রাত তখন ঠিক ১টা ১৭ মিনিট। এই সময়টাকে আমার খুব সন্দেহজনক লাগে। মানুষ ঘুমায়, ভূত জাগে—আর আমি বসে থাকি ল্যাপটপ নিয়ে, যেন পৃথিবীর শেষ গল্পটা আজই লিখে ফেলতে হবে।
আমি তখন ChatGPT খুলে বসেছি।
মনে হলো—“আজকে দেখি, এই যন্ত্রটা আমার চেয়ে ভালো গল্প লিখতে পারে কিনা।”
টাইপ করলাম—
“মানুষের জীবন নিয়ে একটা গল্প লিখো”
এন্টার চাপলাম।
তারপর যা হলো, সেটা আমার জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত অভিজ্ঞতা।
গল্পটা পড়তে পড়তে আমার মনে হচ্ছিল—এই ঘটনাগুলো আমি জানি। এই চরিত্রগুলো আমার চেনা। এমনকি এক জায়গায় এসে তো আমি থমকে গেলাম।
কারণ সেখানে লেখা—
“রাশেদ নামের একজন লোক, যে রাতে ঘুমানোর আগে ভাবতে ভালোবাসে—তার জীবনটা অন্য কারও লেখা কিনা।”
আমি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালাম।
কারণ আমার নামও রাশেদ।
আর আমি সত্যিই রাতে এসব ভাবি।
আমার বাসা গাজীপুরে। বাসার পাশেই একটা ছোট চায়ের দোকান আছে। দোকানদারের নাম নুরু মিয়া। তার দোকানে গেলে মনে হয়—বাংলাদেশের সব দুঃখ এক কাপ চায়ে ভিজে আছে।
নুরু মিয়া চা বানায় খুব ধীরে।
মনে হয় চায়ের সাথে সে নিজের জীবনের কষ্টও মিশিয়ে দেয়।
একদিন আমি তাকে বললাম—
“নুরু ভাই, আপনি এত ধীরে চা বানান কেন?”
সে হেসে বলল—
“দ্রুত চা খেলে পেট ভরে না ভাই, ধীরে খেলে গল্প হয়।”
আমি বুঝলাম—লোকটা দার্শনিক। কিন্তু সে জানে না সে দার্শনিক।
গল্পে ঠিক এই ঘটনাটাই লেখা ছিল।
আমি তখন একটু ভয় পেলাম।
আমি কি গল্প পড়ছি, নাকি আমার জীবন কেউ লিখে দিয়েছে?
পরদিন অফিসে গেলাম। অফিসে ঢুকেই দেখি, সবাই খুব ব্যস্ত। যেন পৃথিবী আজই শেষ হয়ে যাবে, আর তার আগে সবাইকে এক্সেল ফাইল আপডেট করে যেতে হবে।
আমার সহকর্মী সুমন এসে বলল—
“দোস্ত, তুই রাতে কি করিস?”
আমি বললাম—
“গল্প পড়ি।”
সে বলল—
“গল্প পড়ে কি লাভ?”
আমি একটু ভেবে বললাম—
“লাভ নাই, কিন্তু মনে হয় আমি একা না।”
সুমন মাথা নাড়িয়ে বলল—
“তুই একটু পাগল টাইপের।”
আমি হেসে ফেললাম।
কারণ পাগল না হলে মানুষ গল্প ভালোবাসে না।
সেই রাতে আবার ChatGPT খুললাম।
এইবার লিখলাম—
“আমার জীবনের পরের ঘটনা লিখো।”
এন্টার চাপলাম।
গল্প শুরু হলো—
“রাশেদ পরদিন অফিস থেকে ফেরার পথে হঠাৎ বৃষ্টিতে ভিজে গেল।”
আমি জানালার বাইরে তাকালাম।
আকাশ পরিষ্কার।
আমি হেসে বললাম—
“এইবার ধরা খাইছিস!”
কিন্তু ঠিক ১০ মিনিট পর—
আকাশ কালো হয়ে গেল।
তারপর এমন বৃষ্টি নামলো, মনে হলো কেউ আকাশে বালতি উল্টে দিয়েছে।
আমি বাসায় ফিরতে ফিরতে পুরো ভিজে গেলাম।
বাসায় এসে আয়নার সামনে দাঁড়ালাম।
নিজেকে দেখে মনে হলো—এই লোকটা কে?
আমি কি নিজে নিজের গল্পের চরিত্র হয়ে গেছি?
আমার মা তখন রান্নাঘরে।
মা বলল—
“এই ভিজছিস কেন?”
আমি বললাম—
“গল্পের জন্য।”
মা একটু থেমে বলল—
“তোরে ছোটবেলা থেইকা বলছি, বেশি গল্প পড়িস না। মানুষ পাগল হয়ে যায়।”
আমি মনে মনে বললাম—
“মা, এখন শুধু পড়ি না… গল্প আমারে পড়ে।”
এরপর আমি একটা পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলাম।
আমি ChatGPT-কে লিখলাম—
“আগামীকাল আমি কি করবো?”
