ফইট্যা মা

 


গ্রামের নাম কচুবাড়িয়া। নাম শুনলেই মনে হয় এখানে কচু ছাড়া আর কিছুই জন্মায় না, কিন্তু বাস্তবে এখানে জন্মায় মানুষ, গল্প, আর একটু বাড়তি কৌতূহল। সেই কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু একজন বয়স্ক মহিলা—ফইট্যা মা।

তার আসল নাম কেউ ঠিকমতো জানে না। কেউ বলে ফাতেমা, কেউ বলে ফইজুন্নেছা। কিন্তু তিনি নিজেই একদিন হেসে বলেছিলেন, “আমারে যে নামে ডাকলে তুমি হাসবা, ওই নামেই ডাকো।” সেই থেকে ফইট্যা মা নামটা পাকাপাকি।

ফইট্যা মায়ের একটা বিশেষ অভ্যাস আছে। প্রতিদিন সকালবেলা একটা পুরনো কাপড়ের ব্যাগ হাতে নিয়ে তিনি বের হন। বের হওয়া মানে স্রেফ হাঁটা না—একটা মিশন। তবে এই মিশন এত শান্ত আর উদাসীন যে দেখলে মনে হয় তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কবি।

গ্রামের লোকেরা বলে, “ফইট্যা মা আবার কবিতা করতে বের হইছে।”

তিনি হাঁটেন খুব ধীরে। মাঝে মাঝে থেমে গাছের দিকে তাকান। কখনো একটা পাতা তুলে দেখেন, কখনো বাতাসে চুল উড়িয়ে দেন। দূর থেকে মনে হয়, তিনি প্রকৃতির সঙ্গে গভীর প্রেমে পড়েছেন।

কিন্তু আসল ঘটনা একটু অন্যরকম।

একদিন পাশের বাড়ির জহিরা খালা জিজ্ঞেস করলেন, — “এই ফইট্যা, তুমি গাছের দিকে এমন তাকাও ক্যান?” ফইট্যা মা খুব শান্ত গলায় বললেন, — “দেখি, কোনটা পাকা হইছে।”

তার এই “দেখা” আসলে পর্যবেক্ষণ। আমের সিজনে তিনি আমগাছের নিচ দিয়ে হাঁটেন। চোখ থাকে উপরে, কিন্তু পা চলে নিচে। কখনো হঠাৎ থামেন, ঝট করে নিচ থেকে একটা আম তুলে ব্যাগে ঢুকিয়ে দেন। তারপর আবার হাঁটা।

এমনভাবে করেন যেন পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাভাবিক কাজ।

যদি আম না থাকে, তিনি সুপারি বাগানের দিকে যান। সুপারি গাছের নিচে পড়ে থাকা সুপারি তিনি এমন নিপুণভাবে কুড়িয়ে নেন, যেন বহু বছরের প্রশিক্ষণ আছে। কেউ কেউ বলে, “এই বিদ্যায় যদি ডিগ্রি থাকত, ফইট্যা মা পিএইচডি করতো।”

একদিন গ্রামের স্কুলের মাস্টার সাহেব মজা করে বললেন, — “ফইট্যা মা, আপনি তো ‘ফল সংগ্রহ বিজ্ঞান’-এর অধ্যাপক!” ফইট্যা মা হেসে বললেন, — “আমি শুধু ছাত্র, মাস্টার। গাছই আমার শিক্ষক।”

এই কথা শুনে সবাই একটু থেমে গেল। হাসি পেলেও, ভেতরে কোথাও একটা নরম জায়গায় হাত লাগল।

ফইট্যা মায়ের ছেলেমেয়েরা সবাই শহরে প্রতিষ্ঠিত। বড় ছেলে ডাক্তার, মেজো ইঞ্জিনিয়ার, ছোট ছেলে ব্যবসায়ী। মেয়ে বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন—তারও সংসার ভালো। নাতি-নাতনিরা ছবি পাঠায়, ভিডিও কল করে।

সবাই একটাই কথা বলে, — “মা, এইসব কাজ কইরো না। লোকে কি বলবে?”

ফইট্যা মা তখন খুব শান্তভাবে বলেন, — “লোকে তো অনেক কিছুই বলে। তারা কি আমার ভাত দেয়?”

একবার বড় ছেলে এসে খুব রাগ করল। — “মা, তুমি গ্রামের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ফল কুড়াও! এটা আমাদের জন্য লজ্জার!” ফইট্যা মা একটু চুপ করে থাকলেন। তারপর বললেন, — “তোরে আমি ছোটবেলায় কাঁঠাল খাইতে দিছিলাম, মনে আছে?” — “আছে।” — “ওই কাঁঠালটা আমি কুড়াইছিলাম।”

ছেলে আর কিছু বলতে পারল না।

ফইট্যা মা আসলে কৃপণ নন, অভাবীও নন। তিনি শুধু খুঁজে পান আনন্দ। যে আনন্দ মানুষ এখন টাকা দিয়ে কিনতে চায়।

তার ব্যাগে সবসময় কিছু না কিছু থাকে—আম, কাঁঠাল বীচি, সুপারি, কখনো পেয়ারা। বাড়িতে এসে তিনি সেগুলো ধুয়ে, কেটে, একটু লবণ-মরিচ দিয়ে বসে বসে খান।

