মোয়াজ্জেমকে প্রথম দেখলে মনে হয়, এই ছেলেটা জন্মগতভাবে “আদরের পাত্র”। তার মা বলতেন, “আমার আট মেয়ের পর আল্লাহ একটামাত্র ছেলে দিয়েছেন—এটা কিন্তু স্পেশাল এডিশন।”
বাবা একটু বাস্তববাদী ছিলেন। তিনি বলতেন, “স্পেশাল হোক, কিন্তু লাইটটা টিমটিম করে কেন জ্বলে?”
এই টিমটিমে আলো নিয়েই মোয়াজ্জেমের জীবন শুরু।
বংশের বাতি—কিন্তু মাঝে মাঝে বাতাস লাগলে নিবে যাওয়ার মতো অবস্থা।
১
মোয়াজ্জেম ছোটবেলা থেকেই আলাদা।
আলাদা মানে—ভালো না, খারাপও না—একটু “বুঝে উঠা যায় না” টাইপ।
পড়াশোনায় তার একটা নিজস্ব স্টাইল ছিল। বই খুলে বসত, তারপর ১০ মিনিট বই দেখত, ২০ মিনিট ছাদের ফ্যান দেখত, তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলত।
মা জিজ্ঞেস করতেন, “কি রে, পড়া হচ্ছে?”
সে বলত, “মা, জীবনটা খুব কঠিন।”
ক্লাস ফাইভের একটা ঘটনা আছে।
মাস্টারমশাই জিজ্ঞেস করলেন, “বাংলাদেশের রাজধানী কী?”
মোয়াজ্জেম দাঁড়িয়ে বলল, “স্যার, পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তন হতে পারে।”
তারপর থেকেই তার নাম হয়ে গেল—“পরিস্থিতি মোয়াজ্জেম”।
২
তার আট বোন।
প্রত্যেকেই তাকে নিয়ে আলাদা আলাদা স্বপ্ন দেখত।
বড় বোন ভাবত—মোয়াজ্জেম একদিন বড় অফিসার হবে।
দ্বিতীয় বোন ভাবত—সে ডাক্তার হবে।
তৃতীয় বোনের স্বপ্ন—সে বিদেশে যাবে।
চতুর্থ বোনের স্বপ্ন একটু বাস্তব—সে অন্তত ঠিকমতো নিজের জামা নিজে ধুতে শিখবে।
মোয়াজ্জেম সব শুনে মাথা নাড়ত।
তার নিজের স্বপ্ন ছিল—দুপুরে ঘুমানো, বিকেলে চা খাওয়া, আর রাতে আবার ঘুমানো।
৩
একদিন বাড়িতে সিদ্ধান্ত হলো—মোয়াজ্জেমকে বিদেশ পাঠাতে হবে।
কারণ সহজ—“বংশের বাতি” এখন রোজগার না করলে আলো পুরো নিভে যাবে।
গ্রামে এক দালাল ছিল—নাম রহিম বেপারী।
সে বলল, “সৌদি আরব পাঠাইতে পারুম। খুব ভালো কাজ। টাকা ঢল ঢল।”
মোয়াজ্জেম জিজ্ঞেস করল, “কাজটা কী?”
রহিম বেপারী একটু রহস্যময় ভঙ্গিতে বলল, “কাজ তো কাজই… গিয়া বুঝবা।”
এই উত্তর শুনেই মোয়াজ্জেম রাজি হয়ে গেল।
কারণ সে এমনই—যেখানে কিছুই পরিষ্কার না, সেখানেই তার আগ্রহ বেশি।
৪
সৌদি যাওয়ার দিন।
বিমানবন্দরে আট বোন কাঁদছে, মা কাঁদছে, বাবা গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছেন।
মোয়াজ্জেমের চোখেও পানি।
সে বলল, “আমি ফিরে আসব… অনেক টাকা নিয়ে…”
বাবা পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বললেন,
“টাকা না আনলেও চলবে… তুমি শুধু ঠিকমতো ফিরে আসো।”
৫
সৌদিতে গিয়ে প্রথম ধাক্কা—ভাষা।
আরবি সে জানে না।
ইংরেজি জানে না।
বাংলাও মাঝে মাঝে ভুলে যায়।
প্রথম দিন বস তাকে বলল, “শুগল!”
মোয়াজ্জেম ভেবেছিল এটা হয়তো তার নাম।
সে উত্তর দিল, “জি, আমি মোয়াজ্জেম।”
বস আবার বলল, “শুগল!”
সে আবার বলল, “জি, ঠিক আছে।”
শেষে বুঝল—এটা আসলে কাজের নির্দেশ।
কিন্তু কী কাজ—সেটা আরেক গল্প।
৬
তার কাজ ছিল—একটা ছোট দোকানে সাহায্য করা।
কিন্তু সে দোকানে কী বিক্রি হয়, সেটাও প্রথম তিন দিন বুঝতে পারেনি।
একদিন একজন ক্রেতা এসে কিছু চাইলো।
মোয়াজ্জেম তাকে হাসিমুখে একটা অন্য জিনিস ধরিয়ে দিল।
ক্রেতা রেগে গেল।
মোয়াজ্জেম তখন শান্তভাবে বলল,
“ভাই, জীবনেও আমরা যা চাই, তা সব সময় পাই না।”
ক্রেতা আরও রেগে গেল।
কিন্তু বস হাসল।
সেদিন থেকেই বসের কাছে সে “ফিলোসফার বয়”।
৭
সাত বছর কেটে গেল।
এই সাত বছরে মোয়াজ্জেম অনেক কিছু শিখেছে—
কাজ ঠিকমতো করতে শেখেনি।
কিন্তু মানুষের মুখ দেখে বুঝতে শিখেছে কে রাগ করবে, কে হাসবে।
আর একটা জিনিস শিখেছে—চা বানানো।
তার বানানো চা নাকি এত ভালো হতো,
বস বলত, “তুমি কাজ না করলেও চা বানাও, চলবে।”
৮
ফিরে আসার সময়।
তার স্যুটকেস খুলে দেখা গেল—
তিনটা জুব্বা।
একটা লাল হাফপ্যান্ট।
আর কিছু ছোটখাটো জিনিস।
বোনেরা জিজ্ঞেস করল, “টাকা কোথায়?”
