ব্যবসা শুরু, কিন্তু মালিক অনুপস্থিত


ভদ্রলোকের নাম মতিউর রহমান। তবে পাড়ার সবাই তাকে ডাকে “মতিভাই” বলে। কেন ডাকে, সেটা নিয়ে মতিভাইয়ের নিজস্ব একটা তত্ত্ব আছে। তার মতে, “মতি মানে বুদ্ধি। আমার বুদ্ধি এত বেশি যে মানুষ সংক্ষেপ করে দিয়েছে।”

পাড়ার লোকজন অবশ্য অন্য কথা ভাবে।

মতিভাইয়ের একটা অভ্যাস আছে—তিনি প্রতিদিন রাতে নতুন ব্যবসার পরিকল্পনা করেন। এমন পরিকল্পনা, শুনলে মনে হয় দেশের অর্থনীতি একাই টেনে তুলবেন। আর সকালে ঘুম থেকে উঠে সব ভুলে যান। একদম পরিষ্কার। যেন মাথার ভেতর কেউ ঝাড়ু দিয়ে দিয়েছে।

একদিন রাতের ঘটনা বলি।

সেদিন রাত সাড়ে দশটার দিকে মতিভাই চা খেতে খেতে হঠাৎ চুপ হয়ে গেলেন। তার স্ত্রী নাজমা বেগম তখন ডাল নাড়ছিলেন। তিনি অভ্যস্ত, এই চুপ হয়ে যাওয়া মানেই নতুন কিছু আসছে।

মতিভাই বললেন,
“শুনছো?”

নাজমা বেগম না তাকিয়েই বললেন,
“শুনছি। আবার কী?”

মতিভাই চোখ ছোট করে বললেন,
“আমি একটা বিরাট আইডিয়া পেয়েছি।”

নাজমা বেগম বললেন,
“আগেরটার কী হলো?”

মতিভাই একটু থামলেন। তারপর বললেন,
“আগেরটা ট্রায়াল ছিল। এটা ফাইনাল।”

তারপর তিনি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ঘরের ভেতর হাঁটাহাঁটি শুরু করলেন। হাঁটতে হাঁটতে বললেন,
“আমরা শুরু করবো ‘গরম ভাত হোম ডেলিভারি’ ব্যবসা।”

নাজমা বেগম এবার তাকালেন।
“গরম ভাত?”

“হ্যাঁ! সবাই তো বিরিয়ানি, পিজা দেয়। কিন্তু কেউ কি খেয়াল করেছে—মানুষ আসলে গরম ভাত চায়! এই যে অফিস থেকে ফিরে, ক্লান্ত শরীর… তখন একটা ধোঁয়া ওঠা ভাত…”

তিনি চোখ বন্ধ করে এমনভাবে বললেন, যেন তিনি নিজেই সেই ভাত।

নাজমা বেগম শান্ত গলায় বললেন,
“ভাত তো সবাই বাসায় রান্না করে।”

মতিভাই হাত তুলে থামালেন,
“না! সবাই পারে না। আর যারা পারে, তারা করতে চায় না। মানুষ অলস হয়ে গেছে। আমরা সেই অলসতাকে ক্যাশ করবো।”

নাজমা বেগম বললেন,
“তাহলে তরকারি?”

মতিভাই বললেন,
“তরকারি অপশনাল। আমাদের মূল পণ্য ভাত।”

“শুধু ভাত খাবে?”

“খাবে। মানুষ এখন ডায়েট করে। শুধু ভাত খেলে মন হালকা থাকে।”

নাজমা বেগম কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন,
“তোমার নিজেরই তো ডায়েটের নাম শুনলে রাগ উঠে।”

মতিভাই একটু অপ্রস্তুত হলেন। তারপর বললেন,
“আমি ব্যতিক্রম। ব্যবসা আর ব্যক্তিগত জীবন এক জিনিস না।”

এরপর তিনি একটা খাতা বের করলেন। বড় করে লিখলেন—
“মতিভাই রাইস সার্ভিস”

তার নিচে পয়েন্ট আকারে লিখলেন:
১. গরম ভাত
২. দ্রুত ডেলিভারি
৩. কম দামে

তিনি লিখতে লিখতে এত খুশি হয়ে গেলেন যে নিজের লেখা নিজেই পড়ে বললেন,
“দেখো, কী পরিষ্কার প্ল্যান!”

