আমরা ছিলাম, থাকিনি

 শহরের বিকেলগুলো কখনও কখনও অদ্ভুত রকমের নির্লজ্জ হয়। রোদ থাকে, কিন্তু গরম লাগে না। বাতাস থাকে, কিন্তু কারও গায়ে লাগে না।তবে আকাশের মুখ আজ ভার। যেকোনো মুহূর্তে শ্রাবণের মেঘ ভেঙে বৃষ্টি নামবে। তূর্য আর নীলা বসে আছে নিউ মার্কেটের এক ঘিঞ্জি রেস্টুরেন্টে নাম নাম কাকার বিরানি । তূর্যর একটা মুদ্রাদোষ আছে, সে কথা বলার সময় প্রতি বাক্যের শেষে অকারণেই বলে— ‘বুঝলে বিষয়টা?’ নীলা এটা সহ্য করতে পারে না, কিন্তু আজ সে চুপ।


টেবিলে খাবারের পাহাড়। কাচ্চি বিরিয়ানি, বোরহানি, জালি কাবাব— সব মিলিয়ে এলাহি কাণ্ড। তূর্য আয়েশ করে হাড় চিবোচ্ছে।

তূর্য বলল, ‘নীলা, বিয়েটা তাহলে হচ্ছে না? বুঝলে বিষয়টা?’

নীলা গ্লাসে চুমুক দিয়ে উদাস গলায় বলল, ‘না। আম্মা রাজি নন। আর তুমি তো জানো, আম্মার মাইগ্রেনের ব্যথা উঠলে আমি নড়তে পারি না।’


তূর্য একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হাত ধুয়ে বেয়ারাকে ডাকল। বেয়ারা আসতেই সে গম্ভীর মুখে বলল, ‘শোনো হে যুবক, আমাদের দুজনের বিল আলাদা নিয়ে এসো। আলাদা মানে একদম আলাদা। বুঝলে বিষয়টা?’


নীলা অবাক হয়ে তাকাল। তূর্য মৃদু হাসল। ‘বিচ্ছেদ যখন হয়েই গেছে, তখন অন্যের দায়ভার কেন নেব? লজিক, বুঝলে বিষয়টা?’


বিচ্ছেদের ঠিক সাত দিন পর তূর্যর আবার দেখা হলো নীলার সাথে। ধানমন্ডি লেকের ধারে। নীলা বেশ সাজগোজ করে এসেছে। সে তূর্যকে শেষ সুযোগ দিতে চায়।

নীলা বলল, ‘তূর্য, আমি আম্মাকে রাজি করাতে পারি। কিন্তু আমার কিছু শর্ত আছে। বিয়ের পর তোমাকে অনেক কিছু ত্যাগ করতে হবে।’

তূর্য পকেট থেকে সিগারেট বের করতে গিয়েও থেমে গেল। ‘কী কী ত্যাগ করতে হবে? বুঝলে বিষয়টা?’

নীলা আঙুল গুনে বলতে লাগল, ‘রোজ রাতে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া চলবে না। সিগারেট ছোঁয়াই যাবে না। তোমার ওই অদ্ভূত নাক ডাকার আওয়াজ বন্ধ করতে হবে। আর কথায় কথায় ‘বুঝলে বিষয়টা’ বলা তো একদমই নিষিদ্ধ। পারবে?’

তূর্য কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকল। মেঘগুলো দলা পাকিয়ে যাচ্ছে। সে ফিসফিস করে বলল, ‘ভেবে দেখি। বুঝলে বিষয়টা?’

পরদিন ঠিক একই জায়গায় দেখা। তূর্য আজ পাঞ্জাবি পরে এসেছে। নীলা উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী ভাবলে? ত্যাগ স্বীকারে রাজি?’


তূর্য হাসল।  ‘অনেক ভেবে দেখলাম নীলা। একসাথে সব ত্যাগ করা কঠিন। তাই আপাতত একটা জিনিস ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বুঝলে বিষয়টা?’


নীলা খুশি হয়ে বলল, ‘কোনটা? সিগারেট?’


তূর্য মাথা নাড়ল। ‘না। আপাতত বিয়ের চিন্তাটা ত্যাগ করলাম। বুঝলে বিষয়টা?’

সময় বহতা নদী। বিশ বছর কেটে গেছে। ২০২৬ সালের এক পড়ন্ত বিকেল।

সংসদ ভবনের সামনে ক্রিসেন্ট লেকের ধারে এক জোড়া প্রৌঢ় দম্পতি বসে আছেন। মহিলার চুলে রুপালি রেখা, পুরুষের চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। তারা পরম মমতায় একে অপরের হাত ধরে আছেন। বিকেলের মরা রোদে তাদের দেখতে খুব সুন্দর লাগছে।

একজন তরুণ পুলিশ কনস্টেবল লাঠি ঠুকতে ঠুকতে এগিয়ে এল। সে একটু নীতিবাগীশ টাইপের।

পুলিশটি কর্কশ গলায় বলল, ‘এই যে মুরুব্বি, প্রকাশ্য স্থানে এভাবে হাত ধরাধরি করে বসে আছেন কেন? লজ্জা-শরম নেই?’

পুরুষটি চশমা ঠিক করে শান্ত গলায় বললেন, ‘লজ্জা থাকবে কেন বাবা? আমরা তো স্বামী-স্ত্রী। বুঝলে বিষয়টা?’

পুলিশটি দমে গেল। একটু আমতা আমতা করে বলল, ‘ও, আচ্ছা। তা স্বামী-স্ত্রী হলে এখানে কেন? বাড়িতে গিয়ে বসুন।’



এবার পাশের মহিলাটি মুখ খুললেন। তিনি মিষ্টি হেসে বললেন, ‘বাবা, ও যা বলেছে তা সত্যি। তবে অর্ধেক সত্যি। উনি একজনের স্বামী, আর আমি অন্যজনের স্ত্রী। আমরা শুধু একসাথে একটু সূর্যাস্ত দেখছি। বুঝলে বিষয়টা?’

পুলিশটি হা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। তূর্য আর নীলা হাসছে। ২০ বছর আগের সেই না হওয়া বিয়েটা আজ যেন এই এক চিলতে বিকেলে পূর্ণতা পেল।শেষটা খুব সহজ।

সব প্রেম বিয়ে হয় না।

আর সব বিয়ে প্রেম হয় না।

কিন্তু কিছু গল্প থাকে—যেগুলো না শেষ হয়, না শুরু হয়।




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

ঘুম গবেষক সুলেমান