অভিমান ডট কম

 গ্রামের নাম শালিখারচর। নামটা শুনলেই মনে হয় এখানে শালিখ পাখিরা সভা করে, কিন্তু আসলে এখানে সভা করে মানুষ—চায়ের দোকানে, রাস্তার মোড়ে, কিংবা ফেসবুকের কমেন্ট বক্সে।

এই গ্রামেরই একজন ছেলে—রাশেদ। বয়স খুব বেশি না, কিন্তু স্বপ্নের পরিমাণ একটু বেশি। সে বিশ্বাস করে, জীবন খুব কঠিন কিছু না। শুধু একটু “স্মার্ট কাজ” জানলেই টাকা নিজে থেকেই এসে বলে, “ভাই, আমাকে খরচ করো।”




একদিন দুপুরে, গরমে যখন পাখাও হাল ছেড়ে দেয়, তখন রাশেদ মোবাইল হাতে নিয়ে একটা ভিডিও দেখে। ভিডিওর টাইটেল—
“Fiverr থেকে মাসে ১ লাখ টাকা ইনকাম—শুধু ১০ মিনিটে শিখুন!”

ভিডিওর লোকটা এমনভাবে বলছে, মনে হয় সে নিজে টাকা বানায় না, টাকা তাকে বানায়।

রাশেদ ভিডিও দেখে গভীরভাবে ভাবল। তারপর একটু দাঁড়িয়ে নিজের বুকের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমার মধ্যেও কিছু আছে…”

কি আছে, সেটা সে জানে না। কিন্তু কিছু একটা আছে—এই বিশ্বাসটা খুব শক্ত।

সে তৎক্ষণাৎ একটা Fiverr অ্যাকাউন্ট খুলে ফেলল।
সময় লাগল প্রায় তিন মিনিট।

অ্যাকাউন্ট খুলেই সে একটু থেমে গেল। চারপাশে তাকাল।
পাখি ডাকছে, রাস্তা দিয়ে একটা ভ্যান যাচ্ছে, দূরে কেউ চিৎকার করছে—“আইসক্রিম!”

কিন্তু…
কোনো অর্ডার আসছে না।

সে আবার মোবাইল স্ক্রিনে তাকাল।
নোটিফিকেশন—শূন্য।

রাশেদ হালকা কাশল।
তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল—
“এটা কি ঠিক হচ্ছে?”

মনে হলো মহাবিশ্ব একটু চুপ করে আছে।


বিকেলে সে চায়ের দোকানে গেল।
চায়ের দোকানের মালিক—মতিন কাকা। তিনি চা বানান এমনভাবে, মনে হয় চা না, দর্শন পরিবেশন করছেন।

রাশেদ গম্ভীর মুখে বলল,
“কাকা, একটা কথা বলি?”

মতিন কাকা চায়ের কাপে চামচ ঘুরাতে ঘুরাতে বললেন,
“বল, তবে বেশি গভীর হলে আমি বুঝবো না।”

রাশেদ বলল,
“আমি আজ Fiverr-এ অ্যাকাউন্ট খুলছি।”

চায়ের দোকানে বসা সবাই থেমে গেল।
যেন কেউ বলেছে, “আমি আজ চাঁদ কিনে ফেলেছি।”

একজন বলল,
“ওইটা কি আবার?”

রাশেদ গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
“ওইটা একটা অনলাইন মার্কেটপ্লেস। এখানে বসে বসে ডলার কামানো যায়।”

সবাই একসাথে “ওওও” শব্দ করল।

তারপর পাশ থেকে হেলাল বলল,
“কত টাকা কামাইছো?”

রাশেদ একটু থেমে বলল,
“এই তো… শুরু করলাম।”

হেলাল চুপ করে চা খেল। তারপর বলল,
“মানে, এখনো কিছু না?”

রাশেদ একটু বিরক্ত হয়ে বলল,
“তিন মিনিট হয়েছে মাত্র!”

