নতুন জামা, পুরোনো মন



পহেলা বৈশাখের সকালটা সবসময় একটু নাটকীয় হয়।
সূর্য ওঠে ঠিক আগের দিনের মতোই, কিন্তু মানুষের আচরণ দেখে মনে হয়—আজ সূর্যও একটু নতুন।

নাঈমের ঘুম ভাঙল অ্যালার্মের আগেই। এটা তার জীবনে বিরল ঘটনা। সাধারণত সে এমনভাবে ঘুমায়, যেন পৃথিবীর কোনো দায়িত্ব তার না। কিন্তু আজ পহেলা বৈশাখ। নতুন জামা আছে, ছবি তোলার প্ল্যান আছে, ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার একটা দায়িত্ব আছে।

সে উঠে আয়নার সামনে দাঁড়াল। নতুন পাঞ্জাবি—লাল-সাদা। একদম ঝকঝকে।
সে নিজেকে দেখে মুগ্ধ হলো। মনে মনে বলল,
“এইবারের ছবি ভাইরাল হবেই।”

তার মা রান্নাঘর থেকে ডাক দিলেন,
—“এই যে, নাঈম! পান্তা ঠান্ডা হয়ে যাবে!”

নাঈম একটু বিরক্ত হয়ে বলল,
—“মা, আগে ছবি তুলতে দাও। খাওয়া পরে হবে।”

মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—“তোর জীবনে এখন সবকিছুর আগে ছবি, পরে বাস্তব।”

এই কথাটা নাঈম শুনল, কিন্তু গুরুত্ব দিল না। কারণ সত্য কথাগুলো সাধারণত আমরা ইগনোর করতে পছন্দ করি।


বাড়ির ছাদে গিয়ে সে ছবি তোলা শুরু করল।
একবার দাঁড়িয়ে, একবার বসে, একবার হাসি দিয়ে, একবার সিরিয়াস মুখ করে—সব মিলিয়ে পঞ্চাশটা ছবি।

তার বন্ধু রিফাত ফোন দিল,
—“কিরে, রেডি?”
—“হ্যাঁ, আমি তো একদম সেট। আজকে পুরো ঢাকা কাঁপাবো।”
—“কিসে?”
—“স্টাইলে।”

রিফাত বলল,
—“তোর লাইফে স্টাইল ছাড়া আর কিছু আছে?”

নাঈম একটু থেমে বলল,
—“থাকলেও আপাতত দরকার নাই।”


ওরা বের হলো রমনা পার্কের দিকে।
চারপাশে মানুষ—লাল-সাদা ঢেউ।
মেয়েরা শাড়ি পরে, ছেলেরা পাঞ্জাবি পরে—সবাই যেন হঠাৎ করে সাংস্কৃতিক হয়ে গেছে।

নাঈম হাঁটতে হাঁটতে ছবি তুলছে।
সে খেয়াল করল—সে আসলে এই মুহূর্তটা উপভোগ করছে না, সে শুধু মুহূর্তটাকে ক্যামেরায় ধরে রাখতে ব্যস্ত।

রিফাত বলল,
—“এই যে, একটু বসি?”
—“না না, আগে ছবি তুলি।”

রিফাত হেসে বলল,
—“তুই ছবি তুলিস, আমি জীবনটা একটু দেখি।”


ওরা একটা চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়াল।
নাঈম চা খাচ্ছে, আর ফোনে ছবি এডিট করছে।
ঠিক তখনই তার চোখে পড়ল—একটা ছোট ছেলে, বয়স ৮-৯ বছর।

ছেলেটার গায়ে পুরোনো, একটু ছেঁড়া জামা।
পায়ে স্যান্ডেল নেই।
কিন্তু মুখে এমন একটা হাসি—যেটা দেখে মনে হয় সে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ।

সে একটা কাগজের বাঁশি বাজাচ্ছে।
নিজেই হাসছে, নিজেই দৌড়াচ্ছে।

নাঈম তাকিয়ে রইল।
কিছু একটা অদ্ভুত লাগছে।

সে রিফাতকে বলল,
—“ও ছেলেটাকে দেখ।”

রিফাত একবার তাকিয়ে বলল,
—“দেখছি। খুব খুশি মনে হচ্ছে।”

নাঈম বলল,
—“কিন্তু ওর তো কিছুই নাই।”

রিফাত চা খেতে খেতে বলল,
—“আমাদের সব আছে, তবুও আমরা খুশি না। এইটাই সমস্যা।”

এই কথাটা নাঈমের মাথায় ঢুকল না, কিন্তু কোথাও একটা ধাক্কা দিল।


নাঈম ছেলেটার কাছে গেল।
—“তোর নাম কি?”
—“সোহাগ।”

—“নতুন জামা নাই?”
সোহাগ হাসল,
—“এইটাই আমার নতুন জামা।”

নাঈম একটু অবাক হলো।
—“এইটা?”

—“হ্যাঁ। গত বছরও ছিল, কিন্তু আজকে আবার নতুন মনে হচ্ছে।”

এই উত্তরটা নাঈমকে চুপ করিয়ে দিল।

সে জিজ্ঞেস করল,
—“তুই এত খুশি কেন?”

