শিরোনাম: “আমার শৈশবের হারানো বিকেল”
আমাদের গ্রামে বিকেলগুলো খুব লম্বা হতো। এখন বুঝি, সময় একই ছিল, কিন্তু আমাদের ছোট্ট মনটাই বড় ছিল বলে বিকেলগুলোও বড় মনে হতো। তখন ঘড়ি ছিল না, মোবাইল ছিল না, কিন্তু সময় ঠিকই কেটে যেত—মা ডাকলে বুঝতাম সন্ধ্যা হয়ে গেছে।
আমি ছোটবেলায় খুব শান্ত ছেলে ছিলাম—এটা আমি বলছি না, এটা আমার মা বলতেন। তবে পাড়ার লোকজন বলত, “এই ছেলেটা শান্ত না, চুপচাপ টাইপের বিপজ্জনক।” কেন বলত, সেটা পরে বুঝেছি।
আমাদের বাড়ির সামনে একটা বিশাল আমগাছ ছিল। গাছটা এমনভাবে দাঁড়িয়ে থাকত, যেন সে গ্রামের দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। গাছের নিচে বসে গ্রামের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো—কে কার গরু চুরি করেছে, কার মুরগি কার ডিম খেয়েছে, এসব গুরুতর বিষয়।
আমার শৈশবের বড় অংশ কেটেছে ওই আমগাছের নিচে। গরমের দুপুরে যখন সবাই ঘুমাত, আমি আর আমার বন্ধু রফিক গাছের নিচে বসে পরিকল্পনা করতাম—আজ কোন বাড়ির আম চুরি করা হবে।
রফিক ছিল আমার জীবনের প্রথম ব্যবসায়িক পার্টনার। আমরা খুব হিসেব করে কাজ করতাম। সে গাছে উঠত, আমি নিচে দাঁড়িয়ে পাহারা দিতাম। তবে পাহারা দেওয়ার কাজটা আমি কখনো ঠিকমতো করতে পারিনি। কারণ আমি বেশি ভয় পেতাম।
একদিন রফিক গাছে উঠে আম পাড়ছে, হঠাৎ বাড়ির মালিক এসে হাজির। আমি ভয় পেয়ে দৌড় দিলাম। রফিক তখনও গাছে। পরে ওকে ধরে এনে বেধড়ক পেটানো হলো।
সন্ধ্যায় রফিক এসে আমাকে বলল,
“তুই বন্ধু না, তুই জাতীয় দুর্যোগ।”
আমি চুপ করে ছিলাম। কারণ আমি জানতাম, ও ঠিকই বলছে।
আমাদের গ্রামে একটা পুকুর ছিল, যেটা নিয়ে অনেক গল্প আছে। সেই পুকুরে নাকি একবার একটা বাঘ নেমেছিল—এটা কে বলেছিল, কেউ জানে না। কিন্তু আমরা সবাই বিশ্বাস করতাম।
একদিন আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে ঠিক করলাম, আজ আমরা পুকুরে ডুব দেব। সাহস পরীক্ষা করা হবে।
আমি খুব আত্মবিশ্বাস নিয়ে পানিতে নামলাম। কিন্তু পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে বুঝলাম, আমার আত্মবিশ্বাস পানিতে ভেসে গেছে।
আমি চিৎকার শুরু করলাম, “বাঁচাও! বাঁচাও!”
পরে দেখা গেল, আমি আসলে দাঁড়িয়েই ছিলাম। পানির গভীরতা ছিল হাঁটুর সমান।
সেদিন থেকে আমার নাম হয়ে গেল “ডুবন্ত সোলেমান ”।
শৈশবের একটা মজার ব্যাপার হলো—ছোট ছোট জিনিসেও আমরা অদ্ভুত আনন্দ পেতাম। একটা নতুন লাটিম পেলে মনে হতো, আমি যেন পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষ।
আমার বাবা একবার আমাকে একটা লাটিম কিনে দিয়েছিলেন। আমি সেটা নিয়ে এমনভাবে খেলতাম, যেন এটা কোনো বৈজ্ঞানিক যন্ত্র।
একদিন লাটিম ঘুরাতে ঘুরাতে সেটা গিয়ে পড়ল পাশের বাড়ির আন্টির রান্নাঘরে। তিনি তখন মাছ ভাজছিলেন।
লাটিমটা গিয়ে সরাসরি কড়াইতে পড়ল।
সেদিন আমি প্রথম বুঝলাম—লাটিমও ভাজা যায়।
আমার মা আমাকে অনেক ভালোবাসতেন। তবে সেই ভালোবাসার একটা বিশেষ রূপ ছিল—চড়।
মা বলতেন,
“তোকে মারি ভালোবাসি বলেই।”
আমি মাঝে মাঝে ভাবতাম, যদি মা আমাকে একটু কম ভালোবাসতেন!
আমাদের স্কুলটা ছিল খুব সাধারণ। টিনের ছাউনি, কাঠের বেঞ্চ। গরমে মনে হতো আমরা সবাই ভাপা পিঠা হয়ে যাচ্ছি।
আমাদের ক্লাসের স্যার ছিলেন খুব কঠোর। তিনি সব সময় বলতেন,
“যে পড়াশোনা করবে না, সে মানুষ হবে না।”
আমি তখন ভাবতাম, মানুষ হওয়া এত জরুরি কেন?
একদিন স্যার আমাকে জিজ্ঞেস করলেন,
“তুই বড় হয়ে কী হতে চাস?”
