গ্রামের নাম নীলগঞ্জ। নামটা শুনলেই মনে হয় এখানে আকাশ সবসময় একটু বেশি নীল থাকে। কিন্তু বাস্তবে নীলের চেয়ে এখানে বেশি দেখা যায় হাই তোলা মানুষ। সকাল আটটায় চায়ের দোকানে বসে পাঁচজনের মধ্যে চারজনই হাই তুলছে। পঞ্চম জনটা চা বানাচ্ছে, তাই হাই তোলার সময় পাচ্ছে না—তবে মনে মনে সে-ও হাই তুলছে।
এই গ্রামেই থাকে রাকিব। বয়স খুব বেশি না—বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষ। কিন্তু তার একটা অদ্ভুত সমস্যা আছে। সে ঘুমাতে খুব ভালোবাসে, কিন্তু সময় পায় না। আর না ঘুমালেই তার মাথা কাজ করে না। একদিন সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখের নিচে কালো দাগ দেখে বলল, “এইভাবে চলতে থাকলে একদিন মানুষ আমাকে দেখে ভাববে—এই ছেলে কি রাতে চুরি করে?”
সেদিনই সে সিদ্ধান্ত নিল—ঘুম নিয়ে গবেষণা করবে। এমন কোনো উপায় বের করবে, যাতে কম ঘুমিয়েও মানুষ সুস্থ থাকতে পারে। শুনতে খুব বড় সিদ্ধান্ত, কিন্তু রাকিবের মাথায় তখন এটা পৃথিবী বাঁচানোর মতোই গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম দিন সে গেল শহরের লাইব্রেরিতে। লাইব্রেরির এক কোণে ধুলো জমা কিছু পুরোনো স্বাস্থ্য জার্নাল পড়ে আছে। লাইব্রেরিয়ান কাকু বললেন, “এইগুলো কেউ পড়ে না। তুই পড়বি?”
রাকিব চোখ বড় বড় করে বলল, “এইগুলোতেই তো রহস্য লুকানো আছে কাকু!”
কাকু একটু হেসে বললেন, “রহস্য না, ধুলো বেশি লুকানো আছে।”
রাকিব ধুলো ঝেড়ে বসে গেল। প্রথম জার্নালে সে পড়ল—একজন মানুষ যদি প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমায়, শরীর নিজে থেকেই একটা ছন্দ তৈরি করে। মানে শরীর ঘড়ির মতো কাজ করে। রাকিব নিজের দিকে তাকিয়ে ভাবল—তার শরীর যদি ঘড়ি হয়, তাহলে সেটা বোধহয় ভাঙা অ্যালার্ম ঘড়ি। কখনো বাজে, কখনো বাজে না।
পরের জার্নালে সে পেল খাবারের সাথে ঘুমের সম্পর্ক। লেখা আছে—ভারি খাবার খেলে ঘুম বেশি পায়, আর হালকা খাবার শরীরকে সচল রাখে। রাকিব মনে মনে হিসাব করল—গতকাল রাতে সে তিন প্লেট ভাত, ডাল, ডিম ভাজি আর শেষে মিষ্টি খেয়েছিল। তারপর কেন ঘুম আসবে না?
সে নিজের খাতায় লিখল: “কম ঘুমাতে চাইলে, আগে কম খেতে হবে। কিন্তু কম খাওয়া একটা আলাদা কষ্ট।”
এরপর সে বিখ্যাত মানুষদের অভ্যাস নিয়ে পড়া শুরু করল। কেউ কেউ খুব কম ঘুমিয়েও অনেক কাজ করেছেন। একজন নাকি দিনে মাত্র চার ঘণ্টা ঘুমাতেন। আরেকজন মাঝরাতে উঠে ঠান্ডা পানিতে গোসল করতেন, যেন শরীর সতেজ থাকে।
রাকিব এই জায়গায় এসে থেমে গেল। ঠান্ডা পানিতে গোসল! সে চোখ বন্ধ করে কল্পনা করল—শীতের সকালে ঠান্ডা পানি ঢালছে। কল্পনাতেই তার গা শিরশির করে উঠল।
সে নিজের খাতায় লিখল: “ঠান্ডা পানিতে গোসল—এই অংশটা আপাতত বাদ।”
পরের দিন থেকে সে নিজের ওপর পরীক্ষা শুরু করল। প্রথম দিন সে ঠিক করল—রাত ১২টার মধ্যে ঘুমাবে, সকাল ৫টায় উঠবে। মোট পাঁচ ঘণ্টা ঘুম।
রাত ১২টায় সে বিছানায় গেল ঠিকই, কিন্তু মোবাইলটা পাশে ছিল। একটু ইউটিউব, একটু ফেসবুক, একটু “আরেকটা ভিডিও দেখি”—এই করতে করতে রাত ২টা।
সকাল ৫টায় অ্যালার্ম বাজতেই সে চোখ খুলে বলল, “আজ না, কাল থেকে শুরু করব।”
দ্বিতীয় দিন সে মোবাইল দূরে রেখে দিল। রাত ১২টায় সত্যি সত্যি ঘুমাল। সকাল ৫টায় উঠেও গেল। প্রথম এক ঘণ্টা সে নিজেকে খুব বড় মানুষ মনে করল। মনে হচ্ছিল—এই তো, জীবন বদলে যাচ্ছে!
