বিকেলটা অদ্ভুত রকমের নরম ছিল। এমন নরম বিকেল সাধারণত শুধু গল্পের বইতেই থাকে—বাস্তবে না। কিন্তু আজ বাস্তবও যেন একটু গল্প হতে চাইছে।
রফিক সাহেব বারান্দায় বসে চা খাচ্ছেন। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে তিনি এমন ভাব করছেন যেন দেশ-বিদেশের বড় কোনো সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন। অথচ আসলে তিনি ভাবছেন—চায়ে চিনি কম হয়েছে নাকি তার জিহ্বার স্বাদই বদলে গেছে।
তার স্ত্রী লায়লা বেগম রান্নাঘর থেকে চিৎকার করে বললেন,
—চা ঠিক আছে তো?
রফিক সাহেব একটু থেমে বললেন,
—চা ভালো। শুধু মনে হচ্ছে চিনি নেই।
লায়লা বেগম শান্ত গলায় বললেন,
—চিনি তিন চামচ দিয়েছি।
রফিক সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—তাহলে সমস্যা আমার।
এই কথাটা তিনি খুব সহজভাবে বললেও, ভিতরে ভিতরে একটু দুঃখ পেলেন। মানুষ যখন নিজের সমস্যার দায় নিজের উপর নেয়, তখন সেটা ছোট ব্যাপার হলেও কেমন যেন বড় লাগে।
ঠিক তখনই পাশের বাসার মফিজ সাহেব ঢুকে পড়লেন। এই মানুষটির একটা অদ্ভুত গুণ আছে—তিনি কখনো দরজায় নক করেন না। সরাসরি ঢুকে পড়েন, যেন এই বাসাটাও তারই।
—কি খবর রফিক ভাই! মুখটা এমন কেন? দেশ বিক্রি করে দিলেন নাকি?
রফিক সাহেব হাসলেন।
—না ভাই, চায়ে চিনি কম।
মফিজ সাহেব গুরুত্ব সহকারে মাথা নেড়ে বললেন,
—এইটা কিন্তু সিরিয়াস বিষয়। চিনি কম মানে জীবনে মিষ্টতা কম।
লায়লা বেগম রান্নাঘর থেকে বললেন,
—আপনি আগে নিজের জীবনের মিষ্টতা ঠিক করেন, তারপর অন্যদেরটা দেখবেন।
মফিজ সাহেব থতমত খেলেন। তারপর দ্রুত বিষয় পাল্টালেন।
—শুনছেন? একটা খবর আছে।
রফিক সাহেব চায়ের কাপ নামিয়ে বললেন,
—বলুন।
—আপনার ছেলে রায়হানকে আজকে বাজারে দেখেছি। খুব সন্দেহজনক আচরণ।
রফিক সাহেবের ভ্রু কুঁচকে গেল।
—সন্দেহজনক মানে?
—একটা মেয়ের সাথে দাঁড়িয়ে ছিল। হাসাহাসি করছিল।
এই কথাটা বলার সময় মফিজ সাহেব এমনভাবে বললেন যেন তিনি কোনো আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র আবিষ্কার করেছেন।
রফিক সাহেব একটু চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন,
—মেয়ের সাথে কথা বললেই সন্দেহজনক?
মফিজ সাহেব গম্ভীর হয়ে বললেন,
—আপনি বুঝবেন না। আমি অনেক কিছু বুঝি।
এই “আমি অনেক কিছু বুঝি” টাইপ মানুষদের নিয়ে একটা সমস্যা আছে—তারা আসলে কিছুই ঠিকমতো বোঝে না, কিন্তু আত্মবিশ্বাস থাকে ভয়ানক।
রায়হান তখনো বাসায় ফেরেনি। লায়লা বেগম বিষয়টা শুনে খুব উত্তেজিত হয়ে গেলেন।
—কোন মেয়ে? কেমন মেয়ে? কি করছিল?