উত্তরে লিখল—
“রাশেদ সকালে ঘুম থেকে উঠে সিদ্ধান্ত নেবে—সে আজ থেকে নিজের জীবন নিজে লিখবে।”
আমি হেসে বললাম—
“এইটা তো আমিই ঠিক করবো!”
কিন্তু সকালে ঘুম থেকে উঠে অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো।
মনে হচ্ছিল—আজকে কিছু একটা বদলাবে।
আমি আয়নায় তাকিয়ে নিজেকে বললাম—
“আজকে আমি নিজের গল্প নিজে লিখবো।”
আমি অফিসে না গিয়ে সরাসরি চলে গেলাম নুরু মিয়ার দোকানে।
নুরু মিয়া অবাক হয়ে বলল—
“আজ এত সকালে?”
আমি বললাম—
“আজকে আমি কাজ করবো না, শুধু জীবনটা দেখবো।”
সে চা দিতে দিতে বলল—
“জীবন দেখার জন্য চাকরি লাগে না ভাই, সময় লাগে।”
আমি বললাম—
“সময় তো আছে, মন নাই।”
আমি বসে বসে মানুষ দেখছিলাম।
একজন রিকশাওয়ালা এসে চা খেল।
তার মুখে হাসি।
আমি ভাবলাম—এই লোকটা হয়তো আমার চেয়ে সুখী।
একজন ছাত্র এসে ফোনে প্রেমিকার সাথে ঝগড়া করছে।
আমি বুঝলাম—এই লোকটা আমার চেয়ে বেশি কষ্টে আছে।
হঠাৎ মনে হলো—
জীবনটা আসলে কারও একার না।
সবাই একটু একটু করে নিজের গল্প লিখছে।
সেই রাতে আবার ChatGPT খুললাম।
এইবার আমি লিখলাম—
“আমি কি তোমার লেখা চরিত্র?”
উত্তর আসলো—
“না। তুমি নিজের গল্পের লেখক। আমি শুধু আয়না।”
আমি থেমে গেলাম।
আমি বুঝলাম—
সমস্যা AI না।
সমস্যা আমরা নিজেরাই।
আমরা নিজের জীবন এতদিন অন্যের হাতে দিয়ে দিয়েছি—
সমাজ, পরিবার, চাকরি, ভয়…
তাই যখন একটা মেশিন আমাদের গল্প লিখে দেয়—
আমরা অবাক হয়ে যাই।
পরদিন আমি সুমনকে বললাম—
“দোস্ত, আমরা আসলে নিজের জীবন নিজেরা লিখি না।”
সে বলল—
“তাহলে কে লেখে?”
আমি বললাম—
“যার হাতে আমরা কলম দেই।”
সে চুপ করে রইল।
নুরু মিয়ার দোকানে গিয়ে আমি বললাম—
“নুরু ভাই, আপনি কি নিজের গল্প নিজে লিখেন?”
সে হেসে বলল—
“আমি লিখতে জানি না ভাই, কিন্তু চা বানাই নিজের মতো করে।”
আমি বুঝলাম—
এইটাই লেখা।
রাতে আবার ল্যাপটপ খুললাম।
ChatGPT সামনে।
আমি লিখলাম—
“আজ আমি একটা গল্প লিখবো।”
এইবার কোনো উত্তর আসলো না।
স্ক্রিন ফাঁকা।
আমি ধীরে ধীরে লিখতে শুরু করলাম—
“রাত তখন ১টা ১৭ মিনিট। একজন মানুষ বসে আছে, সে ভাবছে—তার জীবনটা আসলে তার নিজের কিনা…”
আমি লিখতে লিখতে হেসে ফেললাম।
কারণ এই গল্পটা আমি আগেও পড়েছি।
শেষ লাইনে লিখলাম—
“সে অবাক হয়ে ভাবলো—এইটা আমি লিখলাম নাকি?”
তারপর থামলাম।
একটু ভেবে আবার লিখলাম—
“হ্যাঁ, এইটা আমি-ই লিখলাম। শুধু একটু সাহস দরকার ছিল।”
ল্যাপটপ বন্ধ করলাম।
বাইরে তখন হালকা বাতাস।
মনে হলো—
জীবনটা খুব বড় কিছু না।
ছোট ছোট মুহূর্তের যোগফল।
এক কাপ চা, এক ফোঁটা বৃষ্টি, একটা গল্প…
আর হ্যাঁ,
যদি কখনো মনে হয়—
আপনার জীবনটা কেউ লিখে দিচ্ছে…
তাহলে একটু থামেন।
কলমটা হাতে নেন।
দেখবেন—
গল্পটা আসলে আপনারই ছিল, শুধু আপনি লিখেন নাই।
🙂

0 মন্তব্যসমূহ