যুদ্ধ, কুয়েত আর একটি আমগাছ


কুয়েতের বাতাসে এক ধরনের ধুলো আছে। ধুলোটা খুব খারাপ কিছু না। বরং অদ্ভুত। সকালে সূর্যের আলো পড়লে মনে হয় যেন আকাশ থেকে একটু সোনালি গুঁড়া নেমে এসেছে।

তাজুল ইসলাম প্রথম দিন কুয়েতে এসে এই ধুলোটা দেখেই একটু থমকে গিয়েছিল। বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে সে মনে মনে ভাবল, “এই দেশটা বুঝি একটু আলাদা।”

আলাদা তো বটেই।

তাজুল ইসলাম বাংলাদেশের মেহেরপুরের ছেলে। গ্রামে তার বাড়ির সামনে একটা পুরনো আমগাছ। গাছটার নিচে বসে বিকেলে চা খাওয়ার অভ্যাস ছিল। কিন্তু জীবন সবসময় আমগাছের ছায়ায় বসে থাকে না। কখনো কখনো তাকে মরুভূমিতেও পাঠায়।

কুয়েতে সে একটা কনস্ট্রাকশন প্রজেক্টে কাজ করে। সকাল সাতটা থেকে বিকেল পাঁচটা। মাঝখানে এক ঘণ্টা লাঞ্চ ব্রেক। কাজটা খুব কঠিন না, আবার সহজও না। রোদটা শুধু একটু বেশি।



তার সাথে একই রুমে থাকে আরও চারজন। সবাই বাংলাদেশি।
মোস্তাক, রাজিব, সোহেল আর রফিক।

রফিক একটু দুষ্টু টাইপের মানুষ। কারও সাথে হাসি ঠাট্টা না করলে তার খাওয়াই হজম হয় না।

তাজুল একটু সহজ সরল মানুষ। গ্রামের লোকজন যেমন হয়, তেমন।

একদিন রাতে সবাই বসে ভাত খাচ্ছে। সোহেল বলল,
“তাজুল ভাই, আপনি কি সত্যি সত্যি মনে করেন কুয়েতে বৃষ্টি হয়?”

তাজুল খুব সিরিয়াস মুখে বলল,
“হয় তো। আল্লাহ চাইলে সব জায়গায় বৃষ্টি হয়।”

রফিক সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“তাহলে কাল ছাতা নিয়ে কাজে যাবেন। যদি হঠাৎ বৃষ্টি আসে!”

সবাই হো হো করে হেসে উঠল।

তাজুলও হাসল। একটু দেরি করে হাসল।

এই দেরিতে হাসাটা নিয়ে সবাই আবার আরও বেশি হাসে।

কেউ কেউ বলে, “বোবার শত্রু নাই।” কিন্তু বাস্তবে দেখলে বোঝা যায়, সহজ মানুষদের নিয়েই মানুষ সবচেয়ে বেশি মজা করে।

তাজুল অবশ্য কিছু মনে করে না।

তার একটা অদ্ভুত অভ্যাস আছে। সে খবর শুনতে খুব ভালোবাসে। বিশেষ করে যুদ্ধের খবর।

রাতে সবাই যখন ইউটিউবে গান শুনে বা সিনেমা দেখে, তাজুল তখন মোবাইল নিয়ে বসে থাকে। একটার পর একটা নিউজ।

ইরান কি বলল।
ইসরায়েল কি করল।
আমেরিকা কি ভাবছে।

রফিক একদিন বিরক্ত হয়ে বলল,
“তাজুল ভাই, আপনার কাছে যুদ্ধটা কি সিনেমা নাকি?”

তাজুল মাথা চুলকে বলল,
“না ভাই, কিন্তু মজার লাগে। পৃথিবীতে কি হচ্ছে জানা দরকার।”

মোস্তাক বলল,
“আপনার কাছে মজা, কিন্তু আমাদের কাছে টেনশন।”

সবাই আবার হাসল।

কুয়েত শহরটা রাতে খুব সুন্দর। উঁচু উঁচু বিল্ডিং, রাস্তায় আলো, আর দূরে পারস্য উপসাগরের বাতাস।

ছুটির দিনে তাজুল মাঝে মাঝে শহরটা ঘুরে দেখে।
একদিন সে কুয়েত টাওয়ার দেখে মুগ্ধ হয়ে বলল,
“এত উঁচু জিনিস মানুষ বানায় কেমনে!”