মতিন কাকা হেসে বললেন,
“তিন মিনিটে যদি টাকা আসতো, আমি চা বানানো বাদ দিয়ে মোবাইলই বানাতাম।”


রাতে বাসায় ফিরে রাশেদ আবার মোবাইল খুলল।
নোটিফিকেশন—এখনো শূন্য।

সে ভাবল, “সমস্যাটা কোথায়?”

তারপর সে নিজের প্রোফাইল দেখল।
প্রোফাইলে লেখা—
“I will do anything.”

এই “anything” কথাটা দেখে সে নিজেই একটু ভয় পেল।

“Anything” মানে কি?
মানুষ কি সত্যি “anything” চায়?

সে একটু ভাবল, তারপর ঠিক করল—
প্রোফাইলটা আপডেট করতে হবে।

সে লিখল—
“I will design logo, write content, edit video, motivate you, and sometimes give life advice.”

নিজের লেখাটা পড়ে সে নিজেই মুগ্ধ।
মনে হলো, সে একাই একটা কোম্পানি।


পরের দিন সকাল।

ঘুম থেকে উঠেই সে মোবাইল চেক করল।
নোটিফিকেশন—এখনো শূন্য।

সে একটু দম নিল।
তারপর বিছানায় বসে গভীরভাবে ভাবল—
“মানুষ এত অকৃতজ্ঞ কেন?”

সে তো অ্যাকাউন্ট খুলেছে।
সে তো প্রস্তুত।

তাহলে মানুষ কেন আসছে না?

এই প্রশ্নটা সে সরাসরি মহাবিশ্বের দিকে ছুড়ে দিল।
মহাবিশ্ব এবারও চুপ।


দুপুরে তার ছোট বোন এসে বলল,
“ভাই, তুমি সারাদিন মোবাইল নিয়ে কি করো?”

রাশেদ গম্ভীর হয়ে বলল,
“আমি কাজ করি।”

বোনটা বলল,
“কোথায় কাজ?”

“অনলাইনে।”

“কি কাজ?”

রাশেদ একটু থেমে বলল,
“এইটা একটু জটিল… তুমি বুঝবা না।”

বোনটা মাথা নাড়িয়ে চলে গেল।
যাওয়ার সময় বলল,
“তোমার এই জটিল কাজ দেখে মনে হয় তুমি কিছুই করো না।”


সন্ধ্যায় আবার চায়ের দোকান।

আজ রাশেদের মুখ একটু ভারি।

মতিন কাকা বুঝে ফেললেন।
“কিছু হয়েছে?”

রাশেদ বলল,
“কাকা, মানুষ কেন আমাকে কাজ দিচ্ছে না?”

মতিন কাকা চুপ করে থাকলেন।
তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
“তুই কি পারিস?”

রাশেদ একটু থেমে বলল,
“সবই পারি… মোটামুটি।”

কাকা হেসে বললেন,
“মোটামুটি দিয়ে কেউ টাকা দেয় না রে। মানুষ টাকা দেয় ‘বিশ্বাস’ কিনতে।”

রাশেদ চুপ করে গেল।

এই প্রথম সে বুঝল—
সমস্যাটা মহাবিশ্বে না, একটু নিজের মধ্যেও আছে।


রাতে সে ইউটিউবে আবার ভিডিও দেখতে শুরু করল।
এইবার ভিডিওর টাইটেল—
“How to get your first order on Fiverr.”