নাজমা বেগম মাথা নেড়ে বললেন,
“হুম।”

রাত বারোটার দিকে মতিভাই ঘুমাতে গেলেন। যাওয়ার আগে খাতাটা বালিশের পাশে রেখে দিলেন। যেন সকালেই যুদ্ধ শুরু করবেন।


পরদিন সকাল।

মতিভাই ঘুম থেকে উঠে বেশ ফ্রেশ ফিল করলেন। মনে হলো, আজ কিছু একটা করার কথা। কিন্তু কী?

তিনি বিছানার পাশে খাতা দেখে বললেন,
“এটা আবার কী?”

খাতা খুলে দেখলেন—
“মতিভাই রাইস সার্ভিস”

তিনি কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন,
“আচ্ছা… আমি কি গতকাল ভাত বিক্রির ব্যবসা শুরু করেছিলাম?”

নাজমা বেগম তখন রান্নাঘর থেকে বললেন,
“শুরু না, পরিকল্পনা।”

মতিভাই বললেন,
“হুম… আইডিয়াটা খারাপ না।”

তিনি আবার খাতাটা বন্ধ করে রেখে দিলেন। কিন্তু তার চোখে সেই আগের আগুন নেই।

দশ মিনিট পরে তিনি চা খেতে খেতে হঠাৎ বললেন,
“শুনছো?”

নাজমা বেগম দূর থেকে বললেন,
“শুনছি। আবার কী?”

মতিভাই বললেন,
“আমি একটা নতুন আইডিয়া পেয়েছি।”

নাজমা বেগম থেমে গেলেন।
“ভাতেরটা?”

“না না, ওটা বাদ। এটা অনেক বড়।”

তিনি গম্ভীর হয়ে বললেন,
“আমরা শুরু করবো—‘ছাতা ভাড়া সার্ভিস’।”

নাজমা বেগম চুপ করে থাকলেন। এই চুপ করে থাকা তার বিশেষ দক্ষতা।

মতিভাই ব্যাখ্যা শুরু করলেন,
“বৃষ্টি হলেই মানুষ ছাতা খুঁজে পায় না। আমরা রাস্তায় স্টল দেবো। মানুষ ছাতা নেবে, কাজ শেষে ফেরত দেবে।”

নাজমা বেগম বললেন,
“ফেরত না দিলে?”

মতিভাই হাসলেন,
“মানুষ এত খারাপ না।”

নাজমা বেগম এবার হালকা হেসে বললেন,
“তোমার টাকা হলে মানুষ খুব ভালো।”

মতিভাই একটু থেমে বললেন,
“ঠিক আছে, জামানত রাখবো।”

“কত?”

“ছাতার দামের সমান।”

“তাহলে কিনেই নেবে।”

মতিভাই আবার থামলেন। তারপর বললেন,
“হুম… তাহলে জামানত বেশি রাখবো।”

“কত?”

“ছাতার দামের চেয়ে বেশি।”

নাজমা বেগম এবার হাসলেন।
“তাহলে কেউ নেবে না।”

মতিভাই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর বললেন,
“ব্যবসায় একটু ঝুঁকি থাকেই।”

তিনি আবার খাতা বের করলেন। লিখলেন—
“ছাতা ভাড়া প্রকল্প”


এভাবে প্রতিদিনই নতুন কিছু।

কখনো তিনি বলেন,
“আমরা শুধু বাম জুতা বিক্রি করবো। ডান জুতা পরে দেবো ফ্রি।”

কখনো বলেন,
“চা বিক্রি করবো, কিন্তু কাপ থাকবে না। সবাই নিজ নিজ কাপ নিয়ে আসবে। এতে খরচ কমবে।”

একদিন তো তিনি সিরিয়াস হয়ে বললেন,
“আমি একটা স্কুল খুলবো। যেখানে পড়ানো হবে না। শুধু পরীক্ষা নেওয়া হবে।”

নাজমা বেগম বললেন,
“তাহলে ছাত্ররা কী শিখবে?”