রাজিব বলল,
“আপনারা বানান না? আপনি তো কনস্ট্রাকশনে কাজ করেন।”

তাজুল একটু লজ্জা পেয়ে হাসল।

তারা মাঝে মাঝে ফাহাহিল এলাকায় যায়। সেখানে বাংলাদেশি দোকান আছে।
গরম চা, পরোটা, ডাল।

সেই দোকানে বসে বাংলাদেশের কথা বলা যায়।

একদিন চা খেতে খেতে তাজুল বলল,
“দেশে গেলে প্রথমে আমগাছটার নিচে বসব।”

রফিক বলল,
“আর আমরা ভাবব আপনি যুদ্ধের খবর শুনছেন।”

সবাই আবার হাসল।

জীবনটা এমনই চলছিল।

কাজ, রোদ, হাসি ঠাট্টা, আর রাতে খবর।

কিন্তু পৃথিবী মাঝে মাঝে খুব দ্রুত বদলে যায়।

একদিন দুপুরে কাজের সময় সবাই হঠাৎ দেখল সুপারভাইজার খুব ব্যস্ত হয়ে ফোনে কথা বলছে। একটু পর সবাইকে ডাকল।

সে বলল,
“প্রজেক্ট আপাতত বন্ধ। সিচুয়েশন ভালো না।”

কেউ ঠিক বুঝল না।

রাতে ডরমিটরিতে ফিরে তাজুল ফোনে নিউজ খুলে দেখল।

মধ্যপ্রাচ্যে হঠাৎ বড় আক্রমণ হয়েছে। উত্তেজনা বাড়ছে। বিভিন্ন জায়গায় নিরাপত্তা সতর্কতা।

তার কনস্ট্রাকশন প্রজেক্টও বন্ধ হয়ে গেছে।

প্রথমবারের মতো খবর পড়তে পড়তে তাজুলের মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল।

রফিক পাশে বসে বলল,
“কি হয়েছে?”

তাজুল মোবাইলটা এগিয়ে দিল।

রফিক কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,
“মানে কাজ নাই?”

তাজুল মাথা নাড়ল।

পরের কয়েকদিন অদ্ভুত একটা নীরবতা নেমে এল।

সকালে আর কাজ নেই।
সাইটে যাওয়া নেই।
রোদে দাঁড়িয়ে ইট ধরার কাজও নেই।

কিন্তু খরচ থেমে থাকে না।

রুম ভাড়া।
খাওয়া।
মোবাইল।

সবকিছু।

তাজুল রাতে আবার খবর খুলে বসে। কিন্তু আগের মতো মজা লাগছে না।

আগে যুদ্ধ মানে ছিল দূরের ঘটনা।

এখন মনে হচ্ছে সেই যুদ্ধ তার নিজের পকেটেও এসে পড়েছে।

একদিন রাতে সবাই চুপচাপ বসে ছিল।

হঠাৎ রফিক বলল,
“তাজুল ভাই, একটা খবর দেন।”

তাজুল অবাক হয়ে বলল,
“কোন খবর?”

রফিক হেসে বলল,
“ভালো খবর। আপনার নিউজে কি ভালো খবর থাকে?”

কিছুক্ষণ কেউ কিছু বলল না।

তারপর তাজুল আস্তে করে বলল,
“একটা ভালো খবর আছে।”

সবাই তাকাল।

“কি?”

তাজুল একটু হাসল।

“আমাদের আমগাছটা এখনো আছে।”

মোস্তাক বলল,
“আপনি কেমনে জানেন?”

তাজুল বলল,
“আজকে আম্মা ফোনে বলছে। এই বছর নাকি অনেক আম ধরছে।”

রুমে হঠাৎ একটা নরম হাসি ছড়িয়ে পড়ল।

যুদ্ধ, টাকা, ভবিষ্যৎ... সবকিছু একটু দূরে সরে গেল।

রফিক বলল,
“তাহলে ঠিক আছে। যুদ্ধ শেষ হলে আমরা সবাই আপনার গ্রামের আম খেতে যাব।”

তাজুল মাথা নাড়ল।

বাইরে মরুভূমির বাতাস বইছিল।

আর ছোট্ট একটা রুমে পাঁচজন মানুষ বসে ছিল।
কেউ ভবিষ্যৎ জানে না।

তবু তারা হাসছিল।

হয়তো মানুষ এমনই।
মরুভূমির মাঝেও সে আমগাছের ছায়া খুঁজে নিতে পারে। 🙂

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

ঘুম গবেষক সুলেমান