। মেজাজটা এমন খারাপ হলো যে ইচ্ছা করছিল পরীক্ষার খাতা ছিঁড়ে দিয়ে  নিরুদ্দেশ হয়ে যাই।

ঠিক এই সময় ঘটল সেই অদ্ভুত ঘটনা। আনিস হঠাৎ তার ঘাড় চুলকানো বন্ধ করে সোজা হয়ে বসল। তারপর ফিসফিস করে বলল, "পেছনের পকেটে কী?"

আমি বললাম, "কী আবার? রুমাল।"

আনিস বলল, "না, রুমাল না। সাদা মতো কিছু একটা বের হয়ে আছে। রফিক স্যার ওদিকেই তাকাচ্ছেন।"

আমি চমকে উঠে পেছনে হাত দিলাম। সর্বনাশ! পকেট থেকে চিরকুট না, আমার মানিব্যাগ থেকে বের হয়ে আসা পাঁচশ টাকার একটা নোট বাতাসের ঝাপটায় অর্ধেক বের হয়ে আছে। রফিক সাহেব ধীরপায়ে এগিয়ে আসছেন। তার চশমার কাঁচ রোদে চকচক করছে।

রফিক সাহেব আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। নোটটার দিকে তাকালেন, তারপর আমার দিকে। তার নাকের তিলটা কাঁপছে। তিনি বললেন, "এটা কী?"

আমি শুকনো গলায় বললাম, "স্যার, টাকা।"

রফিক সাহেব গম্ভীর স্বরে বললেন, "পরীক্ষার হলে টাকা দিয়ে কী হয়? তুমি কি আমাকে ঘুষ দেওয়ার চেষ্টা করছ? নাকি প্রশ্নপত্র কেনার অগ্রিম কিস্তি?"

পুরো হলরুম নিস্তব্ধ। সবাই আমার দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছে যেন আমি কোনো দুর্ধর্ষ খুনি। মফিজ বিড়বিড় করে বলছে, "তোর কপালে শনি আছে রে দোস্ত, শনি আছে।"

আমি তোতলাতে তোতলাতে বললাম, "না স্যার, ওটা আসলে... আম্মা দিয়েছেন টিফিনের জন্য।"

"পাঁচশ টাকার টিফিন? তুমি কি দুপুরে আস্ত খাসি খাও?" রফিক সাহেবের কণ্ঠস্বর এখন বজ্রের মতো।

ঠিক সেই মুহূর্তে আমার মাথায় এক বুদ্ধি খেলল। হুমায়ূন আহমেদের গল্পের নায়ক হলে এই সময় কোনো একটা অদ্ভুত কথা বলে পরিস্থিতি সামাল দিত। আমি বললাম, "স্যার, এই টাকাটা আসলে আমার না। এটা আমি কুড়িয়ে পেয়েছি। ভেবেছিলাম পরীক্ষা শেষে আপনাকে জমা দেব। সততার পরীক্ষা দিচ্ছিলাম স্যার।"

রফিক সাহেব কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তার চোখের চশমাটা নাক দিয়ে একটু নিচে নেমে এল। তিনি বললেন, "সততার পরীক্ষা? বাহ! চমৎকার। তবে শোনো খোকা, সততা আর নকল একসঙ্গে চলে না। তোমার পকেটে যে চিরকুটগুলো ডানা ঝাপটাচ্ছে, সেগুলো কি দেবদূতদের চিঠি?"

আমি ধরা পড়ে গেছি। এবার আর নিস্তার নেই। আমি মাথা নিচু করে বসে রইলাম। রফিক সাহেব আমার পকেট থেকে চিরকুটগুলো বের করলেন। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, চিরকুটগুলো হাতে নিয়ে তিনি থমকে গেলেন।

তিনি কিছুক্ষণ ওগুলো পড়লেন, তারপর সশব্দে হেসে উঠলেন। পুরো হলের পরীক্ষার্থীরা অবাক হয়ে তাকে দেখছে। তিনি হাসতে হাসতে বললেন, "তুমি কি জানো তুমি কী লিখে এনেছ?"

আমি কাঁচুমাচু হয়ে বললাম, "জি স্যার, রেনেসাঁ।"

রফিক সাহেব বললেন, "না। তুমি ভুল করে তোমার ছোট ভাইয়ের হাতে লেখা বাজার ফর্দ নিয়ে চলে এসেছ। এখানে লেখা— হাফ কেজি পটল, এক কেজি মোটা চাল, আর দুই হালি ডিম।"

আমি আকাশ থেকে পড়লাম। তাড়াহুড়ো করে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় পড়ার টেবিল থেকে ভুল চিরকুট নিয়ে এসেছি! আমার সব পড়াশোনা, সব প্রস্তুতি এখন পটল আর ডিমের ফর্দ হয়ে গেছে।

রফিক সাহেব আমার পিঠে একটা চাপড় দিয়ে বললেন, "যাও, আজ তোমাকে ছেড়ে দিলাম। কারণ পটলের ফর্দ দিয়ে অন্তত নকল করা সম্ভব না। তবে মনে রেখো, জীবনে পটল কেনা সহজ, কিন্তু পাস করা অতটা সহজ না।"

আমি খাতার দিকে তাকালাম। আমার চোখ ভিজে এল। একেই কি বলে ‘ট্র্যাজিক-কমেডি’? মফিজ পাশ থেকে ফিসফিস করে বলল, "দোস্ত, বাজার ফর্দটা দিবি? আমার বাসায় ডিম লাগবে।"

আমি শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। বৈশাখী দুপুরের রোদে তখন মনে হচ্ছিল, পটল আর রেনেসাঁর মধ্যে আসলে খুব একটা পার্থক্য নেই। দুটোই জীবনের প্রয়োজনে লাগে, তবে সময়টা যদি ভুল হয়, তবে পটলই রেনেসাঁ হয়ে দাঁড়ায়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

ঘুম গবেষক সুলেমান