ফেসবুক ফলোয়ার ধরার গল্প

কুশল মাঝে মাঝে নিজের ওপর খুব রাগ করে। এমন রাগ যে, একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের গালেই নিজে একটা হালকা থাপ্পড় দিল।

থাপ্পড়টা খুব জোরে ছিল না। কিন্তু শব্দটা একটু নাটকীয় হলো।
ঠাস!



কুশল আয়নায় তাকিয়ে বলল,
— মানুষজন কত কিছু শিখে ফেলছে! আর তুই? তুই ফেসবুকে একটা ফলোয়ারও ধরতে পারলি না?

তারপর সে গভীর দার্শনিক ভঙ্গিতে জানালার বাইরে তাকাল।
পুকুরের ধারে একটা কানা বক দাঁড়িয়ে আছে।

বকটা একটু পরপর ঠুক করে পানিতে ঠোঁট মারছে… আর মাঝে মাঝে একটা করে মাছ তুলে ফেলছে।

কুশল দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— দেখ, কানা বকও মাছ ধরে। আর আমি? আমি তো ফলোয়ারও ধরতে পারি না!

তার ফেসবুক পেজের নাম “মজার দুনিয়া”।
ফলোয়ার সংখ্যা ২৩৭।

এর মধ্যে ২০০ জন তার আত্মীয়স্বজন।
আর বাকি ৩৭ জন সম্ভবত ভুল করে ফলো করেছে।

একদিন সে একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ পোস্ট দিল—
“বন্ধুরা, সবাই লাইক শেয়ার কমেন্ট করবেন।”

পোস্টের নিচে কমেন্ট এলো তিনটা।

প্রথমটা তার খালাতো ভাই লিখেছে:
— ভাই, ইনবক্সে ৫০০ টাকা পাঠাও।

দ্বিতীয়টা তার বন্ধু রবি লিখেছে:
— তোর পেজটা বন্ধ করে দে। জাতি বাঁচবে।

তৃতীয় কমেন্টটা তার মা লিখেছেন:
— বাসায় এসে বাজারটা নিয়ে আসিস।

সেদিন কুশল বুঝল, পৃথিবী খুব কঠিন জায়গা।

সন্ধ্যায় সে তার বান্ধবী মিতুর কাছে গেল।

মিতু খুব শান্ত মেয়ে।
কিন্তু তার মধ্যে একটা অদ্ভুত বুদ্ধি আছে।
মানুষজন বলে, মিতু যদি রাজনীতিতে যেত, অন্তত তিনটা মন্ত্রণালয় সামলাতে পারত।

কুশল বসেই নাটকীয় কণ্ঠে বলল,
— মিতু, আমার জীবন শেষ।

মিতু চা খাচ্ছিল।
সে শান্তভাবে বলল,
— জীবন এত সস্তা না। বল কী হয়েছে।

কুশল দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— আমি ফেসবুকে ফেল।

মিতু ভুরু কুঁচকাল।
— মানে?

— আমার পেজে ফলোয়ার বাড়ে না।
মানুষজন রিল বানায়, লাখ লাখ ভিউ।
আমি বানাই, ১৭ ভিউ।

মিতু জিজ্ঞেস করল,
— ওই ১৭ জন কারা?

কুশল একটু লজ্জা পেল।
— আমি পাঁচবার দেখেছি… বাকি বারোটা হয়তো ভুল করে ক্লিক করেছে।

মিতু হেসে ফেলল।

— শোন, তুই ফেসবুকটা ভুলভাবে ব্যবহার করছিস।

কুশল চোখ বড় বড় করে বলল,
— আমি তো প্রতিদিন পোস্ট দিই!

— কী পোস্ট?

— লিখি: “বন্ধুরা, লাইক শেয়ার করবেন।”

