বিকেলের আলোটারও তখন যেন আলসেমি ধরেছে। সূর্যটা পুকুরের পানিতে শেষবারের মতো মুখ ধুয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। বাতাসে কচুরিপানার গন্ধ, সঙ্গে একটু স্যাঁতসেঁতে ভাব।
পুকুরপাড়ে এমন নীরবতা যে মনে হচ্ছিল, একটা ব্যাঙ কাশলেও সবাই শুনে ফেলবে।
এই গম্ভীর পরিবেশে নীলা হঠাৎ এমন একটা প্রশ্ন ছুড়ে দিল, যেন রিকশা ধীরে চলতে চলতে হঠাৎ বিকট শব্দে বেল বেজে উঠলো টরং টরং !
“তুমি কি আমায় ভালোবাস?”
প্রশ্নটা এত পরিষ্কার ছিল যে পাশের কচুরিপানাই লুকিয়ে থাকা ব্যাঙটাও হয়তো এক সেকেন্ড থমকে গিয়েছিল, ভাবছিল—এইটা কি এখন বলার সময়?
রাফি জানত, এই প্রশ্নটা হালকা না। এটা হুট করে আসে না, আসে ভেতরের কোনো হিসাব মেলাতে। সে শান্ত গলায় বলল,
“বিশ্বাস না হলে পরীক্ষা করো।”
নীলা এবার একদম হিসাবি স্বরে বলল,
“ধরো তোমার শার্টের পকেটে মাত্র ৫০০ টাকা আছে। আমি যদি ওই ৫০০ টাকাই চাই?”নীলা শার্টের স্বচ্ছতার সুবেবহার করেছে ইতিমধ্যে টেরপেয়ে গেছে রাফির পকেটের ৫০০ টাকার নোটটির অস্তিত্ব !
রাফির মুখ একটু শক্ত হলো। এই ৫০০ টাকা কোনো সাধারণ টাকা না। এই টাকা দিয়ে রাফির আগামী তিনদিনের বাসভাড়া, একদিনের নাস্তা, আর জরুরি মাথাব্যথার ওষুধ কেনার প্ল্যান করা। মানে এটা প্রেমের টাকা না, জীবন বাঁচানোর টাকা।। তবু সে বলল,“দেব। তবে একটু সময় লাগবে।”
নীলা হাসল। কিন্তু এই হাসিতে মজা কম, বোঝাপড়া বেশি।
রাফি থামল তারপর হটাৎ এমন একটা প্রশ্ন ছুড়ে দিল, যেন ঘুম পাড়ানি গল্পের মাঝখানে মশা কামড় দিল
সে খুব সাধারণ একটা কথা বলল,
“ধরো, আমি এখনো স্থির না। ক্যারিয়ারটা পুরো পরিষ্কার না। এই অবস্থায় আমি যদি বলি, কিছু সময় দরকার, কিছু অপেক্ষা দরকার—তুমি থাকবে?”
নীলা কোনো নাটক করল না। একটু ভেবে বলল,
“থাকব। তবে একটা কথা মনে রেখো, অপেক্ষা মানে বসে থাকা না। আমি আমার কাজ করব, নিজের জায়গা বানাব। তুমি পিছিয়ে পড়লে হাত ধরব, কিন্তু টেনে নিয়ে যাব না।”
এই কথাটায় রাফি হেসে ফেলল। হালকা হাসি। স্বস্তির হাসি।
“এই পরীক্ষায় মনে হয় দুজনেই পাস ।”
নীলা বলল,
“পাস-ফেল না। এটা বোঝার পরীক্ষা। কে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, সেটা জানার।”
সন্ধ্যা নেমে আসে। পুকুরে আলো পড়ে।
৫০০ টাকাটা তখনো পকেটেই আছে।
ব্যাঙটা ডাকা বন্ধ করে দেয়। সন্ধ্যা নেমে আসে।
আর প্রেম? সে চুপচাপ পাশেই বসে থাকে, দুজনের মাঝখানে, সমান দূরত্বে।

0 মন্তব্যসমূহ