মফিজ সাহেব একটু নাটকীয় ভঙ্গিতে বললেন,
—হাসছিল।
—হাসছিল মানে?
—এই যে… দাঁত বের করে।
লায়লা বেগম চুপ করে গেলেন। কারণ হাসি যদি অপরাধ হয়, তাহলে পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ জেলে যেত।
সন্ধ্যার একটু পর রায়হান বাসায় ফিরল। তার মুখে সেই চিরচেনা নিরীহ ভাব। এই ছেলেটাকে দেখে কখনো মনে হয় না সে কোনো রহস্যের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে।
লায়লা বেগম সরাসরি প্রশ্ন করলেন,
—আজকে তুমি কার সাথে ছিলে?
রায়হান অবাক হয়ে বলল,
—কোথায়?
—বাজারে!
—ওহ… ওইটা? আমার কলেজের গ্রুপমেট। নাম নীলা।
মফিজ সাহেব ফিসফিস করে বললেন,
—দেখলেন? নামও জানা!
রফিক সাহেব এবার একটু বিরক্ত হলেন।
—নাম জানলে সমস্যা কি?
মফিজ সাহেব চুপ করে গেলেন। কারণ এই প্রশ্নের উত্তর তার কাছেও নেই।
রায়হান শান্তভাবে বলল,
—আমরা প্রজেক্ট নিয়ে কথা বলছিলাম।
লায়লা বেগম সন্দেহের চোখে তাকালেন।
—প্রজেক্টের কথা বলতে হাসতে হয়?
রায়হান একটু ভেবে বলল,
—কখনো কখনো হয়।
এই উত্তরটা এতটাই সোজা যে এতে সন্দেহ করার কিছু থাকে না। কিন্তু মানুষের মন এমন—সোজা জিনিসকে বাঁকা করে দেখতে ভালোবাসে।
পরদিন সকালে পুরো পাড়া জানল—রফিক সাহেবের ছেলে প্রেম করছে।
এই খবরটা এমনভাবে ছড়াল যেন কেউ বিনামূল্যে বিরিয়ানি বিলাচ্ছে।
পাড়ার আড্ডায় একজন বলল,
—ছেলেটা তো দেখতে শান্ত ছিল।
আরেকজন বলল,
—শান্ত লোকজনই বেশি করে।
এই ধরনের কথাগুলো শোনার পর মনে হয়—মানুষ আসলে গল্প বানাতে খুব পছন্দ করে। সত্যি থাকলে গল্প জমে না।
রফিক সাহেব খুব অস্বস্তিতে পড়লেন। তিনি জানেন, তার ছেলে খারাপ কিছু করছে না। কিন্তু সমাজের এই “ভাবনা” নামের জিনিসটা খুব ঝামেলার।
সেদিন রাতে তিনি রায়হানকে ডেকে বললেন,
—তুই কিছু লুকাচ্ছিস?
রায়হান হাসল।
—না আব্বু।
—মেয়েটা কে?
—বন্ধু।
রফিক সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর বললেন,
—বন্ধুত্ব ভালো জিনিস। কিন্তু মানুষ ভুল বুঝে।
রায়হান মাথা নিচু করে বলল,
—মানুষ সবসময়ই ভুল বুঝে, আব্বু।
এই কথাটা শুনে রফিক সাহেব একটু চমকে গেলেন। কারণ এটা সত্যি।
কয়েকদিন পর এক মজার ঘটনা ঘটল।
পাড়ার সবাইকে চমকে দিয়ে সেই নীলা মেয়ে নিজেই রফিক সাহেবের বাসায় এল। হাতে একটা ফাইল।
—আংকেল, সালাম। আমি নীলা।
লায়লা বেগম একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন।
—ওহ… আসো।
নীলা খুব স্বাভাবিকভাবে বলল,
—আমাদের প্রজেক্টটা দেখাতে এসেছি।
ফাইল খুলে সে এমনভাবে বুঝাতে শুরু করল যে রফিক সাহেব মুগ্ধ হয়ে গেলেন। মেয়েটা খুব মেধাবী।
মফিজ সাহেবও তখন উপস্থিত। তিনি চুপচাপ সব দেখছেন।
শেষে নীলা বলল,
—আমরা একটা কমিউনিটি প্রজেক্ট করছি। পাড়ার বাচ্চাদের ফ্রি পড়াবো।
সবাই চুপ।
এই চুপটা অদ্ভুত। কারণ এখানে কোনো সন্দেহ নেই, কোনো নাটক নেই—শুধু একটা ভালো কাজের কথা।
মফিজ সাহেব ধীরে ধীরে বললেন,
—মানে… তোমরা প্রেম করছো না?