মিতু মাথা নাড়ল।

— এভাবে হবে না। তোর কিছু টিপস দরকার।



কুশল নাটকীয়ভাবে বলল,
— মিতু, আমাকে বাঁচাও।

মিতু বলল,
— ঠিক আছে, শুন।

তারপর সে ফেসবুকের গোপন টিপস দিতে শুরু করল।

প্রথম টিপস।

— প্রতিদিন একটা ভালো রিল বানাবি। ছোট, মজার, মানুষ যেন শেষ পর্যন্ত দেখে।

দ্বিতীয় টিপস।

— স্টোরিতে প্রতিদিন কিছু দিবি। প্রশ্ন, ভোট, ছোট আপডেট।

তৃতীয়।

— মানুষের কমেন্টের উত্তর দিবি।
মানুষ কথা বললে ফেসবুক খুশি হয়।

চতুর্থ।

— ভালো পোস্টটা পিন করে রাখবি।

পঞ্চম।

— লাইভে আসবি মাঝে মাঝে। মানুষ লাইভ পছন্দ করে।

ষষ্ঠ।

— ট্রেন্ডিং বিষয় নিয়ে পোস্ট দিবি।

সপ্তম।

— ২–৩টা ভালো হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করবি।

অষ্টম।

— গ্রুপে শেয়ার করবি।

নবম।

— অন্য পেজের সাথে কোলাব করবি।

দশম।

— মানুষকে প্রশ্ন করবি।

একাদশ।

— ক্যাপশন ছোট রাখবি।

দ্বাদশ।

— একটা নির্দিষ্ট বিষয় বেছে নিবি।

ত্রয়োদশ।

— নিয়মিত পোস্ট দিবি।

চতুর্দশ।

— ভিডিওর শুরুটা আকর্ষণীয় করবি।

পঞ্চদশ।

— ইভেন্ট বানাতে পারিস।

ষোড়শ।

— ফলোয়ারদের ট্যাগ করবি।

সপ্তদশ।

— মেসেজের দ্রুত উত্তর দিবি।

অষ্টাদশ।

— ছোট কনটেস্ট দিতে পারিস।

ঊনবিংশ।

— ভালো সময়ে পোস্ট দিবি।

বিংশ।

— নিজের মতো থাকবি। কপি করবি না।

কুশল হাঁ করে শুনছে।

তার মনে হচ্ছে, মিতু যেন ফেসবুক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর।

সব শেষে মিতু বলল,
— আর সবচেয়ে বড় কথা, ধৈর্য ধর।

কুশল বলল,
— ধৈর্য কতদিন?

মিতু বলল,
— অন্তত ছয় মাস।

কুশল একটু চিন্তায় পড়ল।
— ছয় মাসে তো একটা মানুষ বিয়েও করে ফেলে।

মিতু বলল,
— তুই আগে ফলোয়ার বাড়া।

সেদিন থেকে কুশল কাজ শুরু করল।

প্রথম দিন সে একটা রিল বানাল।

রিলের বিষয়—
“যখন মোবাইলের চার্জ ১% থাকে।”

ভিডিওটা খুব নাটকীয় ছিল।
সে এমনভাবে দৌড়াচ্ছিল যেন পৃথিবী শেষ হয়ে যাচ্ছে।

দুই ঘণ্টায় ভিউ হলো ৫০০।

কুশল আনন্দে লাফ দিল।

সে ভাবল,
— পৃথিবী বদলে গেছে।

পরের দিন সে আবার রিল বানাল।

ভিউ হলো ১২০০।

তৃতীয় দিন ৩০০০।

কুশল এখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের গালে থাপ্পড় দেয় না।

বরং আয়নায় তাকিয়ে বলে,
— কুশল, তুই পারবি।

মাঝে মাঝে মজার ঘটনাও ঘটে।

একদিন তার মা এসে বললেন,
— তুই কি এখন নাচ শেখাস?

কুশল অবাক।
— কেন?

মা বললেন,
— তোর ভিডিওতে দেখি তুই নাচিস।

কুশল বলল,
— মা, এটা কনটেন্ট।

মা বললেন,
— আচ্ছা, কনটেন্ট হলে ঠিক আছে।

আরেকদিন বাজারে গেলে এক দোকানদার বলল,
— ভাই, আপনি কি ওই ফেসবুকের লোকটা?

কুশল লজ্জা পেল।

— হ্যাঁ।

দোকানদার বলল,
— আমার ছেলেটা আপনার ভিডিও দেখে খুব হাসে।

সেদিন কুশলের মনে হলো, জীবন আসলে খারাপ না।

এক মাস পর তার ফলোয়ার হলো ১০ হাজার।

সে দৌড়ে মিতুর কাছে গেল।

— মিতু! আমি পারছি!

মিতু হাসল।

— বলেছিলাম না?

কুশল বলল,
— এখন কি আমি বড় ইনফ্লুয়েন্সার?

মিতু বলল,
— এখনো না।

— তাহলে কবে?

মিতু একটু দার্শনিক ভঙ্গিতে বলল,
— সেটা সময় বলবে।

কুশল জানালার বাইরে তাকাল।

পুকুরের ধারে সেই কানা বকটা এখনো দাঁড়িয়ে আছে।

ঠুক করে আবার একটা মাছ ধরল।

কুশল হেসে বলল,
— দেখ মিতু, বকটা যেমন মাছ ধরে… আমিও এখন একটু একটু করে ফলোয়ার ধরছি।

মিতু চা খেতে খেতে বলল,
— ভালো।

কুশল একটু ভেবে বলল,
— কিন্তু একটা কথা…

— কী?

— আমি কি একদিন এক লাখ ফলোয়ার পাব?



মিতু হাসল।

— সেটা এখন বলা কঠিন।

কুশল নাটকীয়ভাবে বলল,

— তাহলে কি পারব?

মিতু বলল,

— সেটা সময় বলবে…

কুশল আকাশের দিকে তাকাল।

তারপর নিজেই বলল,

— নাকি… ঘোড়ার ডিম!

দুজনেই হেসে ফেলল। 😄

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

ঘুম গবেষক সুলেমান