সোহাগ বাঁশিটা মুখে দিয়ে একটা বাজাল।
তারপর বলল,
—“আজকে মেলা আছে, অনেক মানুষ, অনেক রঙ। খুশি না হয়ে উপায় আছে?”

নাঈম মনে মনে ভাবল—“আমারও তো সব আছে। আমি খুশি না কেন?”


রিফাত পাশে এসে দাঁড়াল।
—“কি রে, নতুন ফ্রেন্ড?”

নাঈম বলল,
—“হুম। ওর কাছে একটা জিনিস আছে, যেটা আমাদের নাই।”

রিফাত হেসে বলল,
—“কি? বাঁশি?”

—“না। খুশি।”

রিফাত একটু সিরিয়াস হলো।


নাঈম হঠাৎ করে নিজের জামার দিকে তাকাল।
এত সুন্দর, এত নতুন।
কিন্তু কেন যেন আজকে এই জামাটা তার কাছে অদ্ভুত লাগছে।

সে মনে মনে বলল,
“আমি কি শুধু জামা বদলাই, মনটা একই রাখি?”

এই প্রশ্নটা সহজ না।
কারণ এর উত্তর দিলে নিজের সাথে মুখোমুখি হতে হয়।


দুপুরের দিকে ওরা একটা গাছের নিচে বসল।
চারপাশে মানুষের হাসি, গান, হৈচৈ।

নাঈম চুপচাপ।

রিফাত বলল,
—“কি ভাবছিস?”

—“ভাবছি, আমি এতদিন কি করছি।”

—“কি করছিলি?”

—“নতুন জামা কিনে নিজেকে নতুন ভাবার চেষ্টা করছিলাম।”

রিফাত বলল,
—“এটা আমরা সবাই করি।”

নাঈম বলল,
—“কিন্তু কাজ হয়?”

রিফাত চুপ করে থাকল।
কারণ কিছু প্রশ্নের উত্তর না দেওয়াই ভালো।


বিকেলের দিকে আকাশে হালকা রোদ।
নাঈম আবার সোহাগকে খুঁজে পেল।

সে বলল,
—“এই, তুই কিছু খাবি?”

সোহাগ বলল,
—“খাবো।”

ওরা একসাথে ফুচকা খেল।
সোহাগ এমনভাবে খাচ্ছে, যেন এটা পৃথিবীর সেরা খাবার।

নাঈম মনে মনে বলল,
“আমি এতদিন খাবার খাইনি, আমি শুধু ছবি তুলেছি।”


হঠাৎ নাঈম একটা সিদ্ধান্ত নিল।
সে তার নতুন পাঞ্জাবিটা খুলে সোহাগকে দিল।

রিফাত অবাক,
—“এইটা কি করছিস?”

নাঈম হেসে বলল,
—“আমি নতুন হতে চাই।”

সোহাগ অবাক হয়ে বলল,
—“তুমি কি পরবা?”

নাঈম বলল,
—“পুরোনোটা।”

সোহাগ বলল,
—“তুমি খুশি থাকবা?”

নাঈম একটু থেমে বলল,
—“চেষ্টা করবো।”


সোহাগ পাঞ্জাবিটা পরে নিল।
তার চোখে যে আনন্দ—তা কোনো ক্যামেরায় ধরা যায় না।

নাঈম প্রথমবার বুঝল—
খুশি একটা অনুভূতি, এটা কোনো ফিল্টার না।


রাতে বাসায় ফিরে নাঈম আয়নার সামনে দাঁড়াল।
পুরোনো জামা পরে।

কিন্তু আজকে সে নিজেকে একটু অন্যরকম লাগছে।

সে মনে মনে বলল,
“আজকে আমি নতুন জামা পরিনি, কিন্তু হয়তো একটু নতুন হয়েছি।”

তার মা এসে বললেন,
—“তোর জামা কই?”

নাঈম হেসে বলল,
—“একজনের দরকার ছিল, তাকে দিয়ে দিয়েছি।”

মা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন,
—“এই প্রথম মনে হচ্ছে, তুই একটু বড় হইছিস।”


নাঈম রাতে ডায়েরি খুলল।
সে লিখল—

“নতুন বছর মানে শুধু নতুন জামা না।
নতুন বছর মানে নতুন মন।

আমরা সবাই বাইরে বদলাই,
ভেতরটা একই রাখি।

আজকে একটা ছোট ছেলে আমাকে শিখিয়েছে—
খুশি হতে হলে নতুন কিছু পরতে হয় না,
নতুনভাবে ভাবতে হয়।”


জানালার বাইরে তখনো মানুষের আওয়াজ।
দূরে কোথাও গান বাজছে।

নাঈম লাইট বন্ধ করল।

ঘর অন্ধকার।
কিন্তু তার ভেতরে আজকে একটা ছোট আলো জ্বলছে।

এই আলোটা নতুন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

ঘুম গবেষক সুলেমান