খাওয়ার সময় তার মুখের যে তৃপ্তি—তা পাঁচতারকা হোটেলের খাবারেও পাওয়া যায় না।

গ্রামের লোকেরা তার নিয়ে হাসাহাসি করে, আবার গল্পও করে।

রহিম কাকা আছেন—তার একটাই মুদ্রাদোষ। তিনি সব কথার শেষে বলেন, “আমি কিন্তু আগে থেকেই জানতাম।”

একদিন তিনি বললেন, — “ফইট্যা মা এইসব করে ক্যান জানো? আমি কিন্তু আগে থেকেই জানতাম—এইটা নেশা।”

পাশে থাকা মজনু বলল, — “কাকা, আপনি তো সবকিছু আগেই জানেন। নিজের বউ কবে রাগ করে, এইটা জানেন?” রহিম কাকা একটু চুপ করে বললেন, — “এইটা আলাদা বিষয়।”

আরেকজন আছে—বাবলু। সে সবসময় কথা বলার সময় “মানে” শব্দটা ব্যবহার করে। — “মানে ফইট্যা মা, আপনি মানে এইভাবে ফল কুড়ান কেন?” ফইট্যা মা বললেন, — “মানে খাইতে ভালো লাগে।” বাবলু থমকে গেল। এত সহজ উত্তর সে আশা করেনি।

একদিন একটা মজার ঘটনা ঘটল।

ফইট্যা মা একটা আমগাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছেন। উপরে তাকিয়ে আছেন গভীরভাবে। পাশ দিয়ে এক শহুরে লোক যাচ্ছিল। সে ভাবল, এই মহিলা নিশ্চয়ই কবি বা দার্শনিক।

সে কাছে এসে বলল, — “আপনি কি প্রকৃতি নিয়ে ভাবছেন?” ফইট্যা মা বললেন, — “হ, ভাবতেছি—এই আমটা পড়লে ধরতে পারমু কিনা।”

লোকটা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল, তারপর হেসে চলে গেল।

ফইট্যা মা কিন্তু থামলেন না। তিনি ঠিকই আমটা পড়ার আগেই ধরে ফেললেন। তারপর নিজের ব্যাগে রেখে বললেন, — “আল্লাহ, আজকেও লজ্জা রইল না।”

তার এই জীবনটা বাইরে থেকে দেখলে হাস্যকর মনে হতে পারে। কিন্তু ভেতরে একটা অদ্ভুত শান্তি আছে।

তিনি কারো উপর নির্ভর করেন না। কারো অনুমতির দরকার হয় না। তিনি নিজের মতো করে সুখ খুঁজে নেন।

একদিন তার নাতি গ্রামে এল। শহরের ছেলে, একটু আধুনিক।

সে দাদিকে জিজ্ঞেস করল, — “দাদি, তুমি এইসব কুড়িয়ে খাও কেন?” ফইট্যা মা বললেন, — “তুই ভিডিও গেম খেলিস কেন?” — “মজা লাগে।” — “আমারও মজা লাগে।”

নাতি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল, — “আমি কি তোমার সাথে যেতে পারি?” ফইট্যা মা হাসলেন, — “ব্যাগ ধরতে পারবি?”

সেদিন দুজন একসাথে বের হল। নাতি প্রথমে লজ্জা পাচ্ছিল। কিন্তু একটু পর সে-ই আগে আগে দৌড়ে গিয়ে আম কুড়াতে লাগল।

ফিরে এসে সে বলল, — “দাদি, এটা তো গেমের চেয়েও মজার!”

ফইট্যা মা চুপ করে শুধু হাসলেন।

সন্ধ্যায় তিনি উঠানে বসে থাকেন। হাতে একটা পেয়ারা, পাশে তার পুরনো ব্যাগ। আকাশে তারা ওঠে।

তিনি আস্তে করে বলেন, — “জীবনটা খারাপ না। মানুষটাই বেশি ভাবি।”

কেউ শোনে না, কিন্তু কথাটা বাতাসে ভেসে থাকে।

ফইট্যা মা কোনো বড় কিছু করেননি। তিনি শুধু ছোট ছোট জিনিসে আনন্দ খুঁজে পেয়েছেন। এই ছোট আনন্দগুলোই তার বড় সম্পদ।

গ্রামের লোকেরা এখন আর তেমন হাসে না। বরং কেউ কেউ লুকিয়ে লুকিয়ে তাকে অনুসরণ করে—দেখে কিভাবে একটা মানুষ এত সহজভাবে সুখী হতে পারে।

রহিম কাকা একদিন বললেন, — “আমি কিন্তু আগে থেকেই জানতাম—ফইট্যা মা ঠিক আছে।”

এই প্রথমবার কেউ তাকে থামিয়ে বলল, — “কাকা, এইবার সত্যিই ঠিক বলছেন।”

ফইট্যা মা তখন দূরে একটা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে। বাতাসে তার শাড়ি দুলছে। তিনি তাকিয়ে আছেন—গাছের দিকে, আকাশের দিকে, নাকি জীবনের দিকে—ঠিক বোঝা যায় না।

হয়তো তিনটাই।

তার ব্যাগটা ধীরে ধীরে ভরে উঠছে।

আর তার জীবন? অনেক আগেই ভরে গেছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

ঘুম গবেষক সুলেমান