নীলা হেসে ফেলল।
—না আংকেল। আমরা কাজ করছি।
এই হাসিটা খুব সহজ ছিল। কিন্তু এই সহজ হাসিটাই যেন সবার ভুল বোঝাবুঝিকে ধীরে ধীরে গলিয়ে দিল।
রফিক সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
—আমরা আসলে খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি।
লায়লা বেগম একটু লজ্জা পেয়ে বললেন,
—হ্যাঁ… আমরা ভুল বুঝেছি।
মফিজ সাহেব মাথা চুলকাতে চুলকাতে বললেন,
—আমি একটু বেশি বুঝে ফেলি মাঝে মাঝে।
সবাই হেসে উঠল।
এই হাসির মধ্যে একটা স্বস্তি ছিল। ভুল বোঝাবুঝি কেটে গেলে মানুষ যে স্বস্তিটা পায়, সেটা খুব গভীর।
রাতের দিকে রফিক সাহেব আবার বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিলেন।
আজ চায়ে চিনি ঠিকই আছে। কিন্তু তিনি ভাবছেন—মানুষের মনে যে ভুল বোঝাবুঝির চিনি থাকে, সেটা যদি বেশি হয়ে যায়, তাহলে জীবন তেতো হয়ে যায়।
হঠাৎ রায়হান পাশে এসে বসল।
—কি ভাবছেন?
রফিক সাহেব মুচকি হেসে বললেন,
—ভাবছি, আমরা কত সহজে ভুল বুঝি।
রায়হান বলল,
—ভুল বুঝলে সমস্যা নেই, যদি ঠিক করে নেওয়া যায়।
রফিক সাহেব মাথা নেড়ে বললেন,
—ঠিক বলেছিস।
তারপর একটু থেমে যোগ করলেন,
—আর মফিজ সাহেব থাকলে গল্পটা জমে যায়।
রায়হান হেসে ফেলল।
—ওনাকে ছাড়া পাড়া চলবে না।
দূরে কোথাও আজানের শব্দ ভেসে আসছে। বাতাসে একটা শান্ত ভাব।
এই শান্তির মধ্যে রফিক সাহেব বুঝলেন—জীবন আসলে খুব জটিল না। আমরা নিজেরাই তাকে জটিল বানাই।
আর ভুল বোঝাবুঝি?
ওটা জীবনের একধরনের মশলা। একটু থাকলে স্বাদ বাড়ায়, বেশি হলে খাবার নষ্ট করে।
তিনি চায়ের শেষ চুমুকটা দিয়ে বললেন,
—জীবনটা আসলে চায়ের মতো। চিনি ঠিক থাকলে সব ঠিক।
পাশ থেকে মফিজ সাহেব হঠাৎ বলে উঠলেন,
—আর যদি চিনি বেশি হয়?
রফিক সাহেব হেসে বললেন,
—তাহলে ডায়াবেটিস।
সবাই আবার হেসে উঠল।
গল্প এখানেই শেষ না। কারণ এই পাড়ায় প্রতিদিনই নতুন কোনো ভুল বোঝাবুঝি জন্ম নেয়। আর সেই ভুলগুলোই একদিন গল্প হয়ে যায়।
হয়তো আপনি-আমি সেই গল্পেরই কোনো চরিত্র।


0 মন্তব্যসমূহ