আমি বললাম,
“আমি বড় হয়ে ছুটি নিতে চাই।”
স্যার কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর বললেন,
“তোর মধ্যে ভবিষ্যৎ আছে, তবে সেটা কোথায় আছে, সেটা আমি বুঝতে পারছি না।”
শৈশবের আরেকটা বড় অংশ ছিল ঈদের সময়। ঈদের আগের রাতটা ছিল আমাদের জন্য সবচেয়ে আনন্দের।
নতুন জামা নিয়ে আমরা এমনভাবে ঘুমাতাম, যেন কেউ চুরি করে নিয়ে যাবে।
সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথম কাজ ছিল—জামাটা পরে আয়নার সামনে দাঁড়ানো।
আমি একবার এত খুশি হয়েছিলাম যে, জামা পরে বাইরে বেরিয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু প্যান্ট পরতে ভুলে গিয়েছিলাম।
পাড়ার সবাই সেটা খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখেছিল।
ঈদের দিন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল সালামি সংগ্রহ করা। আমরা একেকজন এমনভাবে সালাম দিতাম, যেন আমরা পেশাদার।
একটা সময় এসে বুঝলাম—সালামির পরিমাণ নির্ভর করে আপনার সালামের মানের ওপর।
আমার সালাম ছিল একটু দুর্বল টাইপের। তাই আমি কম পেতাম।
একদিন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আজ আমি প্রিমিয়াম সালাম দেব।
আমি এমনভাবে সালাম দিলাম, যেন আমি কোনো পুরস্কার নিতে এসেছি।
ফলাফল—আমি ৫ টাকা বেশি পেলাম।
সেদিন আমি বুঝলাম, জীবনেও একটু অভিনয় দরকার।
আমাদের শৈশবের বন্ধুত্বগুলো খুব অদ্ভুত ছিল। আমরা ঝগড়া করতাম, মারামারি করতাম, কিন্তু পরদিন আবার একসাথে খেলতাম।
একবার আমি আর রফিক এমন ঝগড়া করলাম যে, আমরা ঠিক করলাম—আজ থেকে আমরা শত্রু।
কিন্তু পরদিন বিকেলে খেলতে গিয়ে দেখি, শত্রু হওয়ার মতো আর কেউ নেই।
তাই আমরা আবার বন্ধু হয়ে গেলাম।
শৈশবের একটা বড় সৌন্দর্য ছিল—আমরা সহজেই ভুলে যেতাম।
এখন বড় হয়ে দেখি, আমরা কিছুই ভুলতে পারি না। ছোট ছোট কষ্টগুলো জমে পাহাড় হয়ে যায়।
তখন একটা চড় খেয়ে পাঁচ মিনিট কাঁদতাম, তারপর আবার হাসতাম।
এখন একটা কথা শুনে পাঁচ বছর ভাবি।
আমার দাদী ছিলেন খুব মজার মানুষ। তিনি গল্প বলতে ভালোবাসতেন।
তার গল্পগুলো এমন হতো, যেগুলোতে কোনো লজিক থাকত না, কিন্তু শুনতে খুব ভালো লাগত।
তিনি একবার বললেন,
“এক ছিল রাজা, তার ছিল একটা হাঁস, হাঁসটা কথা বলত।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
“হাঁস কথা বলে কীভাবে?”
তিনি বললেন,
“যারা বেশি প্রশ্ন করে, তাদের হাঁস কামড়ায়।”
সেদিন আমি বুঝলাম—সব প্রশ্নের উত্তর জানা দরকার নেই।
শৈশবের স্মৃতিগুলো অনেকটা পুরনো ছবির মতো। একটু ঝাপসা, কিন্তু খুব প্রিয়।
আমরা তখন ছোট ছিলাম, কিন্তু আমাদের আনন্দগুলো ছিল বড়।
এখন আমরা বড় হয়েছি, কিন্তু আনন্দগুলো ছোট হয়ে গেছে।
কখনো কখনো মনে হয়, যদি আবার সেই বিকেলগুলো ফিরে পেতাম—আমগাছের নিচে বসে থাকা, পুকুরে নামার ভয়, ঈদের নতুন জামার গন্ধ…
কিন্তু জীবন এমন একটা ট্রেন, যেটা একবার চলে গেলে আর ফিরে আসে না।
তবুও, মাঝে মাঝে চোখ বন্ধ করলে সেই শৈশবটা ফিরে আসে।
রফিকের হাসি, মায়ের ডাক, দাদীর গল্প…
সব কিছু মিলে একটা অদ্ভুত শান্তি দেয়।
আমি মাঝে মাঝে নিজের ছোটবেলার আমাকে বলি,
“তুই খুব ভাগ্যবান ছিলি।”
সে হয়তো হেসে বলত,
“আমি জানতাম না।”
আমরাও জানতাম না—শৈশবটা এত সুন্দর ছিল।
হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল এটাই—আমরা সুন্দর সময়গুলোকে তখন বুঝতে পারি না, যখন সেটা আমাদের সামনে থাকে।
শৈশবটা ছিল একটা খোলা আকাশের মতো—কোনো সীমা ছিল না, কোনো ভয় ছিল না।
এখন আকাশটা আছে, কিন্তু আমরা নিজেরাই ছোট হয়ে গেছি।
তবুও, একটা জিনিস এখনো বদলায়নি—আমার সেই ভেতরের ছোট্ট ছেলেটা এখনো মাঝে মাঝে জেগে ওঠে।
সে এখনো আম চুরি করতে চায়, পুকুরে ডুব দিতে চায়, ঈদের নতুন জামা পরে আয়নার সামনে দাঁড়াতে চায়।
আমি তাকে থামাই না।
কারণ আমি জানি—সে-ই আসল আমি।


0 মন্তব্যসমূহ