ভিডিওটা আগেরটার মতো সহজ না।
এখানে বলা হচ্ছে—
স্কিল, প্র্যাকটিস, পোর্টফোলিও, ধৈর্য…

এই শব্দগুলো শুনে রাশেদের একটু কষ্ট হলো।
কারণ এগুলোতে সময় লাগে।

আর রাশেদ সময়ের সাথে একটু অস্বস্তিতে থাকে।


পরের দিন সে সিদ্ধান্ত নিল—
সে সত্যি কিছু শিখবে।

সে একটা ছোট কাজ বেছে নিল—লোগো ডিজাইন।

প্রথম দিন সে যা বানাল, সেটা দেখে তার নিজেরই হাসি পেল।
দ্বিতীয় দিন একটু ভালো হলো।
তৃতীয় দিন সে একটা ডিজাইন বানিয়ে বন্ধুকে দেখাল।

বন্ধু বলল,
“এইটা খারাপ না।”

এই “খারাপ না” কথাটা শুনে রাশেদের মনে হলো—
সে জীবনে প্রথমবার কিছু ঠিক করছে।


এক সপ্তাহ পরে…

সে আবার Fiverr-এ ঢুকল।
প্রোফাইল আপডেট করল, গিগ বানাল, কিছু ছবি দিল।

তারপর অপেক্ষা।

এইবার সে তিন মিনিট অপেক্ষা করল না।
সে তিন দিন অপেক্ষা করল।

তৃতীয় দিনের রাতে, হঠাৎ—

টিং!

একটা নোটিফিকেশন।

সে ভয় পেয়ে গেল।

ধীরে ধীরে খুলল।

একটা মেসেজ—
“Hi, can you design a simple logo?”

রাশেদ কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকল।
তারপর হালকা করে বলল—
“ধন্যবাদ…”

কাকে ধন্যবাদ দিল, সে নিজেও জানে না।
হয়তো মহাবিশ্বকে,
হয়তো নিজেকে।


চায়ের দোকানে সেই রাতে সে হাসিমুখে গেল।

মতিন কাকা জিজ্ঞেস করলেন,
“কিছু হয়েছে?”

রাশেদ বলল,
“কাকা, একটা মেসেজ পাইছি।”

সবাই আগ্রহ নিয়ে তাকাল।

“কাজের মেসেজ।”

হেলাল বলল,
“কত টাকা?”

রাশেদ একটু লজ্জা পেয়ে বলল,
“৫ ডলার।”

সবাই হেসে ফেলল।

কিন্তু মতিন কাকা হাসলেন না।
তিনি বললেন,
“এই ৫ ডলারটাই আসল। এর মধ্যে তোর প্রথম বিশ্বাস আছে।”

রাশেদ মাথা নেড়ে বুঝল—
এই ৫ ডলার শুধু টাকা না,
এটা তার “অভিমান ভাঙার” দাম।


রাতে বাসায় ফিরে সে কাজটা শুরু করল।

সে যত্ন করে, মন দিয়ে কাজ করল।
কারণ এই প্রথম কেউ তাকে বিশ্বাস করেছে।

কাজ শেষ করে সে ফাইল পাঠাল।

তারপর অপেক্ষা।

এই অপেক্ষাটা আগের মতো না।
এইবার তার মধ্যে একটা শান্তি আছে।

কারণ সে জানে—
সে চেষ্টা করেছে।


জীবন আসলে এমনই।

আমরা অনেক সময় তিন মিনিটে ফল চাই,
কিন্তু তিন দিনের পরিশ্রমও দিতে চাই না।

আমরা মহাবিশ্বের উপর অভিমান করি,
কিন্তু নিজের দিকে তাকাই না।

রাশেদের গল্প খুব বড় কিছু না।
কিন্তু এই ছোট গল্পেই একটা বড় কথা আছে—

“অর্ডার আসতে সময় লাগে,
কিন্তু মানুষ হতে আরও বেশি সময় লাগে।”

আর শালিখারচরের মানুষজন এখনো চায়ের দোকানে বসে।
চা খায়, গল্প করে, স্বপ্ন দেখে।

আর মাঝে মাঝে কেউ একজন আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে—
“এইবার কিন্তু একটু তাড়াতাড়ি দিও…” 😄

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

ঘুম গবেষক সুলেমান