মতিভাই বললেন,
“ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা। এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।”


পাড়ার লোকজনও তার এই অভ্যাস জানে।

একদিন বিকেলে মতিভাই চায়ের দোকানে বসে বললেন,
“আমি ভাবছি একটা অ্যাপ বানাবো।”

দোকানদার জিজ্ঞেস করলো,
“কিসের অ্যাপ?”

মতিভাই বললেন,
“মানুষ ভুলে যায়—আমি সেই ভুলে যাওয়া জিনিস মনে করিয়ে দেবো।”

একজন বললো,
“আপনি নিজেই তো ভুলে যান।”

মতিভাই গম্ভীর হয়ে বললেন,
“তাই তো আমি বুঝি সমস্যাটা কোথায়।”

সবাই হেসে ফেললো।


একদিন রাতে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটলো।

মতিভাই আবার নতুন পরিকল্পনা লিখলেন। কিন্তু এবার তিনি সাবধান হলেন। তিনি খাতার প্রথম পাতায় বড় করে লিখলেন—
“সকালে পড়তে ভুলবে না!”

তার নিচে লিখলেন,
“আজকের আইডিয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ।”

তারপর তিনি বিস্তারিত লিখলেন। এত বিস্তারিত যে লিখতে লিখতে রাত দেড়টা বাজে।

তিনি খাতা বন্ধ করে বালিশের নিচে রেখে দিলেন। ঘুমাতে গেলেন সন্তুষ্ট মুখে।


সকাল।

মতিভাই উঠে প্রথমেই খাতা বের করলেন। নিজের লেখা দেখে একটু অবাক হলেন।
“আরে! আমি নিজেকেই নোট দিয়ে রেখেছি!”

তিনি খাতা খুললেন। মন দিয়ে পড়তে শুরু করলেন।

দুই মিনিট পর তার মুখে একটা অদ্ভুত হাসি ফুটলো।

নাজমা বেগম জিজ্ঞেস করলেন,
“কী লিখেছো?”

মতিভাই ধীরে ধীরে বললেন,
“আমি লিখেছি—‘কাল রাতে যা ভেবেছিলাম, সেটা ভুলে যাও। আজ নতুন কিছু ভাবো।’”

নাজমা বেগম চুপ করে তাকিয়ে রইলেন। তারপর হেসে ফেললেন।

মতিভাইও হাসলেন। একটু লজ্জার মতো, আবার একটু স্বস্তির মতো।

তিনি বললেন,
“দেখো, আমার মাথা নিজেই নিজেকে আপডেট করে।”

নাজমা বেগম বললেন,
“তোমার মাথা খুব আধুনিক।”

মতিভাই গম্ভীর হয়ে বললেন,
“হ্যাঁ, কিন্তু মেমোরি একটু কম।”


সেদিন বিকেলে মতিভাই বারান্দায় বসে ছিলেন। হাতে চা। কোনো খাতা নেই, কোনো পরিকল্পনা নেই।

নাজমা বেগম এসে পাশে বসে বললেন,
“আজ নতুন কিছু ভাবছো না?”

মতিভাই চায়ের কাপের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“ভাবছি।”

“কী?”

তিনি একটু হেসে বললেন,
“আজ ভাবছি—সবকিছু না ভাবলেও চলে।”

নাজমা বেগম কিছু বললেন না।

হালকা বাতাস বইছিল। দূরে কোথাও একটা বাচ্চা হাসছিল।

মতিভাই চা খেতে খেতে বললেন,
“জানো, আমার এত পরিকল্পনা… একটাও বাস্তবায়ন হয়নি।”

নাজমা বেগম বললেন,
“হয়তো দরকারও ছিল না।”

মতিভাই মাথা নেড়ে বললেন,
“হয়তো। কিন্তু ভাবতে ভালো লাগে।”

তিনি একটু থেমে আবার বললেন,
“আর ভুলে যেতে আরও ভালো লাগে।”

নাজমা বেগম হেসে ফেললেন।

মতিভাইও হাসলেন।

হাসিটা খুব বড় কিছু না। খুব ছোট। কিন্তু তাতে একটা শান্তি আছে। যেন কোনো ব্যবসা না করেও তিনি লাভে আছেন।

আর সেদিন রাতে, অনেকদিন পর, তিনি কোনো পরিকল্পনা করলেন না।

তবুও ঘুমটা বেশ ভালো হলো।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

ঘুম গবেষক সুলেমান