কিন্তু সকাল ৯টার দিকে তার মাথা ঝিমঝিম শুরু করল। ১১টায় সে ক্লাসে বসে এমনভাবে হাই তুলল যে পাশের ছেলেটা ভয় পেয়ে গেল।
দুপুরে সে চায়ের দোকানে বসে বলল, “মানুষ কম ঘুমিয়েও ভালো থাকতে পারে—এই তত্ত্বটা একটু সন্দেহজনক।”
চায়ের দোকানের মালিক বললেন, “তুমি আগে মানুষ হও, তারপর তত্ত্ব পরীক্ষা করো।”
রাকিব থেমে গেল। এই কথাটা তার মাথায় ঢুকে গেল।
তৃতীয় দিন সে নতুন পদ্ধতি নিল। দিনের মধ্যে ছোট ছোট “পাওয়ার ন্যাপ”। মানে ২০ মিনিটের ঘুম। সে লাইব্রেরিতে গিয়ে বই খুলে বসে থাকল। পাঁচ মিনিটের মধ্যে সে ঘুমিয়ে পড়ল। ২০ মিনিট পর উঠে সে নিজেকে একটু সতেজ মনে করল।
সে খাতায় লিখল: “পাওয়ার ন্যাপ—এটা ভালো জিনিস। তবে জায়গা ঠিক করতে হবে। লাইব্রেরিতে নাক ডাকার ঝুঁকি আছে।”
দিন যেতে লাগল। রাকিব ধীরে ধীরে বুঝতে পারল—ঘুম কমানোর চেয়ে ঘুমের মান ভালো করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সে রাতে মোবাইল ব্যবহার কমাল, ভারি খাবার কমাল, আর নিয়ম করে ঘুমানোর চেষ্টা করল।
একদিন তার বন্ধু সোহেল জিজ্ঞেস করল, “তুই আসলে কী খুঁজছিস?”
রাকিব একটু ভেবে বলল, “আমি আসলে কম ঘুমিয়ে বেশি বাঁচতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে—ঠিকমতো ঘুমিয়ে ঠিকমতো বাঁচাটাই আসল।”
সোহেল হেসে বলল, “বাহ, তুই তো দার্শনিক হয়ে গেছিস!”
রাকিব বলল, “না, আমি শুধু ঘুম পেয়েছি।”
এক সন্ধ্যায় সে বাড়ির ছাদে বসে ছিল। আকাশে চাঁদ উঠেছে। হালকা বাতাস। সে ভাবছিল—এই পৃথিবীতে সবকিছুরই একটা ভারসাম্য আছে। বেশি ঘুম খারাপ, কম ঘুমও খারাপ। মাঝামাঝি একটা জায়গা আছে, যেখানে মানুষ ঠিক থাকে।
সে নিজের খাতার শেষ পাতায় লিখল: “কম ঘুমানোর কোনো শর্টকাট নেই। শরীরকে ঠকানো যায় না। তাকে বুঝতে হয়, তার সাথে বন্ধুত্ব করতে হয়।”
তারপর সে খাতা বন্ধ করে হালকা একটা হাই তুলল।
এবারের হাইটা ছিল শান্তির।

0 মন্তব্যসমূহ