মোয়াজ্জেম একটু চুপ করে বলল,
“অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছি।”
বাবা মাথা নিচু করে বললেন,
“অভিজ্ঞতা দিয়ে কি বাজার করা যায়?”
মোয়াজ্জেম বলল,
“না… কিন্তু গল্প করা যায়।”
৯
গ্রামে ফিরে সে হঠাৎ খুব জনপ্রিয় হয়ে গেল।
কারণ সে বিদেশফেরত।
লোকজন এসে জিজ্ঞেস করে,
“সৌদি কেমন?”
সে বলে,
“গরম… আর মানুষ ভালো।”
“কাজ কেমন?”
“কাজ তো কাজই…”
লোকজন বুঝতে পারে না—সে আসলে কিছুই ঠিকমতো বলতে পারে না।
১০
একদিন এক ছোট ছেলে তাকে জিজ্ঞেস করল,
“চাচা, আপনি এতদিন বিদেশে ছিলেন, কী শিখলেন?”
মোয়াজ্জেম একটু ভেবে বলল,
“শিখেছি—মানুষ যেখানে যায়, নিজেরে নিয়েই যায়। পালাতে পারে না।”
ছেলেটা কিছু বুঝল না।
কিন্তু পাশের একজন বৃদ্ধ মাথা নেড়ে বললেন,
“এই ছেলেটা বোকা না… একটু অন্যরকম।”
১১
তার মা এখনো তাকে আদর করে।
রাতে খাওয়ার সময় বলে,
“আর বিদেশে যাস না।”
মোয়াজ্জেম হাসে।
সে জানে—সে আবারও যেতে পারে,
কিন্তু এবার হয়তো কাজের জন্য না…
নিজেকে খুঁজতে।
১২
একদিন সন্ধ্যায়, গ্রামের রাস্তায় হাঁটছিল সে।
আকাশে হালকা লালচে আলো।
হঠাৎ তার বড় বোন পাশে এসে দাঁড়াল।
“তুই খুশি?”
মোয়াজ্জেম বলল,
“পুরো না… কিন্তু অল্প অল্প।”
বোন বলল,
“টাকা না আনলেও তুই বদলেছিস।”
সে একটু হেসে বলল,
“হয়তো… আগে আমি কিছুই বুঝতাম না… এখনো বুঝি না…
কিন্তু বুঝি যে বুঝি না।”
বোনটা হেসে ফেলল।
১৩
মোয়াজ্জেম এখন গ্রামের একটা কোচিং সেন্টারে ছোট বাচ্চাদের পড়ায়।
পড়ানো বলতে—গল্প করে, হাসায়, আর মাঝে মাঝে বই খুলে।
একদিন সে বলল,
“জীবনে সব সময় প্রথম হতে হবে না।
কিন্তু নিজের গল্পটা যেন নিজের হয়।”
একটা বাচ্চা জিজ্ঞেস করল,
“স্যার, আপনি প্রথম হয়েছিলেন?”
সে হেসে বলল,
“না… আমি সবসময় মাঝামাঝি ছিলাম…
তাই সবকিছু একটু একটু দেখেছি।”
১৪
রাতে সে মাঝে মাঝে ছাদে উঠে বসে।
তার লাল হাফপ্যান্টটা পরে।
কারণ এটা তার কাছে একটা স্মৃতি।
সে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে।
ভাবতে থাকে—
সে কি সত্যিই “বংশের বাতি”?
হয়তো না।
হয়তো সে একটা টিমটিমে আলো—
যেটা পুরো ঘর আলোকিত করতে পারে না,
কিন্তু একেবারে অন্ধকারও হতে দেয় না।
১৫
মোয়াজ্জেমের গল্প খুব বড় কিছু না।
কিন্তু ছোট ছোট জিনিসে ভরা—
ভুল, হাসি, লজ্জা, অভিমান, আর একটু একটু জ্ঞান।
গ্রামের মানুষ এখন বলে,
“ও ছেলেটা একটু অদ্ভুত… কিন্তু ভালো।”

আর মোয়াজ্জেম?
সে এখনো মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাস ফেলে—
কিন্তু এখন সেই দীর্ঘশ্বাসে একটা মজা আছে।
সে জানে—
জীবনটা খুব বড় কিছু না,
কিন্তু একেবারে ছোটও না।
শেষে সে একদিন নিজের মনে বলল,
“আমি বড় কিছু হইনি…
কিন্তু আমি আমার মতো হয়েছি…
এইটাই কম না।”

0 মন্তব্যসমূহ